যখন আমরা এই গল্পটি বিবেচনা করি, ঈশ্বরের দ্বিতীয় নির্দেশের মূর্তি প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি পুনরায় বিবেচনা করা আমাদের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এটি ঈশ্বরকে ছোট মোড়কে মুড়িয়ে ধর্মীয় বাজারে বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তর করার মতো কোনো কাজ করতে ইজরায়েলাইটদের সতর্ক করে দিয়েছিল। কিন্তু তারপরও সংগঠিত ধর্মগুলো মূলত সেটাই করে থাকে। তাদের প্রচলিত মতামতের মোড়কে এটি ঈশ্বরকে একটি বাক্সের মতো ঢুকিয়ে রাখে এবং ঠিক সেটাই তারা বাকি সবাইকে জোর করে মানতে বাধ্য করে। জবকে সান্ত্বনা দিতে আসা তার বন্ধুরা এটাই করার চেষ্টা করেছিলেন। সহমর্মিতাসহ তার নিয়তিতে আসা সব হতাশা আর কষ্টের ভাগ না-নিয়ে এই বন্ধুরা তাকে বলেছিলেন, ঠিক কীভাবে তার এই পরিস্থিতিতে ঈশ্বরেরই হাত আছে এবং তারা তাকে এই ব্যাখ্যাটি মেনে নিতে। জোর করেছিলেন। অতিবিকশিত ধর্মীয় মূল ভাবনাগুলো সাধারণত এমন কাজ করতে ভালোবাসে। তারা মানুষকে নির্দেশ দেয়, ঠিক কীভাবে ভাবতে হবে, কোনোকিছুর কী অর্থ, সেটির ব্যাখ্যা দেয় এবং কীভাবে এই পরিস্থিতিতে ঈশ্বর ভূমিকা রাখেন সেটি দাবি করেন। কিছু ধর্ম যেভাবে কাজটি করে থাকে, এই ধরনের ব্যাখ্যার মুষলধারার মুখোমুখি হওয়া অনেকটাই আপনার নিজেকে কোনো দীর্ঘ বাস-যাত্রায় আত্মনিয়ন্ত্রণহীন কোনো ব্যক্তির পাশে বসে কাটানোর মতোই, যে কিনা সারারাত ধরে জোর করে তার সব উন্মত্ত ভাবনা আপনাকে শুনতে বাধ্য করে।
এলিফাজ দ্য টেমানাইট, বিলডাড দ্য শুহাইট আর জোফার দ্য নামাইট হচ্ছেন ধ্রুপদী চরিত্রের ধর্মীয় গোঁড়া মৌলবাদী, যারা মনে করেন তাদের কাছে সবকিছুরই ব্যাখ্যা করা আছে, রেকর্ড করা টেপের মতো এবং যাদের সাথেই তাদের দেখা হয়, তাদেরকেই সেই টেপ বাজিয়ে শোনানোর মতো আর কোননা কাজই করতে তারা এতটা ভালোবাসেন না। বুক অব জবের অসাধারণ বিষয়টি হচ্ছে, এটি তাদের কথা শুনতে গিয়ে চূড়ান্তভাবে ক্লান্তিকর হতে ভয় পায়নি, শুধুমাত্র মূল বিষয়টি ব্যাখ্যা করার লক্ষ্যে। ঈশ্বর কী কিংবা তিনি কী করতে চাইছেন বা তার পরিকল্পনা আর তার বার্তাটি কী, সেটি কেউ নিশ্চিতভাবে জানেন, এমন কোনো দাবি কারোরই করা উচিত নয়। অন্য বহুধরনের বিশ্বাসীদের তুলনায় ইহুদিরা অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করেন এই ধরনের অনিশ্চয়তা নিয়ে বাঁচতে। তারা অন্য মানুষদের ওপর তাদের ঈশ্বরকে চাপিয়ে দেবার কোনো চেষ্টা করেন না। তারা নিজেদের মধ্যে তর্কবিতর্ক করতে সারাক্ষণই ব্যস্ত, সুতরাং তেমন কিছু করার মতো সময়ও তাদের হাতে নেই। এবং তারা এখনো বিতর্ক করে যাচ্ছেন। কিন্তু এখানে তাদেরকে তাদের ঈশ্বর নিয়ে দীর্ঘ তর্কবিতর্কে মগ্ন রেখে এগিয়ে যাব অন্য আরেকটি ধর্ম নিয়ে আলোচনা করতে। জোরোয়াস্ট্রিয়ানিজম বা জরথুস্ত্রীয় ধর্মমত। এটি আমাদের আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাবে পারস্যে, কমন এরা (খ্রিস্টপূর্বাব্দে) শুরু হবার ছয়শো বছর আগে বুদ্ধের সমসাময়িক সময়ে, কিন্তু প্রথমে ভারতে আমাদের একটি যাত্রাবিরতি করতে হবে।
