যখন রাজা ডেভিড এই গল্পটি শুনেছিলেন, তিনি দ্রুত দাঁড়িয়ে উঠে দাবি করেছিলেন, এই অশুভ দানবটা কে? নাথান উত্তর দিয়েছিল, আপনিই হচ্ছেন সেই ব্যক্তি’। নাথান জানতেন, ডেভিড ইউরাইয়া’র স্ত্রী বাথশেবার সাথে রাত কাটিয়েছেন, যিনি ছিলেন তার সেনাবাহিনীর একজন অনুগত সৈন্য, এবং একটি সেনা-অভিযানে তখন তিনি ঘরের বাইরে ছিলেন। তার এই অপরাধ গোপন রাখতে তিনি ইউরাইয়াকে যুদ্ধক্ষেত্রেই হত্যা করার ব্যবস্থা করেন। তারপর তিনি বাথসেবাকে বিয়ে করেছিলেন গোপনে। নাথানের চ্যালেঞ্জের কারণে ডেভিড তার অপরাধ স্বীকার করেন এবং প্রায়শ্চিত্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। নবীরা জানতেন, গল্পের শক্তি কারো জীবনে মোড়পরিবর্তন করানোর ক্ষমতা রাখে। কিন্তু সব গল্পই তাদেরকে ঈশ্বরের অসন্তুষ্টির মুখোমুখি করার জন্যে পরিকল্পিত নয়। কখনো তিরস্কার বা সমালোচনা ছাড়াও, এগুলো সান্ত্বনা আর ভবিষ্যতের জন্যে আশার জোগান দেয়। যেমন আরেকটি গল্প –
ডেভিডের মৃত্যুর প্রায় চারশো বছর পরে, যখন ইজরায়েলাইটরা ব্যাবিলনে নির্বাসিত এবং হতাশা নিয়ে তারা তাদের প্রিয় জেরুসালেমকে স্মরণ করেছিলেন, তখন নির্বাসিতদের একজন তাদের জন্যে একটি বার্তা নিয়ে এসেছিলেন। বার্তাটি তিনি তাদের ঈশ্বরের কাছ থেকে পেয়েছিলেন। তার নাম ছিল ইজেকিয়েল। প্রথমে তিনি তাদের অতীতের জন্য গালমন্দ করেছিলেন। ঈশ্বর তাদের একদিন মিশরের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে প্রতিশ্রুত-দেশে এই কারণে নিয়ে আসেননি যে, তারা অন্যসব জাতির মতো একটি জাতিতে পরিণত হবে। অন্য জাতিগুলো বৈষয়িকভাবে সফল আর ধনী হতে চেয়েছিল এবং বিশ্বমঞ্চে দম্ভের সাথে তারা তাদের বিত্ত প্রদর্শন করতে চেয়েছিল। আর সেই অবস্থানে পৌঁছাতে তাদের সাহায্য করার জন্যে তারা দেবতাদের ব্যবহার করেছিল। ধর্ম তাদের জন্যে রাজনীতিরই একটি শাখা ছিল।
বেশ, ইসরায়েলের ঈশ্বর কোনো মূর্তি ছিলেন না, যা-কিনা রাজনীতিবিদরা ক্ষমতার খেলায় নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারতেন। একইভাবে অন্য কোনো জাতির মতো জাতি হবার কথাও ছিল না তাদের। কথা ছিল তাদের একটি পবিত্র জাতি হতে হবে, তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হবে এই পৃথিবীতে তাদের ঈশ্বরের সেবা করা। কিন্তু স্থানীয় রাজনীতির ক্ষমতা দখলের খেলায় তারা নিজেদের জড়িয়ে ফেলেছিলেন। সুতরাং ব্যাবিলনে তাদের নির্বাসন দেবার মাধ্যমে ঈশ্বর তাদের শাস্তি দিয়েছিলেন।
ইজরায়েলাইটদের এই নির্বাসনের কারণ হিসাবে ইজরায়েলের ‘পাপ’ দায়ী, ইজেকিয়েলের এই ব্যাখ্যাটি ধর্মের ইতিহাসের আরেকটি কৌতূহলোদ্দীপক ধারণা যুক্ত করেছিল। যখনই ইজরায়েলের জনগণ এলাকার ক্ষমতার সংগ্রামের কারণে দুর্দশায় পতিত হয়েছে, নবীরা তাদের সেই দুঃখের জন্যে তাদের উপর নির্যাতন করা শক্ৰ-সেনাদের দায়ী করেননি বরং ঈশ্বরের প্রতি তাদের বিশ্বাসের দুর্বলতা অথবা বিশ্বাসহীনতাকে দায়ী করেছিলেন। সেই ধারণাটির জন্ম হয়েছিল, যদি আপনার সাথে খারাপ কিছু ঘটে, সেটি ভাগ্যের খেলা নয়, এটি আপনার পাপের শাস্তি। আর যেহেতু ইজরায়েলের সাথে ক্রমাগতভাবেই খারাপ কিছু ঘটা অব্যাহত ছিল, সারাক্ষণই তারা তাদের পাপাচারের জন্যে নবীদের তিরস্কারও শুনেছিলেন। কিন্তু এমন সময়ও ছিল যখন ঈশ্বর এই তিরস্কার করা বন্ধ করে ইজরায়েলবাসীকে আশ্বস্ত করেছিলেন। এবং সান্ত্বনার সবচেয়ে মর্মস্পর্শী বার্তাগুলোর একটি তাদের কাছে এসেছিল ইজেকিয়েলের মাধ্যমে।
