অথচ অধিকাংশ ধর্মই প্রচলিত মতামতের বিরুদ্ধে একটি ‘হেরেসি’ বা ভিন্নমত হিসাবে তাদের যাত্রা শুরু করেছিল। একজন নবী তার অভ্যন্তরীণ কণ্ঠস্বরের প্রতি প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করেছিলেন, যা সমসাময়িক মতামতকে চ্যালেঞ্জ করেছিল, যেভাবে আব্রাহাম তার বাবার দোকানে বানানো দেবতাদের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করেছিলেন। এর পরে যা সাধারণত ঘটে সেটি হচ্ছে, একটি বিভাজন, যেখানে ভিন্নমত পোষণকারী সেই ব্যক্তি পৃথক হয়ে একটি নতুন ধর্ম শুরু করেন অথবা পুরনো ধর্মের একটি প্রতিদ্বন্দ্বী শাখা সৃষ্টি করেন। কখনো এই ভিন্নমত পোষণকারীরাই তাদের যুক্তিতে বিজয়ী হন এবং তাদের ধারণাগুলো নতুন অর্থডক্সি বা প্রচালিত মতামতে রূপান্তরিত হয়। আবদ্ধ মনগুলো হয় আবদ্ধই থাকে, এবং নতুন ধারণার অনুপ্রেরণাগুলো অন্য কোথাও চলে যায়, অথবা নতুন অন্তদৃষ্টিগুলো সম্পৃক্ত হবার সুযোগ করে দিতে এটি যথেষ্ট পরিমাণ উন্মুক্ত হয়।
অন্য একেশ্বরবাদী ধর্মানুসারীদের তুলনায়, এই প্রক্রিয়ার সাথে বসবাস করতে ইহুদিরাই অপেক্ষাকৃত বেশি অভ্যস্ত ছিলেন। শুরু থেকে বিতর্ক আর ভিন্নমত তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ ছিল। অবশ্যই সব ধর্মে বিতর্ক হয়, কিন্তু অধিকাংশ ধর্মই যত দ্রুত সম্ভব সেই বিতর্ক থামিয়ে দেয়, এবং তারা একটি সীমারেখা টেনে দেয়, যা হয় সবাইকে গ্রহণ করতে হবে, নয়তো বের হয়ে যেতে হবে। ধর্মে তর্কের কোনো বিশৃঙ্খলা তারা সহ্য করেন না। ইহুদি ধর্ম কখনোই আসলে তেমন ছিল না। এটি জানত ধর্মের কোনোকিছুই বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। এটি বিশ্বাস করত, লোহার বাক্সে মনকে বন্দি করে চাবি দূরে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার চেয়ে যুক্তিতর্ক অব্যাহত রাখা অনেক উত্তম। ইহুদিবাদের পবিত্র বইয়ের ঠিক কেন্দ্রেই আমরা একজন ‘হেরেটিক’ বা ভিন্নমতাবলম্বীর দেখা পাই, যার নাম ছিল জব, যিনি সেই সময়ের প্রচলিত ধারণাগুলোর বিরুদ্ধে নিজের মতামত প্রস্তাব করেছিলেন।
জবের এই কাহিনিটি দীর্ঘসময় ধরেই লোককাহিনি হিসাবে প্রচলিত ছিল। কিন্তু ব্যাবিলনে নির্বাসনের সময় একজন অজ্ঞাত কবি কাহিনিটি নিয়ে কিছু কাজ করেছিলেন, এবং এটিকে এমনভাবে ব্যবহার করেছিলেন, যেন এটি দুঃখ আর কষ্ট ভোগ করার সমস্যাটি ব্যাখ্যা করতে পারে। অন্য কোনো জাতি অপেক্ষা ইহুদিদেরই সম্ভবত এই সমস্যাটি মোকাবেলা করার অধিকতর প্রয়োজন ছিল। বড় সাম্রাজ্যগুলোর আগ্রাসনের পরিণতিতে অন্য বহু জাতি আর জনগোষ্ঠী ইতিহাস থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, কিন্তু অন্ততপক্ষে তাদের সেই দুর্দশা শেষ হয়েছিল। কিন্তু ইহুদিদের জন্যে এই দুর্দশা স্পষ্টতই মনে হয়েছিল যেন চিরন্তন একটি বিষয়। সত্তর খ্রিস্টাব্দের দিকে জাতি হিসাবে ধ্বংস হবার পর, নিজেদের বলে দাবি করার মতো তাদের আর কোনো দেশ ছিল না, যাযাবরের মতো একটি