১৩. শেষ যুদ্ধ
ভারতের পশ্চিম উপকূলে মুম্বাই শহরের দক্ষিণে মালাবার পাহাড়ের উপরে দাঁড়িয়ে বাইনোকুলারে চোখে রাখলে, অগণিত গাছের সারির উপর মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো হাস্যময় পাথরের একটি স্তম্ভ নজরে পড়তে পারে পর্যটকদের। সেই পাহাড়ে উঠে স্তম্ভটির নিকটে যাওয়া তাদের নিজেদের জন্য নিষিদ্ধ, কিন্তু যদি তারা কোনো ড্রোন ব্যবহার করে ছবি তুলতে পারেন, তাহলে দেখবেন এই স্তম্ভটির একটি সমতল ছাদ আছে, যার প্রান্তসীমা ঘিরে রেখেছে অল্প উচ্চতার একটি প্রাচীর। এবং ছাদটি বিভক্ত করা হয়েছে তিনটি এককেন্দ্রিক বৃত্তে। ক্যামেরা হয়তো শবদেহ-খাদক কোনো পাখিকে সেখানে ব্যস্ত থাকতে দেখতে পারে, যারা সেখানে প্রথম বৃত্তে পুরুষ, দ্বিতীয় বৃত্তে নারী এবং তৃতীয় বৃত্তে সাজিয়ে রাখা ছোট মৃতদেহগুলো সব গোগ্রাসে গিলছে।
ড্রোন এখানে যা উন্মোচন করছে, সেটি কিন্তু মৃতদের প্রতি প্রদর্শিত নিস্পৃহ নির্বিকার কোনো আচরণ নয়, বরং এটি হচ্ছে গভীর শ্রদ্ধাপূর্ণ একটি ধর্মীয় আচরণ, পার্সিদের প্রাচীন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আচার, যারা বর্তমানে ভারতের সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। পার্সিরা বিশ্বাস করেন, মৃতদেহ হচ্ছে অপবিত্র, সুতরাং যদি তারা সেটি কবর দেয়, তাহলে সেই শরীরটি পৃথিবীকেও দূষিত করবে, যা এটিকে গ্রহণ করবে, এবং যদি তারা সেটি দাহ করেন, তাহলে সেটি সেই আগুনকে দূষিত করবে, যা এটি দাহন করবে। এছাড়াও তারা মৃতদেহ খেয়ে বেঁচে থাকা প্রাণীদের প্রতি সদয় আচরণ করার ওপর বিশ্বাস রাখেন, যারা কিনা মৃতদেহ খেয়ে পৃথিবীকে পরিষ্কার রাখে; সে-কারণে তারা এইসব টাওয়ার অব সাইলেন্স’ (ডাখমা) নির্মাণ করেছিলেন, যেখানে তারা তাদের মৃতদেহগুলোকে তীব্র সূর্যের আলোয় কাক আর শকুনের ঠোঁটের কাছে নিবেদন করেন। একবার এই স্তম্ভের উপর মৃতদেহ রাখলে সেগুলো মাংসহীন হাড়ের স্তূপে পরিণত হতে বেশি সময় লাগে না, এরপর শুষ্কতা আর সূর্যের আলোয় এই কংকালগুলো বর্ণহীন আর ক্রমশ ভাঙতে শুরু করে, যতক্ষণ-না সেগুলো স্তম্ভের কেন্দ্রে একটি হাড়ের কক্ষে জমা হয়, যেখানে তারা ধীরে ধীরে ধুলায় পরিণত হয়, মাটি দ্বারা পরিস্রাবিত হয়ে সমুদ্রে ভেসে চলে যায়। সুতরাং মৃত্যুর সময় হারানো দেহটি জীবনের ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে সেই প্রাণীদের জন্যে খাদ্যে পরিণত হয়। সবকিছুই প্রকৃতিতে ফিরে যায়। কিছুই অপচয় হয় না।
