আর মোজেস যে-বিষয়টিকে ঠিক সেভাবে দেখছিলেন না, সেটি আবিষ্কার করতে খুব বেশিদিন সময় লাগেনি তাদের। তিনি বলেছিলেন, এমন একটি দেশে তিনি তাদের নিয়ে যাচ্ছেন, যে-দেশে প্রাচুর্যের কোনো অভাব নেই, কিন্তু তাদের মনে হয়েছিল, সেই প্রতিশ্রুত দেশে তাদের নিয়ে যেতে মোজেসের মধ্যে তেমন বিশেষ কোনো তাড়া নেই। মিশর ত্যাগ করার বহুদিন পরে তারা একটি পর্বতের পাদদেশে এসে হাজির হয়েছিল। সেখানে তিনি তাদের বলেছিলেন, এখানে অপেক্ষা করো, আমি উপরে গিয়ে ঈশ্বরের কণ্ঠ থেকে পরবর্তী নির্দেশাবলি শুনে আসি। কিন্তু ফিরে আসতে তিনি এতই দীর্ঘ সময় নিয়েছিলেন যে, ইজরায়েলাইটরা অস্থির হয়ে পড়েছিলেন, এবং তাদের কিছু করারও ছিল না। সুতরাং তাদের দেখাশুনা করার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা তাদের মনোযোগ অন্যদিকে পরিচালিত করতে একটি ধর্মীয় উৎসবের আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কারিগরদের দিয়ে বিশাল একটি ষাঁড়-শাবকের স্বর্ণমূর্তি তারা নির্মাণ করিয়ে ছিলেন, মিশরীয় ধর্মে দেবতাদের অসংখ্য প্রতাঁকের একটি। একটি বেদির উপর সেটি স্থাপন করে ইজরায়েলাইটদের তারা সেটি পূজা করতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। হয়তো তারা ইতিমধ্যে তাদের ছেড়ে আসা মিশরের কথা ভেবে বিষণ্ণ বোধ করছিলেন, অথবা মরুভূমির মধ্যে দিয়ে তাদের এই দীর্ঘ ক্লান্তিকর যাত্রার পর হয়তো তাদের খানিকটা বিশ্রামের প্রয়োজন ছিল। সোনার বাছুরের এই পূজা উন্মত্ত একটি অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। কোনো রক-কনসার্টে উত্তেজিত ভক্তদের মতো তারাও ঢোলের আওয়াজের সাথে মূর্তির চারপাশে ঘুরে সজোরে চিৎকার করে নাচতে শুরু করেছিলেন।
কিন্তু হঠাৎ করেই মোজেস ফিরে এসেছিলেন তাদের মধ্যে, এবং পরিস্থিতি দেখে তিনি খুবই ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন। এই আনন্দ-উৎসব থামিয়ে সবাইকে তিনি নীরব হতে নির্দেশ দেন। তিনি তাদের জানান, পর্বতের উপরে যে কণ্ঠস্বর তার সাথে কথা বলেছিল, তিনি দশটি নির্দেশের একটি তালিকা দিয়ে তাকে ফেরত পাঠিয়েছেন, যে-নির্দেশগুলো ইজরায়েলাইটদের অবশ্যই এই মুহূর্ত থেকে শুরু করে মান্য করে চলতে হবে। এই দশটি নির্দেশই ‘টেন কম্যান্ডমেন্টস’ নামে পরিচিত।
বেশিরভাগ নির্দেশই যে-কোনো গোষ্ঠী বা সমাজের জন্যেই প্রযোজ্য, যে সমাজটি এর সব সদস্যদের একত্রে রাখতে চায়। কোনো হত্যা নয়, কোনো চুরি নয়, সঙ্গী বা সঙ্গিনীর সাথে প্রতারণা নয়, মিথ্যাকথা নয়, শ্রমিকদের জন্যে একদিন বিশ্রাম নিশ্চিত করা ইত্যাদি খুবই যুক্তিসংগত নির্দেশ। প্রথম নির্দেশনাটিও যুক্তিসংগত ছিল। যে ঈশ্বর তাদের মিশর থেকে মুক্ত করে এনেছেন, তিনিই হবেন তাদের একমাত্র ঈশ্বর এবং কখনোই তারা অন্য কোনো ঈশ্বরের উপাসনা করতে পারবেন না। তারা বিষয়টি মেনে নিয়েছিলেন কারণ নিজেদের পক্ষকেই তারা সমর্থন করবে।
ইসরায়েলাইটদের যা বিস্মিত করেছিল সেটি হচ্ছে দ্বিতীয় নির্দেশটি, এটি তাদের কোনো ধরনের ছবি নির্মাণ করতে নিষেধ করেছিল, শুধু ঈশ্বরই নয়, যে কোনোকিছুরই ছবি তৈরি করা তাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। কোনো ছবি নয়, কোনো শিল্পকলা নয়, বিষয়টি তাদের হতবাক করেছিল। যে প্রাণীদের তারা শিকার করতেন কিংবা যে দেবতাদের তারা উপাসনা করতেন, সেগুলো আঁকা তাদের জন্য শাস নেবার মতোই স্বাভাবিক একটি ব্যাপার ছিল। এক টুকরো চক হাতে যে-কোনো শিশুই এর প্রমাণ দিতে পারবে। যে-কণ্ঠস্বরটি মোজেসের সাথে কথা বলেছিল তিনি যে-কোনো ধরনের শিল্পকলাকেই গভীর সন্দেহের চোখে দেখতেন, কিন্তু এটি চূড়ান্তভাবে ক্রোধোন্মত্ত হয়ে উঠত, যখন তার (ঈশ্বরের) নিজস্ব সত্তার নেপথ্যের রহস্যটি ধরার চেষ্টা করতে মানুষ চিত্রের শরণাপন্ন হতো। কিন্তু, ঈশ্বরের এই ক্ষোভের মূল কারণটি কী ছিল?
