এটি ছিল দেবতাদের নিয়ে ভাবার একটি নতুন উপায়। একসময় গ্রহণযোগ্য দৃষ্টিভঙ্গি ছিল যে, প্রতিটি গোত্রের একটি নিজস্ব দেবতা (বা দেবতারা) থাকবে। কিন্তু এই ধারণাটি, একজন মাত্র দেবতা মানুষের নিয়তি নিয়ন্ত্রণ করেন, এমনকি হয়তো ইতিহাসও যিনি নিয়ন্ত্রণ করেন, সেটি ছিল নতুন এবং ভীতিকর। যখন মোজেস সেই কণ্ঠস্বরটির নাম জিজ্ঞাসা করেছিলেন, যিনি তার সাথে কথা বলছিলেন, তার উত্তরটিও এমনকি আরো বেশি অস্বস্তিকর ছিল। ‘আমি’, শুধুমাত্র এটাই ছিল তার উত্তর। এই বাক্যটির প্রকৃত অর্থ কী হতে পারে সেটি সমাধান করা বেশ কঠিন একটি ব্যাপার। কিন্তু এটি প্রস্তাব করেছিল যে, এই কণ্ঠস্বরই সব
জীবন আর শক্তির উৎস, এবং যা কিছুর অস্তিত্ব আছে এটি তার নেপথ্য অর্থ। এবং যাদের প্রতি এটি উচ্চারিত হয়েছিল তারা অনুভব করেছিলেন, এর সাথে নিজেদের যুক্ত করলে তাদের নিজেদের বিপদে পড়ার সম্ভাবনা আছে।
এমন নয় যে, এই ধরনের একটি পরিস্থিতিতে তাদের কিছু বলার সুযোগ আছে। এটি প্রায় শূন্য থেকে হাজির হয়ে তাদের মনে বজ্রপাতের মতো আঘাত হানে, এমন কোনো ধারণার মতো যে ধারণার কাছ থেকে কোনো নিস্তার নেই। এটি তাদের বলেছিল, মাত্র একজন’ ঈশ্বর আছেন, এবং শুধুমাত্র একজন ঈশ্বর হতে পারেন। বাকি সব দেবতারাই মানবসৃষ্ট, হয় মানব কল্পনা তাদের সৃষ্টি করেছে অথবা আক্ষরিকার্থে মানুষের হাতেই তাদের তৈরি করা হয়েছে। এইসব তথাকথিত দেবতারা সব মিথ্যা। এই মিথ্যাই মানুষের প্রাণশক্তিকে নষ্ট করেছে এবং সে-কারণেই এদের অবশ্যই প্রত্যাখ্যান করতে হবে, এবং একজন ও একমাত্র সত্যিকার ঈশ্বর, যিনি ইজরায়েলের সন্তানদের নির্বাচিত করেছেন, এই সত্যটি সারা পৃথিবীতে সবাইকে জানাতে হবে। কোনো সন্দেহ নেই যাদের কাছে এই বার্তা এসেছিল, তারা আতঙ্কিত হয়েছিলেন। বহুসংখ্যক দেবতা এবং অসংখ্য উৎসাহী পূজারি এবং এই দেবতাদের সেবা দেবার নামে প্রতিষ্ঠিত নানা ব্যবসায় পৃথিবী পূর্ণ। মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে অপমান করা এমনিতেই যথেষ্ট খারাপ একটি কাজ, এবং যেভাবে তারা তাদের জীবিকা নির্বাহ করে সেটিকে হুমকি দেওয়া এমনকি আরো বিপজ্জনক।
সে-কারণে মোজেস এই কণ্ঠস্বরের দাবিগুলোকে অস্বীকার করতে চেষ্টা করেছিলেন। তিনি কেবলই মিশর আর এর শাসকদের কাছ থেকে থেকে পালিয়ে এসেছেন। কিন্তু এখন তার মাথার মধ্যে এই কণ্ঠস্বরটি তাকে আবার মিশরে ফিরে যেতে এবং সেখানে একটি বিপ্লব সংগঠিত করতে নির্দেশ দিচ্ছে। তার দায়িত্ব হচ্ছে ইজরায়েলাইটদের নেতৃত্ব দেয়া –ইতিমধ্যেই তিনি যাদের অকৃতজ্ঞ আর উছুঙ্খল একদল মানুষ হিসাবে জানেন–তিনি যেন তাদের মিশর থেকে বের করে অন্য একটি দেশে নিয়ে যান। যদি ধরে নেই তারা সেখানে পৌঁছাতে পারলেন, কিন্তু কে জানে ঠিক কী ধরনের অভ্যর্থনা তাদের জন্যে অপেক্ষা করছে। সেই দেশে, যার প্রতিশ্রুতি তাদের দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই কণ্ঠস্বরটির তীব্রতা কমেনি, এবং অনিচ্ছাসত্ত্বেও মোজেস সেই নির্দেশ মানতে বাধ্য হয়েছিলেন। দুটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে আবার তিনি মিশরে ফিরে এসেছিলেন। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি ছিল, ইজরায়েলাইটদের প্ররোচিত করা যে, আব্রাহাম, আইজাক আর ইয়াকবের ‘ঈশ্বর তাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তিনি তাদের মিশর থেকে নতুন একটি দেশের দিকে নিয়ে যান, যেখান থেকে তারা বহু প্রজন্ম আগে মিশরে এসেছিল। অভিযোগ আর অনুযোগ আর প্রতিবাদের পর তারা অবশেষে রাজি হয়েছিলেন তাকে অনুসরণ করতে, শুধুমাত্র যদি তিনি তাদের মুক্তি দিতে ফারাওকে রাজি করাতে পারেন। আর কীভাবে তিনি সেটি করার পরিকল্পনা করছেন?
