ভালো আর খারাপের এই দ্বন্দ্বটি ঈশ্বরের জীবনের কেন্দ্রে নিয়ে যাবার মাধ্যমে জরথুস্ত্র আসলেই যে-সমস্যাটির উত্তর খুঁজতে এতদিন সংগ্রাম করেছিলেন, সেটি সমাধান করতে পারেননি। পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যার জন্যে দরকার ছিল আহুরা মাজদার একটি বক্তব্য, যেখানে তিনি বলবেন, কী কারণে তিনি আদৌ অশুভ জিনিসটির সৃষ্টি করেছিলেন এবং তার সন্তানদের এর শিকার হবার সুযোগ করে দিয়ে এর দয়ার ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু জরথুস্ত্র যা করেছিলেন সেটি হচ্ছে, অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তিনি সেই পরিস্থিতিটির নাটকীয় একটি মাত্রা দিয়েছিলেন, যে-পরিস্থিতিতে আমরা প্রায়শই আমাদের নিজেদের আবিষ্কার করি। প্রতিভাবান ঔপন্যাসিকের মতে, তিনি মানুষের জীবনকে বর্ণনা করেছিলেন ধারাবাহিকভাবে ঘটমান যুদ্ধের একটি সমষ্টি হিসাবে। এবং আমাদের নৈতিক সংগ্রামটি এখানে যুদ্ধের মাত্রা পেয়েছিল। আমরা আমাদের আসক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি, আমরা প্রলোভনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করি। এই ব্যাখ্যায় এমনকি আসলেই একটি অশুভ শক্তির ধারণাও সেখানে অর্থবহ হয়ে ওঠে। অনেক ধারণা আছে যা মানুষের মনকে ভাইরাসের মতো সংক্রমণ করতে পারে, এবং ভয়ানক সব কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে পারে যা অনুপ্রাণিত করতে পারে। বর্ণবাদ যেমন সবচেয়ে সুস্পষ্ট একটি উদহারণ, কিন্তু আরো অনেক উদাহরণই আছে।
কিন্তু জরথুস্ত্র একজন নাট্যকারের চেয়ে অনেক বেশিকিছু ছিলেন, যিনি মানব অভিজ্ঞতার সামনে একটি আয়না তুলে ধরেছিলেন। ডানিয়েলের মতো তিনিও একজন ‘অ্যাপোক্যালিপটিক’ বা মহাপ্রলয়ের আগাম বার্তাবাহক ছিলেন, যিনি ইতিহাসের সীমানা ছাড়িয়ে সেই সময়টি দেখেছিলেন, যখন ঈশ্বর এই পৃথিবীর কাহিনিটির উপসংহার টানবেন। ভালো বইগুলোর একটি চূড়ান্ত অধ্যায় থাকা দরকার, যেখানে অমীমাংসিত বিষয়গুলো বোধগম্য করে তোলা হয় এবং একটি সন্তোষজনক পরিণতি অর্জন করা সম্ভব হয়। এই তাগাদা সব ধর্মেই প্রবল, যেগুলো ইতিহাসকে একটি চক্র নয় বরং ধনুক থেকে ছুটে চলা একটি তীর হিসাবে দেখেছে : একটি কাহিনি যার একটি শুরু আছে, একটি মধ্যমপর্ব আর একটি শেষ আছে, কোনো চাকা নয়, যা চিরন্তন আবর্তনশীল।
জরথুস্ত্র বিশ্বাস করতেন, ভালো আর খারাপ চিরকালই চূড়ান্ত একটি যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়া থেকে এড়িয়ে থাকতে পারবে না। একটি শেষ বোঝাপড়া হবেই। আহুরা মাজদার এই ভালো আর খারাপ সৃষ্টি পরিকল্পিত হয়েছে নিজেদের নিয়তি নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমাদের স্বাধীনতা আর সময় দেবার জন্যে, যেন আমরা সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে পারি। আর আমরা