এই শান্তিতে ব্যাঘাত ঘটিয়েছিলেন রাজা অ্যান্টিওকাস এবং তাদের দুর্দশা আবার নতুন করে শুরু হয়েছিল। কিন্তু এবার একটু পার্থক্য ছিল। এখন তাদের ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস বা তাদের ধর্মবিশ্বাসই তাদের দুর্দশার কারণ হয়েছিল। সুতরাং তাদের দুর্দশা মানে ঈশ্বর তাদের শাস্তি দিচ্ছেন, এমন ব্যাখ্যা আর তাদের যুক্তিসংগত মনে হয়নি। একটি নতুন ব্যাখ্যা তাই খুঁজে বের করা আবশ্যক হয়ে পড়েছিল। অ্যান্টিওকাসের নির্যাতনের সময় আরেকটি কাহিনির আবির্ভাব হয়েছিল। এবং এটি ইহুদি ধর্মে একটি নতুন উপাদান যুক্ত করেছিল, আর এটি শুধুমাত্র তাদের নিজেদের ইতিহাসের ওপর প্রভাব ফেলেনি, পরবর্তীতে আসা খ্রিস্টধর্ম আর ইসলামের ওপরেও এটি প্রভাব ফেলেছিল।
আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি, নবীরা, যারা ইজরায়েলের ইতিহাসে মূলচরিত্র ছিলেন তারা কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করে যাননি, তারা শুধু ইসরায়েলের ‘অতীত নিয়ে ঈশ্বরের ক্রোধের কথা বলেছিলেন। রাজা অ্যান্টিওকাসের সাথে তাদের সংগ্রামের সময় একটি নতুন চরিত্রের আবির্ভাব হয়েছিল, যিনি দাবি করেছিলেন যে, মৃত্যুর পরে কী ঘটে তিনি সেটি দেখতে পারেন, এমনকি ইতিহাসের পরেও, ভবিষ্যতে অনুগত দুর্দশাগ্রস্ত বিশ্বাসীদের জন্য ঈশ্বর কী নিয়তি নির্ধারণ করে রেখেছেন। পুরনো নবীদের ব্যতিক্রম, ঈশ্বরের সেই কণ্ঠটি তাকে যা বলেছিল সেটি প্রচার করতে তিনি একেবারে কেন্দ্রীয় মঞ্চ দখল করেননি। তিনি গুপ্তচরের মতোই সবার অগোচরে থেকেছিলেন, এবং তিনি যা শুনতেন তা কাগজে লিখে রাখতেন। এবং একজন গুপ্তচরের মতোই শক্রশিবির থেকে তার বার্তা পাঠাতেন। তিনি তার বার্তাগুলো সাংকেতিকভাবে লিখতেন, যেন শুধুমাত্র তার স্বপক্ষের কেউ সেটি পড়তে পারেন। এভাবে ঈশ্বরের কাছ থেকে গোপন তথ্য পাচার করার প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় অ্যাপোক্যালিপটিক’, বেশ ভীতিকর এই গ্রিকশব্দটির খুব সরল একটি অর্থ আছে। এর মানে, যা গোপন সেটি উন্মোচন করা, ঠিক যেভাবে কোনো থিয়েটারে পর্দা সরিয়ে ফেলা হয় মঞ্চে কী ঘটছে সেটি উন্মোচন করতে। এই অ্যাপোক্যালিপটিক লেখকদের কথা ভাবার সেরা উপায় হচ্ছে, তাদেরকে গুপ্তচর হিসাবে ভাবা, যারা শত্রুর বিরুদ্ধে ঈশ্বরের চূড়ান্ত যুদ্ধের পরিকল্পনা সম্বন্ধে জানেন। এবং সেই আগ্রাসনের জন্যে তার অনুগত বিশ্বাসীদের প্রস্তুত করতে তাদের প্রেরণ করা হয়েছে।
প্রথম ‘অ্যাপোক্যালিপটিক এজেন্ট নিজেকে ডানিয়েল নামে ডাকতেন। তিনি তার বার্তাগুলো সংক্ষিপ্ত একটি বইয়ে এমনভাবে লিখে গিয়েছিলেন, যা শুধুমাত্র তার ইহুদি-পাঠকদের কাছে বোধগম্য ছিল। তিনি এই কাহিনির প্রেক্ষাপট হিসাবে ব্যাবিলনের নির্বাসন-পর্বটিকে নির্বাচন করেছিলেন, শতবছর আগে যা ঘটেছিল। এটি আসলেই ছিল রাজা অ্যান্টিওকাসের নির্যাতনের সাংকেতিক বিবরণ, যা ঘটছিল, যখন এই বইটি লেখা হয়েছিল। এই বইটিতে মোট ছয়টি গল্প আর কিছু স্বপ্নের বিবরণ ছিল। সবচেয়ে বিখ্যাত গল্পটি ডানিয়েলকে নিয়েই ছিল এবং এর উদ্দেশ্য ছিল ইহুদিদের বোঝানো যে, নির্যাতনকারীর অত্যাচার সহ্য করেও তারা বাঁচতে থাকবেন।
