যদিও বহু শতাব্দী ধরেই পার্সিরা, যারা এইসব টাওয়ার অব সাইলেন্স’ নির্মাণ করেছিলেন, ভারতে বসবাস করছেন, কিন্তু তারা মূলত এসেছিলেন পারস্য থেকে, বিষয়টি তাদের নামই ইঙ্গিত করছে। ভারতের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত একটি ভূখণ্ড, ইরান, এই ইরানকে গ্রিকরা যে নাম দিয়েছিল সেটি হচ্ছে পারসিয়া (বা পারস্য)। পার্সিরা যে ধর্মের অনুসরণ করেন তার নাম জোরায়াস্টিয়ানিজম বা জরথুস্ত্রবাদ, যার উদ্ভব হয়েছিল ইরানে, ইজরায়েলাইটদের ব্যাবিলন নির্বাসনের সমসাময়িক কোনো একটি সময়ে, কমন এরা শুরু হবার ছয় শতাব্দী আগে (খ্রিস্টপূর্ব)। ভারতের পার্সিরা ছাড়া আজ পৃথিবীতে জরথুস্ত্রবাদের খুব বেশি অনুসারী নেই, কিন্তু তাদের ধর্মটি ইহুদিদের ধর্মটি সহ অন্য ধর্মবিশ্বাসগুলোর ওপর গভীর একটি প্রভাব ফেলেছিল। এবং যেহেতু ইহুদিবাদই খ্রিস্টধর্ম আর ইসলামের জন্ম দিয়েছিল, পৃথিবীতে বর্তমানে যা এখন সবচয়ে জনবহুল ধর্ম, সে-কারণে আমরা জরথুস্ত্রবাদের প্রতিষ্ঠাতা জরথুস্ত্রকে ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ধর্মীয় ব্যক্তি হিসাবে বর্ণনা করতে পারি। যদিও তারিখগুলো সম্বন্ধে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়, বিশেষ করে যখন তারিখগুলো এমন একটি সময়ের, যখন খুব সামান্য তথ্যই লিপিবদ্ধ করে রাখা হতো, কিন্তু মনে করা হয় খুব সম্ভবত ৬২৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে জরথুস্ত্র জন্মগ্রহণ করেছিলেন, এবং একজন প্রতিদ্বন্দ্বী পুরোহিত তাকে ৫৫১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে হত্যা করেছিলেন।
জরথুস্ত্র যে তার মতোই একজন পুরোহিতের হাতে খুন হয়েছিলেন এই তথ্যটি ধর্মের অন্যতম শক্তিশালী একটি বৈশিষ্ট্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় : এর সহিংস মতানৈক্য সৃষ্টি করার ক্ষমতা। এর কারণ ধর্মের চূড়ান্ত উৎসটি এমন একটি জায়গায়, যা আমরা জরিপ করতে পারি না, বিতর্ক নিরসনে ঠিক যেভাবে কোনো দূরবর্তী দ্বীপ হয়তো আমরা জরিপ করতে পারি। ধর্মের উৎস পৃথিবীর বাইরে এবং এমন একটি বাস্তবতায় যা এই পৃথিবীর বাস্তবতা নয়। এর গোপন তথ্যগুলো আমাদের কাছে প্রকাশ করেন নবীরা, যারা দাবি করেন এর রহস্যময়তায় তারা প্রবেশ করতে পেরেছেন। সেই কণ্ঠস্বরগুলো যা তাদের বলেছে সেটি তারা ঘোষণা করেন এবং একটি নতুন ধর্মের জন্ম হয়। আর প্রতিটি নতুন ধর্মকে যেহেতু পুরনো ধর্মের ওপর একটি প্রতি-আক্রমণ হিসাবে দেখা হয়, তাই বিস্ময়কর নয়, পুরনো ধর্মের পুরোহিতরা সবসময়ই দলবেঁধে নতুন ধর্মের নবীদের উপর আক্রমণ করেছে। আর সে-কারণেই ধর্মীয় ইতিহাসে সেরা চরিত্রগুলো বলেছেন, নবীদের সবসময়ই কষ্টভোগ করতে হয়, এবং তাদের সেই স্বর্গীয় অন্তর্দৃষ্টি পাবার দণ্ড দিতে হয় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে। জরথুস্ত্র পুরনো ধর্মের একজন পুরোহিত ছিলেন, যিনি নতুন ধর্মের নবী হয়েছিলেন, সুতরাং তিনি-যে সমস্যায় পড়বেন সেটি নিশ্চিত ছিল।
বোঝার জন্যে সবচেয়ে সহজ ধর্মীয় বিতর্কটি বহুঈশ্বরবাদ আর একেশ্বরবাদের মধ্যে, যারা বিশ্বাস করেন মহাবিশ্ব বহু দেবতায় পূর্ণ আর যারা বিশ্বাস করেন শুধুমাত্র একজনই ঈশ্বর আছেন, তাদের মধ্যে বিতর্ক। আব্রাহাম ছিলেন প্রথম একেশ্বরবাদী। এবং জরথুস্ত্র অবশ্যই তার পাশে দাঁড়াবার অধিকার রাখেন। কিন্তু যা কিছু তিনি দিব্যদৃষ্টিতে দেখেছিলেন আর শুনেছিলেন, সেটি আব্রাহামের কাছে যা উন্মোচিত হয়েছিল, তারচেয়ে অনেক বেশি জটিল ছিল। এর কারণ, বহু ধর্মীয় স্বপ্নদ্রষ্টার মতো জরথুস্ত্র একটি বিশেষ সমস্যা নিয়ে ধ্যানমগ্ন ছিলেন।
