যখন বুক অব জব শুরু হয়, আমাদের বলা হয়েছিল, তিনি একজন সৎ আর নীতিবান ব্যক্তি ছিলেন, যিনি ঘটনাক্রমে অতিমাত্রায় বিত্তশালীও ছিলেন। সাত পুত্র আর তিন প্রিয় কন্যা ছাড়াও তার সাত হাজার ভেড়া, তিন হাজার উট, পাঁচশো জোয়াল টানা ষাঁড়, পাঁচশো স্ত্রী-গাধা, কর্মচারী ভৃত্য আর প্রচুর পরিমাণে ভূসম্পত্তি ছিল। তার সেই সময় আর স্থানের বিবেচনায় তিনি নিঃসন্দেহে অতীব বিত্তশালী ছিলেন।
কিন্তু একটি পর্যায়ে, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সবকিছু তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। তার গবাদিপশুর পাল চুরি হয়ে যায়, তার ভৃত্য আর সন্তানদের হত্যা করা হয় এবং তিনি নিজেই খুব বিশ্রী একটি চর্মরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাকে আবর্জনার মধ্যে বসে মাটির পাত্রের ভাঙা টুকরো দিয়ে নিজের গা চুলকাতে দেখা যায়। তার দুর্গতি আর যন্ত্রণা ছিল চরম। তার স্ত্রী তাকে বলেছিলেন, এখন তার উচিত হবে ঈশ্বরকে ঘৃণা করা আর অভিশাপ দেওয়া এবং মৃত্যুবরণ করা। কিন্তু তার সব দুর্দশা বিষয়ে জবের প্রত্যুত্তর ছিল : নগ্ন হয়ে আমি মায়ের জঠর থেকে এসেছি, নগ্ন হয়েই আমি ফিরে যাব। প্রভু দিয়েছিলেন আবার প্রভু সেটি কেড়ে নিয়েছেন, প্রভুর নামেই আশীর্বাদ’।
পরের দৃশ্যে আমরা দেখি জবের সাথে তিনজন বন্ধু দেখা করতে এসেছেন, এবং তারা বলেছিলেন, তারা তাকে সান্ত্বনা দেবার জন্যে এসেছেন, কিন্তু আসলে তারা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে এসেছিলেন। তারা ছিলেন সেই ধরনের বিশ্বাসী, সবকিছুর জন্যে তাদের কাছে প্রস্তুত থাকত উত্তর, এমনকি সেই ক্ষতির সুনামি, যা জবকে নিমজ্জিত করেছিল, তার জন্যেও তাদের একটি উত্তর ছিল। এলিফাজ দ্য টেমানাইট, বিলডাড দ্য শুহাইট আর জোফার দ্য নামাথাইট, তাদের দুর্ভাগা বন্ধুর সামনে এসে দাঁড়িয়ে তাদের জেরা শুরু করেছিলেন। ক্রমশ বাড়তে থাকা বিরক্তিসহ তারা একই কথার পুনরাবৃত্তি করতে শুরু করেছিলেন, কিন্তু এলিফাজ দ্য টেমানাইটই প্রথম জবের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির একটি আনুষ্ঠনিক ব্যাখ্যা দিয়ে শুরু করেছিলেন।
এলিফাজ বলেছিলেন : ‘নিরপরাধীদের কখনোই ক্ষতির মুখে পড়তে হয় না, যখন কিনা খারাপদের নিয়তিতেই আছে কষ্ট। তুমি যেহেতু এখন কষ্ট পেয়েছ, আমাদের বলল, তুমি কী করেছিলে যে, তোমার ওপর এই দুর্দশা পতিত হয়েছে? জব তাদের এই অভিযোগের যুক্তিটি গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। তার ওপর এই দুর্দশা চাপানোর জন্যে ঈশ্বরের যে কারণই থাকুক না কেন, এটি অবশ্যই জবের পাপের কারণে হতে পারে না, যে পাপ কিনা তার নিজের মাথার ওপর এই শাস্তি নিয়ে এসেছে। জব জানতেন তিনি নীতিবান একজন মানুষ ছিলেন, এবং তিনি কখনোই এমন কিছু করেননি, যার জন্যে এই দুর্ভাগ্যে পতিত হবার মতো কোনো শাস্তি যুক্তিযুক্ত হতে পারে, এটি অবশ্যই তার প্রাপ্য নয়।
