দ্বিতীয় নির্দেশনাটিই ঈশ্বর সম্বন্ধে মানুষের উদ্ভাবিত সব ধারণাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্দৃষ্টিটি ধারণ করছে। এর মূল নিশানা ছিল ধর্ম। এবং শুধু সেই প্রকারের ধর্মই নয়, সেই মানুষগুলোকে, যা একটি স্বর্ণনির্মিত বাছুরের মূর্তির চারপাশে নাচতে প্ররোচিত করেছিল। এটি আমাদের জন্যে একটি সতর্কবার্তা ছিল, কোনো ধর্মীয় পদ্ধতিই ঈশ্বরের রহস্যকে ধরতে বা ধারণ করতে পারেনি। কিন্তু তারপরও আমরা ইতিহাসে, যেমন আমরা দেখব এই বইয়ে, ঠিক সেটাই অধিকাংশ ধর্মগুলো দাবি করা অব্যাহত রেখেছে। দ্বিতীয় নির্দেশটি ছিল একটি আদি সতর্কবাণী, যে সংগঠনগুলো দাবি করে, তারা ঈশ্বরের পক্ষে কথা বলছে, তারাই ঈশ্বরের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে, সব মূর্তিগুলোর মধ্যে যা সবচেয়ে বিপজ্জনক মূর্তি। কিন্তু এই বার্তাটি বুঝতে ইজরায়েলাইটদের বহুদিন সময় লেগেছিল।
সোনালি বাছুরের চারপাশে তাদের উন্মত্ত নৃত্যপর্বের পরে আবার পথ চলার সময় এসেছিল। কারণ তাদের প্রতিশ্রুত ভূমি জয় করতে হবে। মোজেস সেই দেশটিকে তাদের দৃষ্টিসীমানার মধ্যে নিয়ে এসেছিলেন। ঈশ্বরের কণ্ঠস্বর একটি পর্বতের উপর উঠে দূর থেকে সেই দেশটিকে দেখতে তাকে নির্দেশ দিয়েছিল। এখানেই মোজেস মৃত্যুবরণ করেছিলেন। সুতরাং তার সেনাপতি জশুয়া তাদের প্রতিশ্রুত দেশটিতে আগ্রাসনের মূল নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু এটি খুব সহজ বিজয় ছিল না। এমনকি সেই দেশে নিজেদের স্থাপিত করার পরও, সেই জায়গাটি ধরে রাখতে সারাক্ষণই তাদেরকে নিকটবর্তী গোত্রগুলোর সাথে যুদ্ধ করতে হয়েছে। সুতরাং ইজরায়েলাইটরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তাদের একজন রাজা দরকার, যিনি এই নিরন্তর যুদ্ধগুলোয় তাদের নেতৃত্ব দেবেন। অন্য সব গোত্রেরই তো রাজা আছে, তাহলে তাদের রাজা কেন থাকবে না? তাদের প্রথম রাজা ছিলেন সল, কানানে ইজরায়েলের অবস্থানটি সুরক্ষিত করতে তিনি তার রাজত্বকালের প্রায় পুরোটা সময় কাটিয়েছিলেন।
যাদের বিরুদ্ধে তাদের লড়তে হয়েছিল সেই গোত্রগুলির মধ্যে একটির নাম ছিল ফিলিস্টিন। এবং তাদের ভয়ংকর আর হিংস্র যোদ্ধাদের একজন ছিলেন একটি দানব, গলাইয়াথ। একদিন যখন যুদ্ধ শুরু করার আগে দুই সেনাবাহিনী পরস্পরের মুখোমুখি সারি বেঁধে দাঁড়িয়েছিল। গলাইয়াথ সামনে এগিয়ে এসে সলের সেনাবাহিনী থেকে যে-কাউকে তার সাথে একক যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। ইজরায়েলের পক্ষ থেকে কারোরই সেই সাহস হয়নি যতক্ষণ-না সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন একজন বালক মেষপালক, যে সবার সামনে এসে গলাই সেই একক যুদ্ধের আহ্বানের চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু সবাই তাকে দেখে ব্যঙ্গ করতে শুরু করেছিল। তারা জিজ্ঞাসা করেছিল, তার মতো একটি বালক কীভাবে প্রশিক্ষিত খুনি গলাইয়াথের সাথে লড়বে? ‘ঠিক যেভাবে নেকড়ের পাল থেকে আমি আমার