কী নির্বাচন করি সেটির প্রতি তিনি উদাসীন নন। যারা অশুভ আর খারাপ কোনোকিছুকে নির্বাচন করেন, সেই মানুষগুলোর ট্র্যাজেডি হচ্ছে তারা তাদের কাজের পরিণতি কী হতে পারে সেই বিষয়ে খুব বেশি দূরদৃষ্টির পরিচয় দেন না। প্রতিটি নির্বাচন আর সিদ্ধান্ত তাদের চরিত্রটি গড়তে সহায়তা করে এবং পরিশেষে নিজেদের তারা যে-ধরনের মানুষে পরিণত করেছেন তার ভিত্তিতেই তাদের বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। মৃত্যুর পর প্রতি আত্মাকে ‘চিনভাত’ সেতু (বা হিসাব-নিকাশের সেতু) পার হতে হবে সেই নিয়তিতে প্রবেশ করার জন্যে, যা এটি এর নিজের জন্যে তৈরি করেছে। এই সেতুটি ক্ষুরের ধারালো প্রান্তের মতো সংকীর্ণ। এর অপরপ্রান্তে আছে স্বর্গ, কিন্তু এর নিচে আছে নরক। যা ঘটে তা হচ্ছে, হয় আত্মা নিজেকে অশুভ বিষয় দিয়ে এতটাই ভারী করে ফেলবে যে, এর ওজন এটিকে নরকের দিকে টেনে নিয়ে যাবে, অথবা এতটাই হালকা থাকে শুভশক্তিতে, যা এটি খুব অনায়াসেই সেই সেতু পেরিয়ে স্বর্গে প্রবেশ করে।
এমনকি এটাও জরথুস্ত্রের সেই শেষ-সংক্রান্ত অন্তদৃষ্টিতে সবচেয়ে নাটকীয় উপাদান ছিল না। অশুভ কোনোকিছুর অস্তিত্বের সমস্যাটিকে সমাধান করতে হবে, সেই অশুভ শক্তি, যা সেতু-অতিক্রমরত কোনো আত্মাকে নরকে টেনে নিয়ে যায়। জরথুস্ত্রের সমাধান এসেছিল সেখানে, যাকে তিনি বলেছেন সৃষ্টির শেষ পর্যায়। যখন আহুরা মাজদা অবশেষে দুষ্ট যমজটিকে ধ্বংস করবেন, অশুভের যে মূল উৎস। পৃথিবী পুর্নবায়িত হবে এবং কল্যাণময়তা আর ন্যায়বিচার অবশেষে রাজত্ব করবে। এবং একজন ত্রাণকর্তা, একজন ‘সাওশয়ন্ত’ অথবা যিনি তাদের জন্যে উপকার নিয়ে আসবেন, আবির্ভূত হবেন। তার মাধ্যমে অশুভ পরিশেষে পরাজিত হবে এবং এর পরেই পৃথিবীর পুনর্নবায়ন ঘটবে।
জীবন্ত এবং ভীতিকর হওয়া ছাড়াও জরথুস্ত্রের শিক্ষা খুবই প্রভাবশালী ছিল। এবং পৃথিবীর ধর্মগুলোয় এটি বেশকিছু নতুন ধারণা যুক্ত করেছিল। এখানেই আমরা একক ব্যক্তির পুনর্জন্মের ধারণা পাই, যা হতে পারে স্বর্গের পরমানন্দে অথবা নরকের অনন্ত নির্যাতনে। এবং এখানেই আমরা প্রথম খুঁজে পাই সেই শেষ মহাযুদ্ধের ধারণাটিকে, সময়ের শেষে যে-যুদ্ধে অশুভ শক্তিকে ধ্বংস করে ন্যায়বিচার আর নৈতিকতার একটি পৃথিবী পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে ঈশ্বর একজন ত্রাণকর্তাকে পাঠাবেন। আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি কীভাবে ডানিয়েল এইসব একই ধরনের কিছু ধারণা দুর্দশায় আক্রান্ত ইসরায়েলকে সান্ত্বনা দেবার প্রচেষ্টায় ব্যবহার করেছিলেন। যে-ধারণাগুলো হয়তো ইহুদিরা আত্তীকৃত করেছিলেন পারস্যে তাদের নির্বাসনের সময়। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ধর্মগুলো পরস্পর থেকে চূড়ান্তভাবে বিচ্ছিন্ন ছিল না এবং যথেষ্ট পরিমাণ পারস্পরিক নিষিক্তকরণ সেখানে ঘটেছিল।
