একটি স্বাধীনরাজ্য হিসাবে ইজরায়েল কখনোই এমনিতেই বেশি সুরক্ষিত ছিলেন না। এমনকি স্থানীয় গোত্রদের সাথে যুদ্ধে জয়লাভ এবং কানানকে নিজেদের দেশ বানানোর পরেও তারা সারাক্ষণই বিপদের ঝুঁকিতে ছিলেন। তাদের প্রতিশ্রুত এই দেশটির অবস্থান ছিল উত্তর আর দক্ষিণে মহাপরাক্রমশালী দুটি রাজ্যের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ ভূখণ্ডে। দক্ষিণের মিশরের কথা তারা ইতিমধ্যেই জানতেন। তাদের নিজেদের ইতিহাসের একটি অংশ কেটেছে সেই দেশে। কিন্তু উত্তরের মেসোপটেমিয়ার আসিরিয়ান সাম্রাজ্যটি তাদের স্বাধীনতার ওপর সবচেয়ে বড় প্রভাবটি ফেলেছিল। আসিরীয়রা তাদের রাজ্য আক্রমণ এবং তাদের পরাধীন একটি রাজ্যে পরিণত করেছিল। মিশর থেকে যে মহাঅভিপ্রয়াণ তাদের মুক্ত করেছিল, তার বহুশত বছর পরে ইজরায়েলাইটদের আবার দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দি হতে হয়েছিল। দশ হাজারেরও বেশিসংখ্যক ইজরায়েলাইটকে ব্যাবিলনে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। কানানে তাদের জয়ের পর ঠিক যেভাবে তাদের ঈশ্বর ধারণাটি বদলে গিয়েছিল, সেভাবেই ব্যাবিলনে তাদের দুর্দশার অভিজ্ঞতাটি ঈশ্বর সম্পর্কে তাদের ধারণাগুলো আবার বদলে দিয়েছিল।
প্রথমে তারা ভেবেছিলেন, ঈশ্বরকে তারা চিরকালের জন্যে হারিয়ে ফেলেছেন। জেরুজালেমে তার জন্যে সলোমনের বানানো সেই টেম্পলে তিনি আছেন। তারা ব্যাবিলনে নদীর তীরে বসে অশ্রুপাত করতেন, যখন সেই কথা তারা মনে করতেন। এই অদ্ভুত প্রবাসে কেমন করে তারা তাদের প্রভুর উদ্দেশ্যে গান গাইবেন? কিন্তু এই দুঃখ ঈশ্বর সম্বন্ধে তাদের নতুন একটি উপলব্ধি দিয়েছিল : ঈশ্বর মন্দিরের মধ্যে আটকে থাকা কোনো মূর্তি নয়। এমনকি কানানেও তিনি আটকে নেই। ঈশ্বর আছেন সর্বত্র। ঈশ্বর তাদের সাথে আছেন এই ব্যাবিলনেও, যেমন তিনি জেরুজালেমে তাদের সাথে ছিলেন, এবং মিশরেও। বাস্তবিকভাবেই ঈশ্বর সবসময় এবং সর্বত্রই তাদের সাথে ছিলেন। ঠিক যেভাবে তাদের নবীরা বলেছিলেন এর আগে। তারা পুরো বিষয়টি নতুনভাবে দেখতে সক্ষম হয়েছিলেন। শুধুমাত্র নবীরা তাদের আসলে কী বলতে চাইছেন তা যদি তারা আগেই বুঝতে পারতেন! কিন্তু তারা এখন এর প্রায়শ্চিত্ত করবেন।
তারা সেই গল্পগুলো সংগ্রহ করতে শুরু করেছিলেন, উত্তরাধিকারসূত্রে যে গল্পগুলো তাদের কাছে এসেছিল, তাদের জাতির অতীতে ঈশ্বরের সম্পাদিত নানা কর্মকাণ্ড। সেই কণ্ঠের গল্প, যা আব্রাহাম, আইজাক, ইয়াকব আর মোজেসের সাথে কথা বলেছিল। মিশর থেকে তাদের পালিয়ে আসা আর কানানে তাদের বসতিস্থাপনের গল্প; একজন সত্যিকারের ঈশ্বরের সাথে কীভাবে তারা অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়েছিলেন তার গল্প : স্বাধীনতায় কিংবা দাসত্বে, পরিচিত প্রিয় পাহাড় আর নদীসহ স্বদেশে অথবা নির্বাসনে, বিদেশে, যেখানে নদী আর ভাষা তাদের অপরিচিত, ঈশ্বর সবসময়ই তাদের সাথে থাকবেন। ব্যাবিলনে নির্বাসনে থাকার সময়ে এই ভাবনাগুলোই তাদের মনে এসেছিল, যখন তারা তাদের নিজেদের ইতিহাসের অর্থ বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। ঈশ্বর আবার তাদের সাথে কথা বলতে শুরু করেছিলেন তার প্রেরিত নবীদের মুখ দিয়ে। আর এবার তারা তাদের কথা শুনেছিলেন।
