উত্তরাধিকারসূত্রে আমাদের কাছে আসা কাহিনি অনুযায়ী, আব্রাহাম ছিলেন টেরাহ’র পুত্র। তার দুইটি ভাই ছিল, নাহোর এবং হারান। বাইবেলে বুক অব জেনেসিসে আমরা তাদের কাহিনি খুঁজে পাই। কিন্তু হিব্রু বাইবেলের একটি প্রাচীন সহায়ক-বইয়ে তাদের সম্বন্ধে আমরা আরো কয়েকটি গল্প পাই। এটি আমাদের বলছে, তারা মেষপালক ছিলেন, ইউফ্রেটিসের উপত্যকায় সমৃদ্ধ তৃণভূমিতে তারা তাদের গবাদি পশুদের চারণ করাতেন। আর টেরাহ’র একটি লাভজনক পার্শ্বব্যবসা ছিল, তিনি সেই এলাকায় বসবাসরত মানুষদের উপাসনা করা দেবতাদের মূর্তি নির্মাণ করতেন। মেসোপটেমিয়ার অধিবাসীদের চারজন প্রধান দেবতা ছিলেন। ‘আনু’ ছিলেন স্বর্গের দেবতা, ‘কি’ ছিলেন পৃথিবীর দেবী, এনলিল’ ছিলেন বাতাসের দেবতা আর ‘একি’ ছিলেন পানির দেবতা। সূর্য আর চাঁদকেও তারা দেবতা হিসাবে উপাসনা করতেন। এখানে লক্ষ করার মতো একটি বিষয় হচ্ছে, কীভাবে প্রাচীন ধর্মগুলোয় প্রাকৃতিক শক্তিগুলোকে প্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবেই স্বর্গীয় বিবেচনা করা হতো।
ভারতবাসীদের মত, মেসোপটেমিয়ার অধিবাসীরাও এমন কিছু চেয়েছিলেন যেদিকে তারা তাকাতে পারবেন, যখন দেবতাদের প্রতি তারা তাদের ভক্তি প্রদর্শন করবেন। টেরাহ বেশ আনন্দের সাথে তাদের চাহিদা পূরণ করতেন তার কারখানা থেকে মূর্তি সরবরাহ করে। একদিন যখন তিনি তার দোকানে অনুপস্থিত ছিলেন, আর ব্যবসা দেখাশুনার দায়িত্বে ছিলেন আব্রাহাম, তখন সেখানে মূর্তি কিনতে এসেছিলেন একজন বৃদ্ধ ব্যক্তি। আব্রাহাম তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আপনার বয়স কত? বৃদ্ধ বলেছিলেন, ‘সত্তর’। তাহলে বলতেই হবে, আপনি আসলেই একজন নির্বোধ’, আব্রাহাম তাকে বলেছিলেন, ‘সাত দশক আগে আপনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তারপরও আপনি এমন একটি মূর্তিকে পূজা করবেন, যা এই দোকানের পেছনের কারখানাতে কেবল গতকালই বানানো হয়েছে। বৃদ্ধ মানুষটি কিছুক্ষণ বিষয়টি নিয়ে ভাবলেন, তারপর আর মূর্তি না কিনে তিনি টাকা ফেরত নিয়ে দোকান থেকে বের হয়ে যান।
ঘটনাটি জানতে পেরে তার ভাইরা খুবই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। তারা তাদের বাবাকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন, আব্রাহাম কিন্তু পারিবারিক ব্যবসাটিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে তার অনমনীয় মতামতের কারণে। সুতরাং টেরাহ আব্রাহামকে দোকানের সামনের অংশ থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন, এবং তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন পূজার নিবেদনগুলো সংগ্রহ করতে, খদ্দেররা যা নিয়ে আসতেন। দোকানেরই একটি ঘরে সাজানো