কিন্তু সেটাই ডানিয়েলের একমাত্র প্রস্তাবনা ছিল না। ইজরায়েলকে তার দুর্দশায় শুধু আশ্বস্ত করতেই চাননি, তিনি ঈশ্বরের শত্রুর বিরুদ্ধে তার শেষ যুদ্ধে তিনি ইজরায়েলকে প্রস্তুত করতে চেয়েছিলেন। ভারতীয় ঋষিদের ব্যতিক্রম, যারা কিনা সময়কে অশেষ ঘূর্ণায়মান চাকা হিসাবে দেখতেন, যেখানে আত্মা পরম আনন্দময় শূন্যতায় পালাতে চায়, ইহুদি-চিন্তাবিদরা সময়কে দেখেছিলেন ঈশ্বরের ধনুক থেকে বেরিয়ে আসা তীরের মতো, যার যাত্রা শেষ হবে যখন এটি তার গন্তব্যে পৌঁছাবে। আর ডানিয়েলের মতে সেই সময়টি ছিল খুবই সন্নিকটে। সময়ের এই যাত্রার শেষে ইসরায়েলের দুর্দশাও অবশেষে শেষ হবে। তাদের সৃষ্টিকর্তার মুখোমুখি হতে ও তার বিচারের দণ্ড পালন করতে তখন বহুযুগ ধরে মৃতরা তাদের কবর থেকে উঠে আসবেন। এখানেই ডানিয়েল ইজরায়েলে প্রথমবারের মতো মৃত্যুর পরেও জীবন আছে আর শেষবিচারের দিনে ঈশ্বরের আইন অনুযায়ী সব কর্মের বিচার হবে, এমন বিশ্বাসটি নিয়ে এসেছিলেন।
সেই মুহূর্তঅবধি এর ইতিহাসে ইজরায়েলাইটরা মৃত্যুপরবর্তী জীবন নিয়ে সামান্যই আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। সময়ের এই সীমানায় তাদের সাথে ঈশ্বরের সাথে দেখা হয় ঠিকই, কিন্তু মৃত্যুতে মানুষের সময় শেষ হয়ে যায় এবং সেই দৃশ্য থেকে তারা বিদায় নেয়। বিদায়ী আত্মারা তারপর সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন পাতালপুরী, ‘শেওলে’ যায়। ‘শেওল’ হচ্ছে সব ভুলে যাবার একটি জায়গা, যেখানে এমনকি ঈশ্বরকেও স্মরণ করা হয় না। ডানিয়েলের বইটি সেই সবকিছুই বদলে দিয়েছিল। তিনি তাদের বলেছিলেন, ইতিহাসে শেষে ঈশ্বর আমাদের এই সময়ের মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করবেন এবং যারা ধূলায় ঘুমিয়ে আছেন, তারা জেগে উঠবেন; কেউ অনন্ত জীবনে, কেউ লজ্জা আর অনন্ত ঘৃণায়।
মৃতদের পুনরুজ্জীবন লাভ করার বিষয়টি ইহুদি ধর্মে একটি নতুন ধারণা ছিল এবং সবসময়ই এটি বিতর্কিত ছিল। একটি সময় এসেছিল, যখন ইহুদি ধর্মীয় শিক্ষকরা, যারা এটি বিশ্বাস করেন এবং যারা বিশ্বাস করেন না, এমন দুটিভাগে বিভাজিত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এটি ছিল এমন একটি ধারণা, যা সময়ের সাথে আরো বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিল। ডানিয়েল বিশ্বাস করেননি যে, মৃতরা এক-এক করে পুনরুজ্জীবিত হবেন, যখন তারা মারা যান; কিন্তু তিনি মনে করতেন আসলে যা হবে সেটি হচ্ছে একটি সাধারণ পুনরুজ্জীবন। সবাই তাদের কবরে ঘুমাবেন যতক্ষণ-না ঈশ্বর ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটান, তখনতার শেষবিচারের মুখোমুখি হতে সবাই একই সাথে জেগে উঠবেন। এবং ডানিয়েল মনে করতেন খুব দীর্ঘ সময় এর জন্যে আর অপেক্ষা করতে হবে না।