১০. নবীরা
নবীরা ভবিষ্যদ্বক্তা নন, তারা প্রকাশ বা প্রচার করেন। ঈশ্বরের কাছ থেকে তারা যা কিছু শোনেন সেটি যতটা তার প্রকাশ ও প্রচার করে থাকেন, সেভাবে তারা। ভবিষ্যতে কী হবে সেটি নিয়ে কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করেন না। তারা এমন কিছু প্রচার করেন, যা শুধুমাত্র ঐশী প্রত্যাদেশের মাধ্যমে জানা সম্ভব। তারা ঈশ্বরের নির্দেশ ও উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেন। তারা ঈশ্বরের সত্যকে এমনভাবে সবাইকে জানান যা মূলত শ্রোতাদের প্রভাবিত করার জন্যেই পূর্বপরিকল্পিত। ভবিষ্যৎ নিয়ে পূর্বধারণা তারা অবশ্য করতে পারেন, যদি সেভাবেই তারা সেটি ঈশ্বরের কাছ থেকে শোনেন। মেসোপটেমিয়ানদের মূর্তি দেবতাদের উপহাস করা ঈশ্বরের কণ্ঠ আব্রাহাম শুনেছিলেন। মোজেস শুনেছিলেন সেটি তাকে মিশরে ইজরায়েলাইটদের ত্রাণকর্তা হতে নির্দেশ দিচ্ছে, যেন তিনি পথ দেখিয়ে তাদের ঈশ্বর-প্রতিশ্রুত দেশে নিয়ে যেতে পারেন। যখন ইজরায়েলের সন্তানরা আবার কানানে তাদের বসতি গড়েছিলেন এবং রাজারা তাদের শাসন করেছিলেন, তখনো ঈশ্বরের কণ্ঠ নীরব হয়ে যায়নি। আর এটি শুনেছিলেন খুব সাধারণ কিছু মানুষ, যারা তাদের সাধারণ জগৎ থেকে বেরিয়ে এসে, পবিত্র পর্বতে মোজেসকে দেওয়া ঈশ্বরের আইনগুলো রক্ষা করতে শক্তিশালীদের ব্যর্থতাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। নবীরা ছিলেন প্ররোচিত করার মতো বক্তা, সাধারণ মানুষকে তাদের বার্তাগুলো বোঝাতে যারা গল্প ব্যবহার করতেন। এবং এমনকি রাজারাও তাদের নজরের বাইরে থাকতেন না। যেমন, একটি গল্পে আমরা দেখি, কীভাবে একজন নবী ইজরায়েলের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা ডেভিডকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। যার সাথে আমরা এর আগে পরিচিত হয়েছিলাম, গুলতি ব্যবহার করে, পাথর ছুঁড়ে যিনি দানব গলাইয়াথকে হত্যা করেছিলেন।
ডেভিড ইজরায়েলের সিংহাসনে বসেছিলেন কমন এরা শুরু হবার ১০০০ বছর আগে। তার রাজধানী জেরুজালেম (শান্তির নগরী) প্রতিষ্ঠা করার জন্যে তিনি একটি দুর্গসংরক্ষিত পাহাড়, মাউন্ট জাইওনকে নির্বাচন করেছিলেন। সুন্দর, যে-শহরটি বহু মিলিয়ন মানুষের কাছে এখনো পবিত্র একটি শহর। যদিও ডেভিড সাহসী যোদ্ধা আর আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের একজন নেতা ছিলেন, কিন্তু তিনি কোনোভাবেই ক্রটিমুক্ত একজন মানুষ ছিলেন না। একদিন নাথান নামের একজন নবী এসে তাকে সাম্প্রতিক একটি ঘৃণ্য ঘটনার বিবরণ দিয়েছিলেন : গ্রামের একজন ধনী ব্যক্তি, যার বহু হাজার মেষ ও গবাদি পশু ছিল এবং কোনোকিছুরই অভাব ছিল না। তার একজন ভাড়াটে ছিল, যে খুবই দরিদ্র একজন ব্যক্তি, তার একটি ভেড়া ছাড়া আর কিছুই ছিল না, যাকে তিনি তার নিজের মেয়ের মতোই ভালোবাসতেন। একবার যখন অপ্রত্যাশিতভাবে একজন অতিথি সেই ধনী ব্যক্তির বাড়িতে হাজির হয়েছিলেন, তিনি তার নিজের হাজার ভেড়া বাদ দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করতে সেই গরিবের ভেড়াটিকেই বেছে নিয়েছিলেন।
