আমরা জানি কিছু আদি ধর্মে মানব বিসর্জনের প্রচলন ছিল। এবং কীভাবে এটি শুরু হয়েছিল সেটি বোঝাও খুব কঠিন নয়। দেবতাদের যদি স্বেচ্ছাচারী শাসকদের মতো ভাবা হয়, যাদেরকে আপনার পক্ষে রাখতে হবে, তাহলে আপনি বুঝতে পারবেন যে, কীভাবে আদিম মন হয়তো এমন কোনো উপসংহারে পৌঁছেছিল : সেরা প্রাণীটি বিসর্জন দেবার পাশাপাশি মাঝে মাঝে মানুষ বলি দিলে হয়তো আসলেই তাদের সমর্থন আর মন জয় করা সম্ভব হতে পারে। আব্রাহাম আর আইজাকের এই বিষণ্ণ গল্পে হয়তো একটি দূরের প্রতিধ্বনি আছে। কিন্তু এটি সেভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি প্রথাগত জুডাইজম বা ইহুদি ধর্ম, খ্রিস্টধর্ম আর ইসলামে। যে ধর্মগুলোর জন্যে এটি আবশ্যিক পাঠ্যাংশ। তাদের জন্য এই কাহিনিটি যা সংজ্ঞায়িত করেছে, সেটি হচ্ছে পৃথিবী সব বন্ধন উপেক্ষা করে। ঈশ্বরের ইচ্ছার প্রতি চূড়ান্ত নিবেদন আর আনুগত্য ও আত্মসমর্পণ। যদিও আমরা এখন এমন কোনো পিতাকে অবশ্যই উন্মাদ ভাবব, যিনি কিনা দাবি করেন, তার পুত্রকে হত্যা করতে ঈশ্বরই তাকে নির্দেশ দিয়েছেন–এমনকি যদি সে শেষমুহূর্তে সেটি না করে পিছিয়েও আসেন–এর মানে এই না যে, সব ধর্মই একটি পাগলামি এমন কোনো সিদ্ধান্তে আমাদের খুব দ্রুত পৌঁছাতেই হবে। কিন্তু এর। কিছু দাবির বিপরীতে প্রশ্নবোধক চিহ্ন রাখা বুদ্ধিমানের মতো কাজ হবে, সময়ের সাথে যখন এই গল্পটাকে আমরা আরো অনুসরণ করব। যে বিপদটি আমরা এখানে লক্ষ করেছি, সেটি হচ্ছে মানবমনের মধ্যে কথা বলা ঈশ্বরের কণ্ঠকে অতিরিক্ত বেশি কর্তৃত্ব দেবার প্রবণতা। মূর্তির প্রতি আব্রাহামের গভীর ঘৃণা এখানে একটি ভালো নির্দেশিকা।
আমরা তার চিন্তাটিকে অনুসরণ করেছি, যেখানে তিনি মানুষের সৃষ্টি বলে মূর্তিগুলো প্রত্যাখ্যান করে দাবি করেছেন, এদের স্বর্গীয় কোনো শক্তি বলে ভাবা পুরোপুরিভাবেই অদ্ভুত একটি বিষয়। কিন্তু ঈশ্বর সম্বন্ধে মানুষের ধারণাগুলো কি মানুষেরই আবিষ্কার নয়? আমরা হয়তো সেগুলো পাথর কিংবা কাঠের টুকরো ব্যবহার করে নিজেদের হাত দিয়ে খোদাই করে তৈরি করিনি। কিন্তু আমরা সেটি করেছি আমাদের মনের গভীরে, শব্দ আর ধারণা দিয়ে। এইসব ধারণাগুলোর নামে করা দাবিগুলোর ব্যাপারে আমাদের সতর্ক করে দেওয়ার জন্যে এটি যথেষ্ট একটি কারণ হওয়া উচিত। আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি এরকম কিছু দাবি কত বিপজ্জনক হতে পারে। সেই ধারণাটি ঈশ্বর হয়তো চাইতে পারেন আমরা যেন আমাদের সন্তানদের বিসর্জন দিই– প্রদর্শন করে ধর্ম মানবসমাজের জন্যে একটি শক্র হতে পারে। আব্রাহামকে নিয়ে ঈশ্বরের পরীক্ষা আর কিছু না হলেও অন্তত এটি প্রমাণ করে যে, মানুষ তাদের নিজেদেরকে যে-কোনোকিছু করতেই প্ররোচিত করতে পারে, যদি তারা মনে করেন সেই নির্দেশটি এসেছে ‘উপর’ থেকে। কোনো-না-কোনো সময়, প্রায় সবকিছুই ধর্মের নামে করা হয়েছে।