ইতিহাসের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল তাদের, এবং তারা যেখানেই গিয়েছিলেন সেখানেই প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন। কোথাও তারা দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার ব্যাপারে কখনোই নিশ্চিত হতে পারেননি, তারা তাদের বাক্স গুছিয়ে রেখেছিলেন, পরবর্তী মহাঅভিপ্রয়াণ, পরবর্তী নির্বাসনের জন্যে সদাপ্রস্তুত।
তারা তাদের দেশ আর মন্দির হারিয়েছিলেন, কিন্তু তারা তাদের বইটি রক্ষা করেছিলেন, এবং এটি তাদের আধ্যাত্মিক বাসভূমিতে পরিণত হয়েছিল, যা তারা অনায়াসে তাদের মালপত্রের স্যুটকেসের মধ্যে গুঁজে দিতে পারতেন, যখন পরবর্তী বহিষ্কারাদেশ তাদের নিয়তিতে আরোপিত হতো। এমনকি যদি এটি তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়, তারা এটির মূলসার তাদের স্মৃতিতে ধারণ করে রেখেছিলেন, পেন্টাটিউখ থেকে কয়েকটি কবিতা, যা তাদের সবারই কণ্ঠস্থ ছিল। তারা এর নাম দিয়েছিলেন ‘শেমা’, হিব্রু যে-শব্দটির অর্থ হচ্ছে ‘শোনা। ‘শোনো, ও ইসরায়েল : আমাদের প্রভু ঈশ্বর হচ্ছেন একমাত্র প্রভু এবং তুমি তোমার প্রভু ঈশ্বরকে ভালোবাসবে সর্বান্তকরণে, পুরো আত্মা দিয়ে, আর শক্তি দিয়ে। ইহুদি ঐতিহ্যমতে ডানিয়েল সিংহের গুহায় এটি আবৃত্তি করেছিলেন এবং .
অক্ষত অবস্থায় তিনি ফিরে এসেছিলেন। আর ডানিয়েলের কাহিনি সব মহাবিপদের সময়ই ইজরায়েলাইটদের অনুপ্রাণিত করেছে। কিন্তু ইহুদিদের এখন কী অনুপ্রাণিত করতে পারে, যখন কিনা শক্তিশালী সিংহের চোয়াল তাদের একেবারে গুঁড়িয়ে দিয়েছে? ইজরায়েলের জীবনে’ এখন কেন এত দুঃখ?
এই প্রশ্নটির উত্তর দেবার চেষ্টা করেছিল ‘বুক অব জব’। বহু শতাব্দী ধরে তার স্বধর্মীয়দের জিজ্ঞাসা করে আসা প্রশ্নটির কোনো বিশ্বাসযোগ্য উত্তর ছিল না জবের কাছে। তবে জব যা করেছিলেন সেটি হচ্ছে, দুঃখ আর দুর্দশাগুলো হচ্ছে পাপের জন্যে ঈশ্বরের দেওয়া শাস্তি প্রচলিত এই দৃষ্টিভঙ্গিকে তিনি ধ্বংস করেছিলেন। আর ধর্মের ইতিহাসে এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত। আমাদের সামনে এটি সাধারণ একজন মানুষকে উপস্থাপন করেছিল, যিনি কোনো ভুলধারণাকে অনায়াসেই শনাক্ত করতে পারেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও ধর্ম তাকে বলেছিল, এটি ভুল হতে পারে না, কারণ ঈশ্বর বলেছেন এটাই সঠিক। সুতরাং তিনি নিজেকে প্রশ্ন করেছিলেন : ঈশ্বর কি কোনো ভুল জিনিসকে সঠিক করতে পারেন শুধুমাত্র সেটি সঠিক’ বলে ঘোষণা দিয়ে? না, ভুল সবসময়ই ভুল, ঈশ্বর যাই বলুক না কেন, অথবা ঈশ্বর বলেছেন, এমন দাবি করে পুরোহিতরা, আমাকে যাই বলুক না কেন। আমি জানি তাদের ব্যাখ্যা ভুল এবং আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লেও আমি সেটাই বলব। জব ছিলেন একজন হেরেটিক (ভিন্নমতাবলম্বী), যিনি বাইবেলের মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছেন এবং এর শিক্ষাকে চ্যালেঞ্জ করছেন।