ব্যাবিলনের নির্বাসিত ইহুদিদের একজন, ডানিয়েলের কাহিনিটিতে, তিনি পারস্য সাম্রাজ্যের একজন রাজকর্মকর্তা হয়েছিলেন। সাইরাসের পুত্র রাজা দারিউসের প্রিয়পাত্রও ছিলেন। সাইরাসই ইহুদিদের আবার তাদের স্বদেশ জুডেইয়াতে ফিরে যাবার অনুমতি দিয়েছিলেন। শুধুমাত্র ঈশ্বরের প্রতি তার বিশ্বাসের দৃঢ়তার কারণে নয় বরং প্রশাসক হিসাবে তার দক্ষতার কারণে ডানিয়েল রাজকর্মকর্তা হিসাবে রাজার সুনজরে আসতে পেরেছিলেন। কিন্তু ডানিয়েলের এই বিশেষ মর্যাদা অন্য কর্মকর্তাদের মনে ঈর্ষার বীজ বপন করেছিল। এবং তাকে ধ্বংস করতে পরিকল্পিতভাবে একটি ফাঁদ পাতা হয়েছিল। রাজা দারিউসকে তোষামোদ করে তারা প্রস্তাব করেছিলেন, তার একটি নতুন আইন প্রণয়ন করা উচিত, সারা সাম্রাজ্যজুড়ে দারিউস ছাড়া রাজ্যে আর কেউই অন্য কোনো দেবতার উপাসনা করতে পারবেন না। আর যে এই আইন ভঙ্গ করবে তাকে সিংহের গুহায় নিক্ষেপ করা হবে। দারিউস সেই আইনটি অনুমোদন করেছিলেন এবং ষড়যন্ত্রকারীরা দারুণ উল্লসিত হয়েছিলেন। তারা জানতেন যে, যাই ঘটুক না কেন, ডানিয়েল কখনোই ইসরায়েলের ঈশ্বরকে উপাসনা করা থামাবেন না।
তারা তার বাড়ির কাছেই ওঁত পেতে অপেক্ষা করছিল, এবং তাকে ঈশ্বরের উপাসনায় আবিষ্কার করেই রাজাকে জানিয়েছিলেন যে, ডানিয়েল তার আইন অমান্য করেছেন। রাজা খুবই বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন, যখন তিনি অবশেষে বুঝতে পেরেছিলেন তিনি আসলে তাদের ফাঁদে পা দিয়েছেন, কিন্তু আইন পাস করার কারণে তার এই উভয়সংকট থেকে বেরিয়ে আসার আর কোনো উপায় ছিল না। ভগ্নহৃদয় নিয়ে তিনি শাস্তি হিসাবে ডানিয়েলকে সিংহের খাঁচায় নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেন। কিন্তু পরের দিন দেখা যায়, ডানিয়েল সেই খাঁচা থেকে অক্ষত অবস্থায় বের হয়ে আসছেন, সিংহদের সাথে তার রাত কাটানোর কারণে তার কোনো ক্ষতি হয়নি। ডানিয়েল যারা পড়েছেন তারা এই গল্পটি জানেন, যা তিনশত বছর আগে ব্যাবিলনে ঘটেছিল। এটি ছিল ইজরায়েলাইটদের ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার কারণে অ্যান্টিওকাসের নিপীড়নের সময়, যা কিছু ইজরায়েলে ঘটেছিল সেই বিষয়ে। ডানিয়েল যেন তাদের বলছিলেন, যদিও তাদের সিংহের গর্তের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে, কিন্তু ঈশ্বর তাদের রক্ষা করবেন, যদি তারা তাদের বিশ্বাসে অটল থাকেন। তাদের প্রতিরোধ আর মনোবলকে আরো শক্তিশালী করে তোলাই এই বইটির উদ্দেশ্য ছিল।