বাবার মেষদের রক্ষা করে এসেছি’, উত্তর দিয়েছিল বালকটি, ‘গুলতি দিয়ে। সে সৈন্যদের সারি থেকে সামনে এগিয়ে এসে দানবটির সামনে দাঁড়ায়, যে তার দিকে তখন গর্জন করে তেড়ে এসেছিল। যখন গলাইয়াথ তার এক হাত পেছনের দিকে নিয়ে সেই বালকের উদ্দেশ্যে বর্শা ছুঁড়তে উদ্যত হয়েছিল, মেষপালক সেই বালকটি খুব শান্তভাবে, বিচলিত না হয়ে তার গুলতির মধ্যে একটি পাথর বেঁধে একবার মাথার উপর ঘুরিয়ে পাথরটি তার লক্ষ্যের দিকে ছুঁড়ে মেরেছিল। এটি ঠিক গলাইয়াথের কপালের মাঝখানে আঘাত করেছিল, এবং তাৎক্ষণিকভাবে তাকে ধরাশায়ী করেছিল। এরপর বালকটি গলাইয়াথের বিশাল তরবারি ব্যবহার করে তার শিরশ্চেদ করে। সেদিন সলের সেনারা যুদ্ধে জয় করেছিল এবং ইজরায়েলাইটরা একজন নতুন বীর পেয়েছিলেন। এই বালকটির নাম ছিল ডেভিড।
যখন সল যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন, ডেভিড তার জায়গায় ইজরায়েলের রাজা হয়েছিলেন। এমন একজন রাজা, ইজরায়েলাইটরা যাকে আর তার রাজত্বের সময়টিকে আদর্শ হিসাবে বিবেচনা করেন। তিনি ত্রিশ বছর রাজত্ব করেছিলেন, যার অধিকাংশ সময়ই তাকে যুদ্ধে ব্যয় করতে হয়েছে। তার ছেলে সলোমনই ইসরায়েলের প্রথম টেম্পল বা মন্দির নির্মাণ করেছিলেন, যেখানে তারা ঈশ্বরের প্রতি তাদের সেরা পশু এবং শস্যক্ষেতের সবচেয়ে ভালো ফসলগুলো বিসর্জন দিতেন। এবং তারা ঈশ্বরকে তাদের প্রশস্তির ধূপের ধোয়ায় শ্বাসরুদ্ধ করে রেখেছিলেন। মিশরে তাদের দাসত্বের দিন থেকে তারা বহুদূর অগ্রসর হয়ে এসেছিলেন। ইজরায়েল আর যাযাবর কতগুলো ক্ষুদ্রগোত্রের শিথিল একটি জোট ছিল না, এটি সত্যিকারের একটি জাতি হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তাদের নিজস্ব একজন রাজা ছিল, আকর্ষণীয় একটি মন্দিরও ছিল। অবশেষে তারা সফল হতে পেরেছিলেন ঠিকই, তবে শুধুমাত্র তাদের ‘ঈশ্বর’ সেভাবে বিষয়টি ভাবেননি।
সুতরাং যে-কণ্ঠস্বর মোজেসের সাথে কথা বলেছিল, সেটি আবারো কথা বলতে শুরু করেছিল। বহু প্রজন্ম ধরেই এটি নীরব ছিল, কিন্তু এবার এটি বজ্রপাতের মতো নতুন প্রজন্মের নবীদের মনে আঘাত হেনেছিল। এই কণ্ঠস্বর তাদের বলেছিল, ইজরায়েলাইটরা যেভাবে তাকে রূপান্তরিত করেছে, সেটি তিনি কতটা ঘৃণা করেন। তাদের ত্রাণকর্তা লোভী মূর্তিগুলোর মতোই একটি মূর্তিতে পরিণত হয়েছিল, সেই মানুষগুলোর দেবতাদের মতো, যাদের তারা সেই দেশে প্রতিস্থাপিত করেছিল। কিন্তু এমন কিছু তিনি কামনা করেননি। তিনি অসহায়দের জন্যে ন্যায়বিচার চেয়েছিলেন, তিনি চেয়েছিলেন বিধবা আর অনাথদের যেন দেখাশুনা করা হয়, সম্পত্তি থেকে যেন তাদের বঞ্চিত না করা হয়। সর্বোপরি তিনি চেয়েছিলেন, ইজরায়েলের সন্তানরা তাদের জীবনের সেই সরলতা যেন পুনরুদ্ধার করতে পারে, যে-সরলতা তাদের মধ্যে ছিল, যখন তারা মরুভূমিতে ছিলেন, যখন তারা পরস্পরের দেখাশুনা করতেন। কিন্তু আসলেই ঈশ্বর তাদের এতদিন ধরে কী বলে আসছেন, সেটি বুঝতে ভিনদেশে দাসত্বের আরো আরেকটি পর্ব তাদের পার করতে হয়েছিল।
