কিন্তু একসময় ভয়াবহ একটি দুর্ভিক্ষের শিকার হয়েছিল পুরো কানান এলাকাটি। এর ঘাস আর কুয়ার পানি শুকিয়ে গিয়েছিল, সুতরাং ইজরায়েলাইটরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন, যেভাবে মানুষ সেই সময়ের সূচনা থেকেই করেছে, অন্য কোথাও গিয়ে তাদের ভাগ্যটা যাচাই করে দেখাই বরং তাদের জন্যে উত্তম হবে। এবং তারা আরো দক্ষিণে মিশরে এসে বসতি গড়েছিলেন, যেখানে নীলনদের পলিতে সমৃদ্ধ চারণভূমিতে তাদের গবাদি পশুরা চরে বেড়াত। প্রথমদিকে স্থানীয় মিশরীয়রা সাদরে তাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, এবং দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে, নীলনদের কাছে এবং সাগর থেকে খুব একটা দূরে নয়, গোশেন প্রদেশে তাদের বসতিস্থাপন করতে অনুমতি দিয়েছিল। এখানে ইজরায়েলাইটরা আরো বেশি সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিলেন এবং তাদের সংখ্যাও বেড়েছিল। কিন্তু তারা নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতেন। মূর্তির প্রতি আব্রাহামের তীব্র ঘৃণার কথা স্মরণ করে, স্থানীয় ধর্ম থেকে তারা নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন, যা মূলত ছিল একধরনের প্রাণবন্ত বহুঈশ্বরবাদ, যেখানে দেবদেবীরা কুকুর, বিড়াল, কুমির এবং অন্য প্রাণীদের রূপে উপাস্য ছিলেন।
প্রায়শই সেই মানুষগুলোর ক্ষেত্রে সাধারণত যা হয়ে থাকে, যারা সংখ্যাগরিষ্ঠদের সাথে মিশতে অস্বীকার করেন, ইজরায়েলাইটরা ক্রমেই মিশরীয়দের অপছন্দের পাত্র হয়ে উঠতে শুরু করেছিলেন। এবং যখন তারা সংখ্যায় বেড়েছিলেন, এবং আরো বেশি সফল হয়ে উঠেছিলেন, যে অপছন্দ তারা স্থানীয়দের মনে উদ্রেক করেছিলেন, সেটি একসময় ঘৃণায় রূপান্তরিত হয়েছিল। তারপর এই ঘৃণাই ইজরায়েলাইটদের উপর স্থানীয়দের নির্যাতন আর তাদেরকে বাধ্যতামূলক শ্ৰম-দাসে রূপান্তরিত করার একটি অজুহাতে পরিণত হয়েছিল। এবং যখন এই সংগঠিত নিষ্ঠুরতা তাদের দমন করতে ব্যর্থ হয়েছিল, মিশরীয় কতৃপক্ষ পরিকল্পিত উপায়ে তাদের ধ্বংস করার একটি নীতি গ্রহণ করেছিল। ইজরায়েলাইট নারীদের মিশরীয় পুরুষদের জীবনসঙ্গী হিসাবে গ্রহণ করতে বাধ্য করতে এবং বাকিদের সাধারণ জনসংখ্যার সাথে একীভূত করার উদ্দেশ্যে রাজা সদ্যজাত সব পুরুষ ইজরায়েলাইটদের জন্মের পরপরই হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। একজন মা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, চোখের সামনে নিজের সন্তানের হত্যাকাণ্ড দেখার চেয়ে বরং তাকে নিয়তির হাতেই ছেড়ে দেবেন। সুতরাং খুব সতর্কভাবে প্রস্তুত পানিরোধী একটি ঝুড়িতে শিশুটিকে রেখে, সেটি তিনি নীলনদের তীরে নলখাগড়ার বনের মধ্যে রেখে এসেছিলেন, ঠিক সেই জায়গায় যেখানে তিনি জানতেন ফারাও কন্যা, মিশরের রাজকুমারী, নিয়মিত স্নান করতে আসেন। তার এই কৌশলটি কাজে লেগেছিল। যখন রাজকন্যা নলখাগড়ার ঝোঁপের মধ্যে একটি ঝুড়িতে শিশুটিকে ভাসতে দেখেছিলেন, তার নিজের সন্তান হিসাবে তিনি শিশুটিকে দত্তক নেন এবং তাকে মিশরীয় একটি নাম দিয়েছিলেন, মোজেস।