তাদের প্রিয় দেবতাদের উদ্দেশ্যে। একদিন এক নারী দেবতাদের একজনের জন্য খাবার উপহার নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। প্রচলিত উপায়ে সেটি গ্রহণ না করে, আব্রাহাম তাকে ব্যঙ্গ করেছিলেন, ‘বেশ, এই দেবতার একটি মুখ আছে বটে, তিনি বলেছিলেন, কিন্তু আপনার তৈরি করা খাবার এ না পারবে খেতে, না পারবে আপনাকে ধন্যবাদ বলতে। এর হাত আছে, কিন্তু তার সামনে এই খাবার রাখলেও হাত দিয়ে এক টুকরো খাবারও সে মুখে তুলতে পারবে না। যদিও এর সুন্দর করে খোদাই করা পা আছে, সেই পা তুলে এটি এক পাও আপনার দিকে এগিয়ে আসতে পারবে না। অন্তত আমার কাছে, যারা এটি বানিয়েছেন আর যারা এটি পূজা করেন তারা এই মূর্তিটার মতোই নির্বোধ আর অকেজো’।
দুটি কারণে সেই সময়ে এই ধরনের কথাবার্তা খুবই বিপজ্জনক একটি বিষয় ছিল। সমাজে প্রতিষ্ঠিত একটি ধর্মকে চ্যালেঞ্জ করা কখনোই জনপ্রিয় পদক্ষেপ নয়। আর এটি আরো বেশি খারাপ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে, যদি সমালোচনা স্থানীয় অর্থনীতির জন্যে হুমকিস্বরূপ হয়। এটি ছিল এমন একটি সমাজ যেখানে বহু দেবতারই পূজা করা হতো, এবং এইসব পূজনীয় দেবতাদের মূর্তি বানানো বেশ লাভজনক একটি ব্যবসা ছিল। সুতরাং আব্রাহাম নিজেকে ঝামেলায় জড়িয়ে ফেলেছিলেন। তার জন্যে তখন একমাত্র নিরাপদ পথ ছিল, সেই শহর ত্যাগ করে চিরকালের জন্যে চলে যাওয়া। এই মুহূর্ত থেকেই তিনি গন্তব্যহীন যাযাবরে পরিণত হন, যিনি তার পরিবার আর পশুর পাল নিয়ে অনেক দূরত্ব অতিক্রম করেছিলেন। কিন্তু এটি তার একটি আধ্যাত্মিক যাত্রাও ছিল, যা ধর্মীয় ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল।
আব্রাহামের গল্পটি সেই মুহূর্তটিকে চিহ্নিত করে, যখন বহুঈশ্বরবাদ থেকে একেশ্বরবাদ বরাবর ধর্মীয় ভাবনাগুলোর দিক পরিবর্তন শুরু হয়েছিল, যখন বহু। দেবতার প্রতি শিথিল আনুগত্য আর উপাসনা, একজন ঈশ্বরের প্রতি কঠোর আনুগত্যে রূপান্তরিত হতে শুরু করেছিল। এই পরিবর্তনটিকে প্ররোচিত করেছিল কি? কেন আব্রাহাম তার বাবার দোকানের এইসব নিরীহ ছোট মূর্তিগুলোর ব্যাপারে এত ক্ষুব্ধ ছিলেন? আব্রাহামের মনের ভিতর প্রবেশ করতে আমাদেরকে কল্পনার আশ্রয় নিতে হবে। কিন্তু সেখানে আসলে কী ঘটেছিল তার অংশবিশেষ অনুধাবন করার বিষয়টি বেশ সহজ। তিনি দেখেছিলেন যে, তার বাবা এই ছোট মূর্তিগুলো খোদাই করছেন। তিনি জানতেন এইসব বানাতে কী ব্যবহার করা হচ্ছে। সুতরাং তিনি কীভাবে এটিকে মানুষের খেলনা ছাড়া আর অন্যকিছু ভাববেন? বেশ, তাহলে সহজ বিশ্বাসীদের মতো তিনি কেন কাঁধ ঝাঁকিয়ে বিষয়টি উপেক্ষা করেননি এবং নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেননি? কেন তিনি এত রেগে গিয়েছিলেন?