ইজেকিয়েল শুধুমাত্র কণ্ঠস্বরই শোনেননি, তিনি তার মনশ্চক্ষে নানা দৃশ্যও দেখেছিলেন। এবং এভাবে দেখা তার দৃশ্যগুলোর একটি বন্দি ইজরায়েলের জন্য একটি আশার বার্তা বহন করে এনেছিল। তার দেখা সেই দৃশ্যে তিনি একটি পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে প্রশস্ত একটি উপত্যকার দিকে তাকিয়ে ছিলেন, যে উপত্যকাটি শুষ্ক হাড় দিয়ে পূর্ণ ছিল। সেই কণ্ঠস্বরটি অস্থিগুলোকে উদ্দেশ্য করে একটি ভবিষ্যদ্বাণী করতে বলেছিল, যেন তিনি তাদের বলেন, তাদের মধ্যে নিশ্বাস প্রবেশ করবে, মাংশপেশি আবার তাদের আচ্ছাদিত করবে এবং তারা আবার একটি জীবন পাবেন। নির্দেশমতোই তিনি সেটি করেছিলেন। তাৎক্ষণিকভাবেই সব অস্থিগুলো পরস্পরের সাথে যুক্ত হবার শব্দ শুনতে পেলেন তিনি এবং মানুষের কঙ্কালে পূর্ণ হয়ে উঠেছিল উপত্যকাটি। এরপর সন্ধি, মাংসপেশি আর চামড়া সেই কঙ্কালগুলো আচ্ছাদিত করতে শুরু করেছিল, আর মৃত শরীরগুলো পূর্ণ করেছিল সেই উপত্যকা। একেবারে শেষে নিশ্বাস শরীরগুলোর মধ্যে প্রবেশ করেছিল আর তারা উঠে দাঁড়িয়েছিল। যেন প্রাণবন্ত সেনাদের একটি বিশাল দল পুরো উপত্যকাটিকে পূর্ণ করে রেখেছে। সেই কণ্ঠস্বরটি ইজেকিয়েলকে বলেছিল, এই অস্থিগুলো ইজরায়েলের সন্তানদের, যারা ভেবেছিল তাদের জীবন শেষ হয়ে গেছে। এবং তারা মৃত এবং ব্যাবিলনে তাদের সমাহিত করা হয়েছে। কিন্তু ঈশ্বর খুব শীঘ্রই তাদের নিজেদের প্রিয় জীবনে পুনরায় স্থাপন করবেন এবং তাদের প্রিয় ইজরায়েলে তিনি তাদের ফিরিয়ে নিয়ে আসবেন।
আর ঠিক সেটাই ঘটেছিল, কমন এরা শুরু হবার ৫৩৯ বছর আগে (খ্রিস্টপূর্বাব্দে)। পারস্যবাসীরা আসিরীয়দের পরাজিত করেছিল এবং পারস্যবাসীদের রাজা সাইরাস নির্বাসিতদের ইজরায়েলে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিলেন এবং আসিরীয় বাহিনীদের ধ্বংস করা মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ এবং তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্য পুনরায় প্রতিষ্ঠা করতে বলেছিলেন। এরপর দুইশো বছর ইজরায়েলাইটরা তাদের নিজেদের ধর্মীয় প্রথা কোনো বাধা ছাড়াই পালন করতে পেরেছিলেন। অবশেষে, তারা তাদের দেশের সেই নামকরণের মর্যাদা রাখতে পেরেছিলেন, যেখানে শুধুমাত্র ঈশ্বরই রাজত্ব করেন। অন্য কোনো জাতির মতো তারা নিজেদেরকে শুধুমাত্র মানব কোনো নেতার নেতৃত্ব দেওয়া একটি জাতি হিসাবে ভাবেননি বরং তারা তাদের দেশটি শাসন করেছিলেন একটি ধর্মীয় সমাজ হিসাবে, যেখানে ঈশ্বরই রাজা, একটি ধর্মতন্ত্র বা থিওক্রেসি। এবং তারা তাদের সেই মন্দিরটি পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলেন, যে-মন্দিরটি ছিল তাদের মধ্যে ঈশ্বরের উপস্থিতির একটি প্রতীক। তাদের অস্তিত্বের প্রাণকেন্দ্র। মন্দিরটির নির্মাণশেষে তারা সেটি ৫১৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদন করেছিলেন।