আরো একটি বড় ধারণা ছিল তার। সেটি হচ্ছে ইজরায়েলাইটদের দেখানো যে, শেষ নিকটেই আছে। ঈশ্বর বিশেষ একজন গোপন প্রতিনিধিকে পৃথিবীতে প্রেরণ করবেন, যিনি হবেন ‘মেসাইয়া’; তিনি শেষ আক্রমণের জন্যে সবাইকে প্রস্তুত করবেন। মেসাইয়া মানে যিনি ‘অ্যানয়েন্টেড’ বা ‘যাকে তেল লেপন করা হয়েছে (মানবজাতির পরিত্রাণের উদ্দেশ্যে যার আবির্ভাব হবে)। তাদের নেতৃত্ব। দেবার জন্যে অতীতে যখন ইহুদিরা কাউকে রাজা হিসাবে নির্বাচিত করতেন, তখন তার মাথায় তেল লেপন করে দেওয়া হতো, তিনি-যে ঈশ্বরের দাস এটি ছিল তারই চিহ্ন। ডানিয়েল তখন ইসরায়েলকে বলেছিলেন খুব শীঘ্রই তাদের সব দুঃখের চির অবসান হবে, এবং শেষ খুব নিকটে এসেছে, তার সংকেত হচ্ছে, পরিত্রাতা মেসাইয়ার আগমন। কিন্তু তিনি পৃথিবীর বাইরে কোথাও থেকে আসবেন না। তাকে স্বর্গ থেকে মর্তে পাঠানো হবে না। তিনি তাদের মধ্যে বাস করেন এমন কেউ হবেন, এবং সব নজরে আসবেন তিনি, তার পরিচয় উন্মোচিত হবে। তিনি হয়তো ইতিমধ্যেই আমাদের মধ্যে আছেন, সুতরাং সতর্ক নজরে থাকুন। এভাবে ডানিয়েল ইজরায়েলকে সেই সময়টি স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, যখন তাদের সব দুর্দশা শেষ হবে, ঈশ্বর তাদের অশ্রু মুছিয়ে দেবেন। সুতরাং তারা নজর রাখতে শুরু করেছিলেন, একজন মেসাইয়ার আগমনের জন্যে তারা অপেক্ষা করতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু তিনি কখনোই আসেননি। সবকিছুই আরো খারাপ হতে শুরু হয়েছিল।
অ্যান্টিওকাসের নিপীড়ন তুচ্ছ মনে হবে যদি সেটি আমরা রোমানদের প্যালেস্টাইন দখলের সাথে তুলনা করি, আর সেটি ঘটেছিল ৬৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। ১৫০ বছরের বিরামহীন অস্থিরতার একটি পর্ব এরপরে এসেছিল, যার মাঝে বিরতির মতো এসেছিল কিছু সম্মুখযুদ্ধ, পরিশেষে ‘সমাপ্তি’ আসার আগে। জেরুজালেমের মন্দির আবারও সেই সমস্যার কেন্দ্রে ছিল। ইহুদিরা তাদের নিজেদের জীবনের চেয়েও এই মন্দিরটিকে ভালোবাসতেন। এটি ঈশ্বরের জন্য তাদের সেই প্রতীকগুলো ধারণ করে, যিনি মিশর থেকে হাজার বছর আগে তাদের এখানে ডেকে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু ঈশ্বরের প্রতি ইজরায়েলাইটদের অতি তীব্রমাত্রার আবেগ দেখে তাদের নতুন শাসক রোমানরা হতভম্ব হয়েছিলেন। রোমানদের দেবদেবীর কোনো অভাব ছিল না, এবং কোনো বিশেষ দেবতার প্রতি তাদের আবেগের বাড়াবাড়িও ছিল না। কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ সেই দেবতাদের খুব গুরুত্বের সাথেও নিতেন না। কিন্তু এই ঈশ্বরের কী আছে, যা ইহুদিদের এমন আত্মঘাতী ভক্তির দিকে ঠেলে দিতে পারে?
