কিংবদন্তি বলছে, যখন রোমান-সেনাপতি পম্পেই ৬৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে জেরুজালেম জয় করেছিলেন, তিনি ইহুদিদের সেই ঈশ্বরকে খুঁজতে তাদের মন্দিরে প্রবেশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। মন্দিরটি তৈরি ছিল ধারাবাহিকভাবে ক্রমশ পবিত্রতর হয়ে ওঠা বেশকিছু চাতাল দিয়ে। পম্পেই সেইসব চাতাল অতিক্রম করে অবশেষে সেই পবিত্রতম আশ্রয়স্থল, ‘হলি অব হলিসে এসে পৌঁছান। এটি মন্দিরের সবচেয়ে পবিত্র অংশ, যেখানে শুধুমাত্র সর্বোচ্চ পুরোহিতের প্রবেশ করার অনুমতি আছে। পম্পেই শ্রদ্ধার সাথে সেই ‘হলি অব হলিসে প্রবেশ করেন ইজরায়েলের ঈশ্বরকে এক পলক দেখতে। কিন্তু এটি ছিল ফাঁকা, সেখানে কিছুই ছিল না।
কারণ ইহুদিরা জানতেন কোনোকিছুই সেই কণ্ঠটির প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে না যা তাদের বহু শতাব্দী ধরেই তাড়া করে ফিরেছিল। দ্বিতীয় নির্দেশটি গভীরভাবে তাদের হৃদয়ে প্রবেশ করেছিল। খোদাই করা পাথর, অসংখ্য সাজানো উঠানসহ তারা বিস্ময়করভাবেই বিশাল একটি মন্দিরও নির্মাণ করেছিলেন। এটি তাদের খুব প্রিয় ছিল এবং পুরো ইতিহাসজুড়েই তারা এটি হারানোর জন্যে শোক করা অব্যাহত রেখেছেন। কিন্তু এর ঠিক কেন্দ্রে, সেই পবিত্রতম জায়গাটিতে কিছু ছিল না। পম্পেই সেখান থেকে ফিরে এসেছিলেন খানিকটা হতবাক হয়ে, এই ধর্মটির ঈশ্বরের প্রতীক হচ্ছে একটি শূন্যকক্ষ।
পরের শতাব্দী জুড়ে রোমানদের এই হতভম্ভতা ক্রোধে রূপান্তরিত হয়েছিল, যখন এই একগুয়ে মানুষগুলো আর তাদের অস্পৃশ্য, অদৃশ্য ঈশ্বরকে কোনো বিশেষ সুবিধা দেওয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব অনুভূত হয়েছিল। সুতরাং রোমানরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন চিরকালের জন্যে এদের একটা ব্যবস্থা করতে হবে। ৭০ খ্রিস্টাব্দে টাইটাস নামের একজন সেনাপতির নেতৃত্বে, তারা জেরুসালেম শহরটিকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছিলেন এবং সেই মন্দিরটি ধ্বংস করেছিলেন। ১৪০ বছর আগে সেনাপতি পম্পেইয়ের পরিদর্শন-পরবর্তী সময়ে মন্দিরের আরো ব্যাপক সম্প্রসারণ ও সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়েছিল। অবশেষে সবকিছুর অবসান হয়েছিল, ভেবেছিলেন টাইটাস, আমি তাদের ধ্বংস করেছি।
কিন্তু অবশ্যই তারা ধ্বংস হয়ে যাননি। আরো একটি দীর্ঘ নির্বাসনে তারা পৃথিবীর নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিলেন, ইহুদিরা তাদের সবকিছুই হারিয়েছিলেন, শুধুমাত্র তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদটি ছাড়া : তাদের ঈশ্বর। তারা জানতেন পাথরের কোনো ভবনই তাদের ঈশ্বরকে ধারণ করতে পারবে না। এছাড়াও তারা ঐসব মানুষগুলোকে সন্দেহ করতেন, যারা ভাবতেন ঈশ্বরকে কোনো শব্দের দালানে তারা বন্দি করে রাখতে পারবেন। তারা যখন এই নতুন নির্বাসন সহ্য করেছিলেন, একই সাথে তারা মেসাইয়ার জন্যেও অপেক্ষা করছিলেন, মানবিক কোনো ব্যাখ্যায় ঈশ্বরকে সংজ্ঞায়িত করার কোনো প্রচেষ্টার সাথে ভিন্নমত প্রকাশের একটি ঐতিহ্য তারা লালন করেছিলেন।
এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ আর বিরক্তিকর চরিত্রও সেই দৃশ্যে আবির্ভূত হয়েছিল : ‘হেরেটিক’ বা ধর্মীয় ভিন্নমতাবলম্বী। হেরেটিকরা বেশ অস্বস্তিকর মানুষ ছিলেন, বিব্রতকর নানা প্রশ্ন করে যারা সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাবনাগুলো চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। তাদের কাছ থেকে আমাদের অনেককিছুই শেখার আছে। তাদের মধ্যে বিখ্যাত একজনকে আমরা ইহুদি বাইবেলের ঠিক মাঝখানেই খুঁজে পাব।
১২. ভিন্নমতাবলম্বী
যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি পৃথিবীতে পারমাণবিক বোমার সংখ্যা হ্রাস করতে চেয়েছিলেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, সেগুলো পৃথিবীকে আরো বেশি বিপজ্জনক একটি স্থানে পরিণত করেছে, তিনি বেশ শক্তিশালী বিরোধিতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। তার সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ সমালোচক ছিলেন একজন পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞানী, যিনি বিশ্বাস করতেন, আমেরিকায় যত বেশি বোমা থাকবে, এটি তত বেশি নিরাপদ হবে। এই বিরোধিতার বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করার পর, প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, কোনোকিছু নিয়ে কারো চূড়ান্ত বিশ্বাস, বিশেষ করে যদি সেই মানুষটি একজন বিশেষজ্ঞ হয়ে থাকেন, সেটি যে-কোনো খোলামনের মানুষকে নাড়িয়ে দিতে বাধ্য। আর সেটাই তিনি বলেছিলেন, একটি আবদ্ধ মন থাকার বড় সুবিধা।
কারণ আবদ্ধ মনের মানুষদের জন্যে যে একটিমাত্র সগ্রাম বাকি থাকে, সেটি হচ্ছে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে বাকি সবার ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া। আর কোনোকিছু নিয়ে এই ধরনের নিশ্চয়তা’র কারিগরি নাম হচ্ছে অর্থডক্সি’ (বা প্রচলিত বিশ্বাস); এই শব্দটির উৎস গ্রিক, যার অর্থ ‘সত্য অথবা সঠিক বিশ্বাস। প্রেসিডেন্ট কেনেডির মতো কোনো ব্যক্তি, যিনি পারমাণবিক বোমা সংক্রান্ত প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিকে বিরোধিতা করেছিলেন, তিনি হচ্ছেন একজন ‘হেরেটিক’, আর তাদের মতামতগুলোকে বলা হয় ‘হেরেসি’, আরেকটি গ্রিকশব্দ এর উৎস, যার অর্থ, যারা প্রচলিত ধারণার বিরোধিতা করেন। এই অর্থডক্সি’ আর ‘হেরেসি’ মানবজীবনে সবক্ষেত্রেই দেখা যায়, তবে ধর্মের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে শক্তিশালী। আর এটি কীভাবে কাজ করে সেটি পর্যবেক্ষণ, আমাদের বুঝতে সহায়তা করবে, কেন ধর্মগুলো নিজেদের মধ্যেই সর্বক্ষণ, এবং কখনো কখনো সহিংস ভিন্নমত প্রদর্শন করে থাকে।
