মহাবীর তার ধর্ম প্রচার করতে সারা ভারতজুড়েই ঘুরে বেড়িয়েছিলেন, এবং তিনি বহু অনুসারীও আকৃষ্ট করেছিলেন। কমন এরা শুরু হবার ৪২৭ বছর আগে (খ্রিস্টপূর্ব) স্ব-নির্ধারিত উপোসের মাধ্যমে দেহত্যাগ করার সময়, যখন তার বয়স সত্তর, তার প্রায় চৌদ্দ হাজার সন্ন্যাসী আর ছত্রিশ হাজার সন্ন্যাসিনী অনুসারী ছিলেন। জৈনধর্মে সন্ন্যাসী আর সন্ন্যাসিনীরাই মূল খেলোয়াড়। তারা নিজেদেরকে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত করে তোলেন যেন বর্তমান জীবদ্দশাতেই নির্বাণপ্রাপ্তির জন্যে তাদের আত্মা নির্ভার হয়ে ওঠে। তারাই মহাবীরের অহিংসা আর সব জীবনের প্রতি শ্রদ্ধাপ্রদর্শন-সংক্রান্ত উপদেশগুলো একত্র করে সংকলিত করেছিলেন, এটাই তাদের পবিত্র গ্রন্থ আগম।
অধিকাংশ ধর্মই যখন সুপ্রতিষ্ঠিত হয়, সেটি নানা উপদলে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যায়। যেখানে প্রতিটি উপদলই মূল নবী বা শিক্ষকের প্রদর্শিত সত্যিকার সংস্করণটিকে অনুসরণ করছেন বলে দাবি করে থাকেন। জৈনধর্মও এর ব্যতিক্রম নয়। এটি দুটি গোষ্ঠীতে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। কিন্তু তাদের মধ্যে পার্থক্য মৃদু এবং আসলেই বেশ সামান্য। একটি গোষ্ঠী, যারা নিজেদের বলেন ‘দিগম্বর’ (আকাশই যার পরনের কাপড়), তারা দাবি করতেন, সন্ন্যাসী আর সন্ন্যাসিনীদের কোনো কাপড়ই পরা উচিত নয়। অন্যদিকে আরেকটি গোষ্ঠী, শ্বেতাম্বর, শুধুমাত্র সাদা কাপড় পরার অনুমতি দেয়।
এর সন্ন্যাসী-সন্ন্যাসিনী ছাড়াও ভারতে এখনো জৈনধর্মের কয়েক মিলিয়ন অনুসারী আছেন। যদিও এর সন্ন্যাসী আর সন্নাসিনীরা মূল খেলোয়াড়, এর সাধারণ সদস্যরা সমাজে তাদের অবস্থান যতটুকু অনুমতি দেয় ততটাই সাধারণ জীবন যাপন করেন। একটি জীবনের সংগ্রামের মাধ্যমে তারা ছাব্বিশতম স্বর্গে পৌঁছানোর আশা করেন না। কিন্তু তারা আশা করেন যে, বর্তমান জীবনের অহিংস নম্রতা পরের জন্মে তাদের জন্যে একটি সন্ন্যাসী বা সন্ন্যাসিনীর জীবন নিশ্চিত করবে, এবং সেই জীবনের পর তারা অবশেষে নির্বাণে পৌঁছাতে পারবেন।
জৈনধর্মের প্রকৃতির জন্যই, এটি কখনোই একটি গণমানুষের ধর্মে পরিণত হয়নি। কিন্তু এটি প্রভাবশালী ছিল। এবং এটি একটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়ের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। যদিও কঠোর আচার-অনুশীলন করার বিষয়টি এমনিতেই শুধুমাত্র সংখ্যালঘু কিছু মানুষের মনে দাগ কাটতে পারে ঠিকই, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামতে এটি প্রভাব ফেলতে পারে, যা এর দৃষ্টিভঙ্গিকে মৃদুতর করে তোলে। সব জীবনের চূড়ান্ত পবিত্রতা-সংক্রান্ত জৈনদর্শনটি নানারূপে ভেজিটারিয়ান বা নিরামিষাশী খাদ্য