এর কারণ, তিনি ছিলেন একজন নবী। যিনি তার মাথায় ঈশ্বরের কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়েছিলেন। এবং সেই কণ্ঠ তাকে সতর্ক করেছিল, এইসব দেবতাদের পূজা করা শুধুমাত্র একটা খেলা নয়-যা মানুষকে বিনোদন দেয় অথবা মূর্তি ব্যবসায়ীদের জীবিকা অর্জনে সহায়তা করে। এর ভিত্তি একটি ভয়ংকর আর বিপজ্জনক মিথ্যা। শুধুমাত্র একজনই ঈশ্বর আছেন, তিনি শুধুমাত্র এইসব মূর্তি আর দেবতাদের ছবি দেখেই বিতৃষ্ণাই অনুভব করেননি, এগুলো তিনি তীব্রভাবে ঘৃণা। করতেন, কারণ এগুলো সত্যিকার সৃষ্টিকর্তা পিতার সাথে পরিচয় হওয়া থেকে। তার নিজের সন্তানদের বাধা দেয়। আগন্তুকের দ্বারা অপহৃত হওয়া সন্তানের পিতামাতাদের মতো তিনি তাদের ফেরত চান, আর তাদের যারা অপহরণ করছিল, তাদের শাস্তি চান।
এটি মানবকাহিনির ক্রান্তিকালীন গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত, এবং বিষয়টি নিয়ে আরেকটু ভাবা যুক্তিযুক্ত হতে পারে। আমাদের ইতিহাস থেকে স্পষ্ট যে, পরস্পরকে ঘৃণা করার ব্যাপারে মানুষ খুবই দক্ষ। সাধারণত যারা আমাদের থেকে কোনো না-কোনোভাবে ভিন্ন, তারাই আমাদের ঘৃণার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। বর্ণ, শ্রেণি, রঙ, লিঙ্গ, রাজনীতি, এমনকি চুলের রঙও আমাদের ভেতরে কুৎসিত আচরণ উসকে দিতে পারে। ধর্মও সেটি করতে পারে। বাস্তবিকভাবে, ধর্মীয় ঘৃণা সম্ভবত এই ধরনের মানব অসুস্থতার সবচেয়ে প্রাণঘাতী রূপ, কারণ এটি মানুষের ঘৃণাকে ঐশ্বরিক যৌক্তিকতা প্রদান করে। কারো মতামত পছন্দ নয় বলে সেই মানুষগুলোকে ঘৃণা করা এক জিনিস। তবে বিষয়টি পুরোটাই ভিন্ন হয়ে ওঠে, যখন এমন কিছু বলা হয় যে, ঈশ্বরও তাদের ঘৃণা করেন এবং তিনি তাদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে চান। সুতরাং খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি লক্ষ করা যে, ধর্মীয় বিশ্বাস মানব সম্পর্কগুলোয় একটি বিপজ্জনক উপাদান যুক্ত করে আব্রাহামের কাহিনি থেকে আরেকটি ঘটনা যেমন সেটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়।
মূর্তিগুলোকে ঘৃণা করার নির্দেশ দেওয়া ছাড়াও, আব্রাহামের মাথার মধ্যে সক্রিয় হয়ে ওঠা সেই কণ্ঠ তাকে তার পিতৃভূমি ত্যাগ করে অন্য একটি দেশে চলে যাবার জন্যে নির্দেশ দিয়েছিল, যেখানে একটি সময় তিনি একটি মহান জাতির সূচনা করবেন। সুতরাং জেনেসিস আমাদের বলছে যে, আব্রাহাম তার পরিবার এবং গবাদি পশুর পাল নিয়ে দেশত্যাগ করেছিলেন, এবং তিনি ইউফ্রেতিস অতিক্রম করে পশ্চিমদিকে তার যাত্রা অব্যাহত রেখেছিলেন, যতক্ষণ-না তিনি কানানে এসে পৌঁছান। কানান আজ পরিচিত ইসরায়েল অথবা প্যালেস্টাইন নামে, একটি বিশাল সাগরের পূর্বতীরে যার অবস্থান, যে সাগরটিকে আমরা এখন ভূমধ্যসাগর নামে চিনি। তবে সাগরতীরে নয় বরং আব্রাহাম তার বসতি গড়েছিলেন আরো অভ্যন্তরে, দেশটির মেরুদণ্ডের মতো বিস্তৃত চুনাপাথরের পাহাড়শ্রেণির ধার ঘেঁষে বিস্তৃত সমতলে। এখানেই তার পরিবার আর তার অনুসারী গোত্র-সদস্যরা ক্রমশ আরো সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিলেন।
