জরথুস্ত্র বিরোধিতার মুখে পড়েছিলেন কিন্তু একই সাথে তিনি সমর্থন এবং সফলতাও অর্জন করেছিলেন। তার শিক্ষাগুলো একত্র করে একটি পবিত্র ধর্মশাস্ত্র সংকলিত করা হয়েছিল, সেটির নাম ‘আবেস্তা’। এবং সেই প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ভিন্নমতটি মূলধারার বিশ্বাসে রূপান্তরিত হবার প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল। জরথুস্ত্রের অনুসারীরা সবসময়ই যে- কোনো ধরনের ছবি অবিশ্বাস করে এসেছেন, কিন্তু তাদের প্রভু সর্বজ্ঞানস্বামী বা আহুরা মাজদার জন্যে তাদের নিজস্ব প্রতীক আছে–আগুন। তাদের মন্দিরে তারা এই পবিত্র আগুন সবসময় জ্বালিয়ে রাখেন, আর সে-কারণে ভ্রান্তভাবে তাদের অগ্নি-উপাসক হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। আগুন অবশ্যই তাদের কাছে পবিত্র, কিন্তু শুধুমাত্র সর্বজ্ঞানস্বামী মাজদার একটি প্রতীক হিসাবে।
যখন তারা বেঁচে আছেন, এর অনুসারীদের ভালো চিন্তা, ভালো শব্দ উচ্চারণ এবং ভালো কর্ম করার উপদেশ দেওয়া হয়, যেন ‘চিনভাত’ সেতুর উপর দিয়ে দ্রুত তাদের আত্মা অতিক্রম করতে পারে, যখন তারা মারা যাবেন এবং তাদের শবদেহ টাওয়ার অব সাইলেন্সের (ডাখমা বা চিলঘর) ছাদের উপর ছড়িয়ে রাখা হবে আকাশের পাখিদের জন্যে একটি উপহার হিসাবে। এখনো এই টাওয়ার অব সাইলেন্সগুলো ইরানে পাহাড়ের উপর দেখা যায়, যা অতীতের স্মারকচিহ্ন হয়ে আছে সেই দেশে, যে-দেশে এটাই একসময় প্রধান ধর্ম ছিল। কিন্তু জরথুস্ত্রের মতবাদ একই নিয়মের শিকার হয়েছিল, যে-নিয়মে এটি একদিন পূর্বতন অন্য একটি ধর্মবিশ্বাসকে প্রতিস্থাপিত করেছিল। এবং সময়ের সাথে এর সমাপ্তিও নিকটবর্তী হয়ে উঠেছিল। বহু শতাব্দী ধরে এটি এর জন্মস্থান ইরানে টিকে ছিল, কিন্তু ১৩০০ বছর আগে এটিকে প্রতিস্থাপিত করে আরো দৃঢ়প্রত্যয়ী একটি নতুন ধর্ম, ইসলাম। এই সময় জরথুস্ত্রীয়রা ভারত-অভিমুখে একটি দীর্ঘ অভিপ্রয়াণ শুরু করেছিলেন, যেখানে পবিত্র আগুন জ্বালানো, টাওয়ার অব সাইলেন্স (ডাখমা) নির্মাণ এবং ভালো চিন্তা, শব্দ আর কর্ম সম্পাদন করার স্বাধীনতা আবার ফিরে পেয়েছিলেন। এবং সেখানে, যদিও সংখ্যায় কম, তারা এখনো বসবাস করছেন।
নতুন একটি অধ্যায় শুরু করার আগে, এতক্ষণ আমরা যা কিছু শিখলাম সেখান থেকে কিছু উপসংহারে পৌঁছানোর আগে, আমি পেছনের দিকে একটু দৃষ্টি ফেরাতে চাই, সেই সময়ের দিকে, যার বিবরণ আমি এতক্ষণ দিয়েছি। হাতি আর অন্ধ মানুষদের নিয়ে সেই জৈনদের নীতিগর্ভ রূপক কাহিনিটি এই আলোচনা শুরু করার একটি আদর্শ জায়গা হবে। এর বার্তাটি ছিল, সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে চূড়ান্ত বাস্তবতা সম্বন্ধে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জন করতে মানুষ অক্ষম, সুতরাং তারা যেসব ধর্মীয় দাবিগুলো করে থাকেন সেই বিষয়ে তাদের আরো বি আর সহিষ্ণু হওয়া উচিত।
এই সতর্কবাণী সত্ত্বেও, ধর্মের নবী ও সাধু ব্যক্তিরা তাদের বিশ্বাস নিয়ে কদাচিৎ সন্দেহ পোষণ করে থাকেন, কারণ মানুষ আর চূড়ান্ত সেই বাস্তবতার মাঝখানে ঝুলে থাকা সেই পর্দার নেপথ্যে কী আছে, তারা সেটি দেখেছেন এবং ‘শুনেছেন বলে তারা দাবি করে থাকেন। আমি সতর্কসূচক কমা দিয়ে ‘দেখেছেন’ আর ‘শুনেছেন’ ক্রিয়াপদগুলো চিহ্নিত করেছি স্মরণ করিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে যে, আমাদের নিজেদেরই সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কীভাবে সেই অভিজ্ঞতাগুলো নিয়ে তাদের প্রস্তাবিত দাবির প্রতি আমরা প্রতিক্রিয়া দেখাব। কারণ তারা সবাই ভিন্ন ভিন্ন জিনিস দেখেছিলেন অথবা একই জিনিস ভিন্নভাবে দেখেছিলেন!