জবের বন্ধুরা তাকে খোলামনে প্রশ্ন করতে আসেননি। তাদের কাছে কখনোই মনে হয়নি যে, তাদের প্রচলিত আনুষ্ঠানিক এই তত্ত্বটি ভুল হতে পারে। তারা যদি অন্য কোনো সম্ভাবনার কথা মনে জায়গা দেন, তাহলে তাদের পরিপাটি করে সাজানো ধর্মীয় মহাবিশ্বের সবকিছুরই প্রকৃত স্বরূপ বের হয়ে আসবে। তাই অযথা সন্দেহ করার চেয়ে বরং প্রচলিত চিন্তা আঁকড়ে থাকাই উত্তম। কিন্তু জব তার ব্যাখ্যা থেকে সরে আসতে অস্বীকৃতি জানান। এই মতবাদটি অবশ্যই ভুল, কারণ তিনি জানেন এমন কিছু তিনি করেননি যে, এই সর্বনাশ তার প্রাপ্য হতে পারে, যা কিনা তার সমস্ত পরিবার আর সৌভাগ্যকে মুছে দিয়েছে।
একজন সাধারণ মানুষ, যাকে অসাধারণ একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তার ওপর আরোপিত অভিযোগগুলোর কাছে সমর্পণ করার পরিবর্তে, জব একটি হিংস্র নিষ্ঠুর তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করার মতো সাহস খুঁজে পেয়েছিলেন। এমনকি যদি তার পক্ষে তিনি যে নিরপরাধ সেটি প্রমাণ করা অসম্ভব ছিল এই জীবনে–কারণ যা নেই তা প্রমাণ করা সবসময়ই অসম্ভব তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে, তার মৃত্যুর পর ঈশ্বর তার সুনাম পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করবেন : ‘কারণ আমি জানি আমার ত্রাণকর্তা আছেন এবং পরিশেষে একদিন তিনি এই পৃথিবীর উপর দাঁড়াবেন, আর আমার চামড়া যদি এভাবে ধ্বংস হয়ে যায়, আমি খালি মাংসের এই শরীর দিয়ে ঈশ্বরকে দেখতে পাব, যাকে আমি আমার পাশেই দেখব, আমার চোখ তাকেই দেখবে আর কাউকে না।
কিন্তু তার সততা প্রমাণ করতে জবকে তার মৃত্যু অবধি অপেক্ষা করতে হয়নি। ঈশ্বর স্বয়ং উপস্থিত হয়েছিলেন এবং নিন্দা করেছিলেন তাদেরকে, যারা জবকে দোষী অভিযুক্ত করে তাকেই অপমানিত করেছিল। ঈশ্বর এলিফাজ দ্য টেমানাইটকে বলেছিলেন : তোমার আর তোমার এই দুই বন্ধুর আচরণ নিয়ে আমি খুবই অসন্তুষ্ট এবং ক্ষুব্ধ হয়ছি, কারণ আমার সম্বন্ধে তোমরা যা বলছিলে তা সঠিক নয়, আমার দাস হিসাবে যে-কাজটি না-করাটাই তোমাদের কর্তব্য ছিল। এখানে একজন প্রচলিত মতামতের সাথে ভিন্নমত পোষণকারী একজন ‘হেরেটিক’ ঈশ্বরের আশীর্বাদ পেয়েছিলেন, সেই প্রচলিত ধারণার শিক্ষকরা নয়, যারা দলের মতামত মেনে চলেন।
কিন্তু এই গল্পের প্রচলিত শিক্ষাকে চ্যালেঞ্জ করার এমনকি ঈশ্বরেরও অনুমতি ছিল না! পরে একজন লেখক, জবের এই ভিন্নমতের জন্যে ঈশ্বরের সমর্থন দেবার কারণে বিচলিত হয়ে, এই কাহিনিতে একটি সুখকর পরিণতি জুড়ে দিয়েছিলেন মূল পাঠ্যাংশে। ঈশ্বর জবকে তার আগে যা ছিল তার চেয়ে দ্বিগুণ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, এবং এভাবে সেই পুরনো তত্ত্বটি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সততা পুরস্কৃত হয় আর অসৎ ব্যক্তিরা তাদের কর্মের জন্যে এই জীবনেই শাস্তি ভোগ করেন। এই গল্পের অসাধারণ বিষয়টি হচ্ছে, এখানে আমরা প্রচলিত মত আর ভিন্নমতকে একসাথে কাজ করতে দেখি এবং এটি আমাদেরকে নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নেবার অনুমতি দেয়।