মোজেসের প্রথম পদক্ষেপ ছিল, মিশরীয়দের কাছ থেকে কয়েকদিনের ছুটি আদায় করা, ইজরায়েলাইটরা যেন গোশেনের উত্তরে মরুভূমিতে তাদের ঈশ্বরের উপাসনা করতে পারেন। ইজরায়েলাইটদের অহংকারী আর একচেটিয়া স্বতন্ত্র ধর্মের প্রতি ইতিমধ্যেই ঘৃণাপূর্ণ মিশরীয়রা এই হিংসুটে দেবতার পূজা করতে। তাদের ছুটি দিতে অস্বীকার করেছিল। এরপর এই গল্পটি আমাদের বলছে, মোজেস দীর্ঘমেয়াদি একটি পরিকল্পনা নিয়ে তার আন্দোলন পরিচালনা করেছিলেন, যেখানে ইজরায়েলাইটদের ঈশ্বর মিশরীয়দের উপর একের-পর-এক দুর্যোগ ঘটিয়ে আক্রমণ করেছিলেন। অবশেষে এটি এর চূড়ান্ত পরিণতি পেয়েছিল সেই ইজরায়েলাইটদের প্রথম পুত্রদের হত্যা করার মতো ভয়ংকর ঘটনার প্রতিধ্বনি করে, অতীতে যে-গণহত্যাটি একদিন মোজেসের জন্য ফারাও’র নিজের পরিবারে প্রতিপালিত হবার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল।
মোজেসকে সেই কণ্ঠস্বর নির্দেশ দিয়েছিল, ইজরায়েলাইটরা যেন একটি নির্দিষ্ট রাতে তাদের ঘরের দরজার বাইরে বের না হয় এবং প্রতিটি পরিবার একটি মেষ বিসর্জন দেবে এবং দরজার উপর সেই মেষের রক্ত দিয়ে একটি চিহ্ন এঁকে রাখবে, যা এটিকে মিশরীয়দের বাসা নয় বরং ইজরাইলাইটদের বাসা হিসাবে চিহ্নিত করবে। এবং সেই মধ্যরাতে প্রতিটি মিশরীয় পরিবারের প্রথম সন্তান, এমনকি তাদের গবাদি পশুর প্রথম সন্তানটিকে ঈশ্বর সারা দেশজুড়ে হত্যা করেছিলেন, কিন্তু রক্তদ্বারা চিহ্নিত ঘরগুলো তিনি এড়িয়ে যান তাদের কোনো ক্ষতি না করে। যখন সকাল এসেছিল, ভয়ংকর আর্তনাদে সারাদেশ কেঁপে উঠেছিল, দিনের আকাশ যা হাহাকারে বিদীর্ণ করেছিল। এমন কোনো মিশরীয় বাড়ি ছিল না যেখানে সেই রাতে কেউ মারা যায়নি। সুতরাং ফারাও মোজেসকে। ডেকে পাঠান এবং বলেন, ‘তুমি জিতেছ, তোমার স্বজাতির মানুষগুলোকে তুমি মরুভূমিতে নিয়ে যাও, কিছুদিনের জন্যে তোমাদের ঈশ্বরের উপাসনা করতে, আমাদের ত্যাগ করে যাও, যেন আমরা আমাদের মৃতদের নিয়ে শোক করতে পারি। সুতরাং সেই পালিয়ে যাবার পরিকল্পনাটি সক্রিয় হয়ে উঠেছিল।