একেশ্বরবাদ হয়তো বহু লক্ষ পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী দেবতাদের বিশৃঙ্খলাটি পরিষ্কার করেছিল, কিন্তু এটি এর নিজস্ব কিছু সমস্যা নিয়েও এসেছিল। যেমন, আমরা দেখছি, ইজরায়েলের সমস্যাটি ছিল তাদের নিরন্তর দুর্দশা এবং কষ্ট, পুরো ইতিহাস জুড়েই যার অভিজ্ঞতা তাদের হয়েছিল। কিন্তু ঈশ্বরের জাতি হিসাবে নির্বাচিত হওয়া বিষয়টি কেন তাদের বিরতিহীন দুঃখের কারণ হয়েছিল? তবে জরথুস্ত্রের জন্যে সমস্যাটি ছিল আরো গভীর আর বিশ্বজনীন। যন্ত্রণায় ক্লিষ্ট মানুষ তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ভালো মানুষের সাথে কেন এই খারাপ জিনিসগুলো ঘটে। জরথুস্ত্র আরো গভীরে প্রবেশ করতে চেয়েছিলেন, এবং খুঁজে বের করতে চেয়েছিলেন, কীভাবে ভালো আর খারাপ এই পৃথিবীতে প্রথমে প্রবেশ করেছিল। মানুষের জন্যে জীবনটা বেঁচে থাকার জন্যে যুদ্ধ, আর সেই যুদ্ধটি শুধুমাত্র প্রকৃতির সাথেই না, স্বজাতির বিরুদ্ধেও তাদের যুদ্ধ করে বাঁচতে হয়, যাদের অনেকেই খুবই নিষ্ঠুর আর অন্যদের ওপর তাদের আরোপিত দুঃখগুলোর প্রতি যারা উদাসীন। আর এই অশুভ জিনিসটি আসছে কোথা থেকে? আর যারা এটি সহ্য করছেন, তারা কি কোনোদিনও এর জন্য ক্ষতিপূরণ পাবেন, আর যারা এই কাজগুলোর জন্যে দায়ী তারা কি কখনো শাস্তি পাবেন?
এই প্রশ্নগুলোই জরথুস্ত্রকে পারস্যের প্রাচীন বহুঈশ্বরবাদী ধর্মের পুরোহিত হিসাবে তার শান্তিপূর্ণ জীবন থেকে টেনে বের করে এনেছিল। অতীতের বহু আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানকারীর মতো, অশুভের প্রকৃতি নিয়ে ধ্যান করে বেশকিছু বছর কাটাতে এটি তাকে প্ররোচিত করেছিল। তারপর একটি সমাধান তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন। ধারাবাহিক কিছু স্বর্গীয় অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে সত্যটি তার কাছে উন্মোচিত হয়েছিল: ভালো আর খারাপের এই যুদ্ধটি মানব-ইতিহাসের চেয়েও প্রাচীন। এটির সূচনা হয়েছে একেবারে ঈশ্বরের হৃদয়ে। আসলেই একজন সর্বশক্তিমান ঈশ্বর আছেন, যাকে তিনি ডেকেছিলেন ‘আহুরা মাজদা’ (জ্ঞানী প্রভু বা সর্বজ্ঞানস্বামী) নামে, কিন্তু সেই একজন ঈশ্বরের জীবনেও তিনি জটিলতা আবিষ্কার করেছিলেন। একেবারে শুরুতে আহুরা মাজদা দুটি ভিন্ন যমজ সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন, এবং তিনি তাদের দুজনকেই তাদের নিজস্ব পথ বেছে নেবার অনুমতি দিয়েছিলেন। একজন ভালোত্বকে আর অন্যজন এর বিপরীত অশুভকে নির্বাচিত করেছিলেন। একজন সত্যকে, আর অন্যজন মিথ্যাকে বেছে নিয়েছিলেন। সুতরাং এই পৃথিবী, এখানে বাস করা প্রতিটি সত্তার অন্তর, ভালো আর খারাপের মধ্যে সেই সংগ্রামের রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল, যেখানে আহুরা মাজদার পুত্ররা পরস্পরের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, এবং তারা দুজনেই আমাদেরকে স্বপক্ষে টেনে এনে জয়ী হতে চেষ্টা করে। এবং আহুরা মাজদার পুত্রদের মতো আমাদেরও সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কাকে সমর্থন করব।