হিন্দু ঋষিরা কার্মার সেই চক্রের ঘূর্ণন এবং পুনর্জন্ম আর সময়ের অনন্ত আবর্তন দেখেছিলেন। এবং এই ধারণাগুলোই ভারতীয় এই ধর্মটির কেন্দ্রীয় মতবাদে রূপান্তরিত হয়েছিল।
ইহুদি নবীরা শুধুমাত্র একজন সত্যিকারের ঈশ্বরকে দেখেছিলেন, যিনি যখন সময় হবে, তার মেসাইয়াকে প্রেরণ করবেন এই পুরো ইতিহাসটির সমাপ্তি করতে, যে-আশা আজো বহু বিশ্বাসী ইহুদিকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
জরথুস্ত্র সময়ের শেষে ভালো আর খারাপের মধ্যে একটি চূড়ান্ত যুদ্ধ দেখেছিলেন, যে যুদ্ধ ভালোর জয় হবে।
যদিও প্রত্যেকেই এটি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন, এইসব ধর্মের প্রতিষ্ঠাতারা বর্তমানের এই সময়ে কী ঘটছে তার চেয়ে বরং ইতিহাসের অন্যপ্রান্তে যা কিছু ঘটতে তারা দেখেছিলেন সেই বিষয়ে খুব বেশি আগ্রহী ছিলেন।
কিন্তু আমাদের পরের যাত্রাবিরতিতে যখন আমরা চীনের দিকে তাকাব, আমরা আবিষ্কার করব যে, এই দেশটির সাধুরা মৃত্যুপরবর্তী জীবনের চেয়ে বরং কীভাবে এই জীবনটি আরো ভালো জীবন কাটানো যায়, সেটি নিয়ে অনেক বেশি আগ্রহী ছিলেন। সুতরাং এবারে আসুন পূর্বদিকে যাওয়া যাক, পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন আর দীর্ঘতম বাণিজ্যপথ, দ্য সিল্ক রোড ধরে, আরো বেশিকিছু জানতে। এটি আমাদের নিয়ে যাবে সুদূর চীন অবধি, এবং জীবন সম্বন্ধে কনফুসিয়ানিজম নামে একটি কৌতূহলোদ্দীপক দৃষ্টিভঙ্গির কাছে।
১৪. পার্থিব ধর্ম
ভারতের উত্তর সীমানা ধরে অগ্রসর হয়ে চীনের মধ্যে প্রবেশ করেছিল রেশম পথ, ‘দ্য সিল্ক রোড’ আর কমন এরা শুরু হবার প্রায় ২০৬ বছর আগে এটি তার জীবন শুরু করেছিল, যখন একজন চীনা সম্রাট তার দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি দ্রব্য রেশম ভারতীয়দের কাছে বিক্রি করার উদ্দেশ্যে কিছু ব্যবসায়ীকে পশ্চিমে পাঠিয়েছিলেন। এবং একটি সময় এই সিল্ক রোড প্রায় চার হাজার মাইল দূরে ইউরোপের সীমানায় ভূমধ্যসাগরের উপকূল অবধি সম্প্রসারিত হয়েছিল। ঘোড়সওয়ারদের ক্যারাভানগুলো এই পথে যাতায়াত করত, পূর্ব থেকে পশ্চিমে নিয়ে যেত রেশম আর অন্য দ্রব্য, কাপড় আর উল নিয়ে সেগুলো পূর্বে ফিরে আসত। কিন্তু এই বিখ্যাত পথ ধরে শুধুমাত্র রেশম আর অন্যান্য পণ্যসামগ্রী বহন করেই পশ্চিমে নিয়ে যাওয়া হয়নি। ধারণাও হস্তান্তর হয়েছিল, ধর্মও আমদানি হয়েছিল। বৌদ্ধবাদকে ভারত থেকে চীনে নিয়ে এসেছিলেন ব্যবসায়ীরা, যা পরে তিনটি প্রধান চীনাধর্মের একটি হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