তারপর একদিন আবার সেই কণ্ঠটি আব্রাহামের মাথায় কথা বলে উঠেছিল। এটি তাকে নির্দেশ দিয়েছিল তার ছেলে আইজাককে স্থানীয় পাহাড়ের উপর একটি জায়গায় নিয়ে যেতে, যেখানে তাকে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে বিসর্জন দিতে হবে। আব্রাহাম পশুহত্যা এবং তাদের পুড়িয়ে ঈশ্বরের প্রতি বিসর্জন দেওয়ায় অভ্যস্ত। ছিলেন, কিন্তু তিনি কখনোই তার নিজের সন্তানদের কাউকে বিসর্জন দেবার এমন কোনো নির্দেশ পাননি। কিন্তু তিনি সেই নির্দেশকে প্রশ্ন কিংবা অমান্য করার সাহসও পাননি। পরের দিন বেশ সকালেই তিনি ঘুম থেকে উঠে বেশকিছু জ্বালানি কাঠ দড়ি দিয়ে বেঁধে তার গাধার পিঠে দুজন তরুণ আর তার ছেলেকে নিয়ে বের হয়েছিলেন। যখন সেই পাহাড়ের নিচে এসে পৌঁছেছিলেন, তিনি সেই তরুণদের নির্দেশ দিয়েছিলেন তার জন্যে সেখানে অপেক্ষা করতে এবং তার গাধাটির পাহারা দিতে। তিনি জ্বালানি কাঠের আঁটিটা পুত্র আইজাকের পিঠে বেঁধে দেন, একটি মশাল জ্বালান এবং ধারালো একটি ছুরি তার কোমরবন্ধে গুঁজে নেন। এবং দুজনেই পর্বতের উপরে উঠতে শুরু করেন। যখন তারা এই পাহাড় বেয়ে উঠছিলেন আইজাক তার বাবাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, বিসর্জনের জন্য আপনার কাছে আগুন আর ছুরি প্রস্তুত আছে বাবা? কিন্তু সেই প্রাণী কৈ, যাকে আপনি জবাই করবেন? উত্তরে আব্রাহাম বলেছিলেন, চিন্তা কোরো না পুত্র, আমাদের যা দরকার তা সব ঈশ্বরই জোগাড় করে দেবেন।
যখন তারা পাহাড়ের উপর সেই জায়গায় উপস্থিত হলেন, যেখানে বিসর্জন দেবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আব্রাহাম পাথর দিয়ে সাজিয়ে একটি সাময়িক পূজার বেদি তৈরি করলেন, এবং এর উপর জ্বালানি কাঠ ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। তারপর তিনি তার আতঙ্কে কম্পমান পুত্রকে ধরে মুখ নিচু করে সেই কাঠের সাথে বেঁধে ফেলেন। এরপর তিনি আইজাকের লম্বাচুল দুই হাতে ধরে মাথাটা টান দিয়ে উপরে তোলেন তার গলাটি উন্মুক্ত করতে। এরপর তিনি তার কোমর থেকে ছুরিটি টেনে বের করেন এবং তার পুত্রের গলা কাটতে উদ্যত হন, ঠিক যখনই এই কাজটি তিনি করবেন, তখনই তার মাথার সেই কণ্ঠস্বর আবার তাকে নির্দেশ দিয়েছিল।
‘আব্রাহাম, তোমার পুত্রকে হত্যা কোরো না, এটি বলেছিল, আমার নির্দেশে তাকে হত্যা করতে তোমার ইচ্ছাটাই প্রমাণ করে, মানবিক আবেগের চেয়ে আমার প্রতি তোমার আনুগত্য আরো বেশি শক্তিশালী। সুতরাং, আমি তোমার পুত্রের জীবন রক্ষা করব। ভয়ানকভাবে কম্পমান আব্রাহাম তার ছুরি নিচে নামিয়ে নেন, তারপরই তিনি কাছেই একটি বড় রামছাগল লক্ষ করেন, একটি কাঁটা ঝোপে যার শিং আটকে গিয়েছিল। উদ্বেগ থেকে মুক্তির উন্মত্ততায় তিনি তার পুত্রের পরিবর্তে দ্রুত সেই প্রাণীর গলা জবাই করেন এবং ঈশ্বরের প্রতি নিবেদন করেন সেই বেদিতে এই মাউন্ট মরিয়া’র বিষয়ে আমাদের কখনোই বলা হয়নি, আইজাক এই। ভয়ানক অভিজ্ঞতা নিয়ে কী ভেবেছিলেন। কিন্তু সেটি কল্পনা করা খুব একটা কঠিন কাজ নয়।