এই বিষয়টি বুঝতে সহায়ক হবে যদি আমরা প্রতীক-সংক্রান্ত আমাদের সেই আলোচনায় আবার ফিরে যাই। আমরা লক্ষ করেছিলাম, কীভাবে সেই প্রতীকগুলো মানুষকে আরো বৃহত্তর একটি বাস্তবতার সাথে সংযুক্ত করে। ঠিক যেভাবে এক টুকরো রঙিন কাপড় পুরো একটি দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। মানবতার সবচেয়ে উপযোগী আবিষ্কারগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে প্রতীক, সংক্ষিপ্ত একটি উপায়, যা আরো বিশাল কোনো বিমূর্ত বিষয়কে ধারণ করতে পারে, যেমন, একটি জাতির ধারণা। আর যখন লেখার পদ্ধতি আবিষ্কার হয়েছিল, তখন এই প্রতীক আরো বেশি উপযোগী প্রমাণিত হয়েছিল। এখন আপনি যে-কোনোকিছুই একটি বইয়ে শব্দে অনুবাদ করতে পারবেন, যে বইটি আপনি আপনার হাতে ধরতে পারবেন। কিন্তু ভুল হয় যখন সেই শব্দগুলো কিসের প্রতিনিধিত্ব করছে, সেই বিষয়ে আমরা সংশয়গ্রস্থ হয়ে পড়ি, এবং এগুলোর সাথে এমনভাবে আচরণ করি যেন এটি যা প্রতিনিধিত্ব করছে, এটি তারই সমতুল্য। কোনোকিছু সম্বন্ধে আমরা যা বলি’ সেটি কখনোই আসলে তেমন নয়। আপনি কিন্তু পানি’ শব্দটিকে পান করতে পারবেন না। এটি পানির জন্য ব্যবহৃত একটি প্রতীক, পানি নিজে’ নয়।
সমস্যা হচ্ছে যে, বিশ্বাসীরা প্রায়শই ধর্মীয় শব্দগুলো এমনভাবে ব্যবহার করে থাকেন, যেন এই নিয়মটি এই শব্দগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। যেন তাদের ঈশ্বরের জন্য ব্যবহৃত শব্দটি আসলেই ঈশ্বর। তাদের বইগুলো কাগজের উপর কালির দাগ নয়, বরং দুই মলাটের মধ্যে ঈশ্বর নিজেই চেপে বসে আছেন। আর বিস্ময়ের কোনো কারণ নেই, কাদের শব্দগুলো সেরা আর ঈশ্বরের জন্য সেরা প্রতীকগুলো কাদের আছে, সেই বিষয়গুলো নিয়ে কেন তারা প্রায়শই পরস্পরের সাথে যুদ্ধ করে। কোনোটাই আমার ধারণার ধারেকাছে আসতে পারে না, বজ্রপাতের মতো গর্জন করে দ্বিতীয় নির্দেশে ঈশ্বর তাদের বলেছিলেন। কোনো ধরনের মানব শিল্পকলা, সেটি দেয়ালে থাকা চিত্র হোক অথবা বইয়ের শব্দ, যে রূপেই প্রকাশ করা হোক না কেন, সেগুলোর কোনোটাই ঈশ্বরের অপার রহস্যময় ধারণাটি ধারণ করার নিকটে আসতে পারে না।