যদিও তিনি রাজপ্রাসাদে বিলাসী আর স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি যে মিশরীয় নন, বরং একজন ইজরায়েলাইট, সেই বিষয়ে তিনি সচেতন ছিলেন। ক্রমশ দৃঢ় হতে থাকা একটি অনুভূতি তাকে একটি অনুধাবনে পৌঁছাতে সাহায্য করেছিল, আর সেটি হচ্ছে : তার নিয়তি ঐ ক্রীতদাসদের সাথে সংশ্লিষ্ট, তাদের শোষকদের সাথে নয়, যারা তাকে দত্তক নিয়েছিল এবং প্রতিপালন করেছে। সুতরাং তার স্বজাতিরা কেমন আছে সেটি দেখতে তিনি আরো বেশি কৌতূহলী হয়ে উঠেছিলেন। একদিন কৌতূহলই কর্মরত তাদের একটি দলের কাছে যেতে তাকে প্ররোচিত করেছিল। যখন তিনি দেখেছিলেন যে, তাদের মিশরীয় তত্ত্বাবধায়ক নৃশংসভাবে একজন ইজরায়েলাইটকে প্রহার করছেন, তিনি এতই রেগে গিয়েছিলেন, তিনি সেই মিশরীয়কে সেখানেই হত্যা করে মরুভূমির বালির মধ্যে কবর দিয়ে রেখেছিলেন।
আবারো একই কৌতূহল পরের দিন তাকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এবার তার ক্রোধ উসকে দিয়েছিল পরস্পরের সাথে হাতাহাতি করা দুইজন ইজরায়েলাইট। যখন তিনি এই ঝগড়া থামাতে হস্তক্ষেপ করতে উদ্যত হয়েছিলেন, ঝগড়াটি শুরু করেছিল যে ব্যক্তি, তিনি মোজেসকে দেখে ব্যঙ্গ করে বলে উঠেছিলেন : ‘ধরে নিচ্ছি এবার আপনি আমাকেও খুন করবেন, ঠিক গতকাল যেভাবে মিশরীয়কে মেরেছিলেন, তারপর একইভাবে আমাকেও বালির মধ্যে কবর দিয়ে রাখবেন’। তিনি আসলে কে, সেটি তারা বুঝতে পেরেছিলেন, আর এই খবর এখন দ্রুত প্রাসাদে পৌঁছে যাবে ও তাকে বিপদে ফেলবে, বিষয়টি অনুধাবন করে, মোজেস মরুভূমির দিকে পালিয়ে গিয়েছিলেন, যেখানে মেষপালকদের একটি পরিবার তাকে আশ্রয় দিয়েছিল।
এখানেই প্রথম তার সাথে আমাদের দেখা হয়েছিল এই বইয়ের শুরুতে, একটি মরুভূমির কাঁটা-ঝোঁপের সামনে তখন তিনি নতজানু হয়ে আছেন, যিনি সেই কণ্ঠটি শুনছিলেন, সেটি তাকে এমন কিছু বলছিল যা তিনি শুনতে চাইছিলেন না। তাকে সেই কণ্ঠস্বরটি বিপজ্জনক একটি কর্তব্য পালন করার জন্যে নির্দেশ দিয়েছিল, যে নির্দেশটি পালন করার কোনো ইচ্ছাই তার ছিল না। এটি সেই একই কণ্ঠস্বর, যা একদিন মেসোপোটেমিয়ানদের উপাস্যদেবতাদের প্রত্যাখ্যান করার মাধ্যমে আব্রাহামকে তার জীবনের ঝুঁকি নিতে বলেছিল। এটি সেই কণ্ঠস্বর, পুত্র আইজাককে বিসর্জন দেবার জন্যে যা পরে আব্রাহামকে নির্দেশ দিয়েছিল। এবং এটি সেই একই কণ্ঠস্বর, যা ইয়াকবকে তার নাম পরিবর্তন করে ইজরায়েল (যার অর্থ ‘ঈশ্বর শাসন করেন’) রাখতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।