আমি বলেছিলাম যে, আব্রাহামের গল্পটি ধর্মের ইতিহাসের একটি ক্রান্তিকালীন মুহূর্ত। এটি বহুঈশ্বরবাদ থেকে একেশ্বরবাদ, একজন ঈশ্বরের ধারণার দিকে মানুষের মন ঘুরিয়ে দিয়েছিল। এবং এটি প্রদর্শন করেছিল ধর্মগুলো কখনোই স্থির বা স্থিতিশীল অবস্থায় থাকে না। সারাক্ষণই সেগুলো বিবর্তিত আর পরিবর্তিত হচ্ছে। ধর্ম অনেকটাই চলচ্চিত্রের মতো। আর সে-কারণে আব্রাহাম খুবই প্রভাবশালী একটি চরিত্র। তিনি বহুদূরে অজানায় যাত্রা করেছিলেন আর তার দিক পরিবর্তন করেছিলেন, সেটি শুধু পৃথিবীর উপরেই না, তার নিজের মনেও। এই ঘুরে দাঁড়ানো আর দিক পরিবর্তন করার ক্ষমতাই কৌতূহলোদ্দীপক সব মানুষেরই বৈশিষ্ট্যসূচক একটি চিহ্ন। আর ধর্ম বোঝার জন্যে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি।
আব্রাহাম গন্তব্যহীন একটি পথের যাত্রী ছিলেন, এবং তার মৃত্যুর পর, যে গোত্রগুলো তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেগুলোর সদস্যরা তাদের যাত্রা অব্যাহত রেখেছিলেন, যেমন মানুষ সবসময়ই করেছে আরো উত্তম জীবনের অনুসন্ধানে। কাহিনি বলছে, আব্রাহামের মৃত্যুর কয়েক প্রজন্ম পরে একটি বড় দুর্ভিক্ষ কানান আক্রমণ করেছিল, যা বাধ্য করেছিল তার উত্তরসূরিদের আবার পথে নামতে। এইবার তারা দক্ষিণে আরেকটি বিশাল নদী অতিক্রম করে মিশরে গিয়েছিলেন। যেখানে তাদের ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল। যেখানে মোজেসের সাথে আবার আমাদের দেখা হবে।
০৮. নলখাগড়ার বনে
আইজাক, যে ছেলেকে নিজের মাথার মধ্যে শোনা কণ্ঠের নির্দেশে আব্রাহাম প্রায় হত্যা করতে গিয়েছিলেন, তিনি বেঁচেছিলেন এবং নিজেই একসময় সন্তানের পিতা হতে পেরেছিলেন। আর আইজাকের ছেলে ইয়াকব, এর আগে তার পিতামহের মতো তার প্রতি নির্দেশিত ঈশ্বরের কণ্ঠ শুনতে পেয়েছিলেন। কণ্ঠটি বলেছিল, তাকে আর ইয়াকব বলে ডাকা হবে না। এখন থেকে তার নতুন নাম হবে ‘ইজরায়েল’, যার অর্থ ‘ঈশ্বর শাসন করেন’। সুতরাং তার বারোটি ছেলেকে ডাকা হতো চিলড্রেন অব ইসরায়েল (ইজরায়েলের সন্তান) নামে অথবা ‘ইজরায়েলাইটস’। দাদা আব্রাহামের মতোই, ইয়াকব, এখন যার নাম ইজরায়েল, একজন যাযাবর মেষপালক ছিলেন। পানি আর ভালো চারণভূমির সন্ধানে তিনি তার গবাদি পশুর পালকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যেতেন। ধীরে ধীরে ইজরায়েলাইটসরা একটি গোত্র হিসাবে আকারে বেশ বড় আর সবচেয়ে সমৃদ্ধ পানির কুয়া আর সেরা চারণভূমির জন্যে অন্য গোত্রগুলোর সাথে প্রতিযোগিতা করার মতো তারা যথেষ্ট পরিমাণ শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল।