আন্দোলনে এর অবদান রেখেছে এবং এর অহিংস মতবাদ রাজনীতির ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছিল। এটি মহাত্মা গান্ধীকে প্রভাবিত করেছিল, বিংশ শতাব্দীর প্রথমাংশে যে আইনজীবী ভারতকে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত করার আন্দোলনে সফল নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এটি প্রভাবিত করেছিল মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রকেও, খ্রিস্টীয় যে যাজক যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গদের নাগরিক-অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় অর্ধাংশে।
জৈনধর্ম এখনো আমাদের সামনে সেই সত্যটিকে উন্মোচন করা অব্যাহত রেখেছে, তৃষ্ণাই বেশিরভাগ মানব-দুঃখের মূল কারণ এবং শুধুমাত্র তৃষ্ণাগুলো নিয়ন্ত্রণ করার মধ্যেই আছে আমাদের সুখ এবং সন্তুষ্টি। আমাদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজনই হয়তো দিগম্বর হতে চাইবেন বা উপোস করে আত্মহত্যা করতে চাইবেন, কিন্তু যারা এই কাজ করেন, তাদের কথা স্মরণ করলে হয়তো আমরা খানিকটা সাধারণ জীবন কাটাতে অনুপ্রাণিত হতে পারি।
এই বইয়ের শুরুতে আমি উল্লেখ করেছিলাম, কঠোরভাবে সময়ের ধারাবাহিকতা মেনে চলার বিষয়টি খুব কঠিন হবে যখন বিভিন্ন ধর্মের আবির্ভাবের ইতিহাসের পথটি আমরা অনুসরণ করব। এর কারণ এই গল্পে সময়ের মতো স্থানও একই রকম গুরুত্বপূর্ণ। একই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন জিনিস ঘটেছিল ভিন্ন ভিন্ন এলাকায়। সুতরাং ইতিহাসের মধ্যেই আমাদের আঁকাবাঁকা পথেই অগ্রসর হতে হবে। এই কারণে পরের অধ্যায়ে আমরা আর্যদের ভারত-প্রবেশের কয়েকশত বছর পরের একটি সময়ে যাব, তবে পশ্চিমের একটি জায়গায়, ধর্মের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একজন সম্বন্ধে জানতে। এই রহস্যময় চরিত্রটির নাম ছিল আব্রাহাম।
]
০৭. যাযাবর
আর (Ur)। সংক্ষিপ্ত দুটি অক্ষরের একটি শব্দ। এখানে ‘U’ উচ্চারিত হবে আ (যেমন up)। ‘r’ এমনভাবে উচ্চারণ করতে হবে যেমন করে স্কটল্যান্ডের অধিবাসীরা করেন, খানিকটা টেনে, সুতরাং Ur, অথবা Urrr, (আররর)। আর এখানেই কমন এরা শুরু ১৮০০ বছর (খ্রিস্টপূর্বাব্দ) আগে কোনো একটি সময় ধর্মের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রটি জন্মগ্রহণ করেছিলেন–গোত্রপিতা আব্রাহাম। ইহুদি, খ্রিস্টান এবং মুসলমান, সবাই তাদের প্রতিষ্ঠাতা-পিতা হিসাবে আব্রাহামকে দাবি করেছে। পানির একটি ক্ষীণ স্রোতধারার কথা ভাবুন, হাজার মাইল দূরে কোনো পর্বত থেকে যা যাত্রা শুরু করেছে, সমতলে সেটি তিনটি বিশাল নদীতে পরিণত হয়েছে, সেই ধারণাটি সহজেই আপনি অনুধাবন করতে পারবেন। মেসোপটেমিয়ার দক্ষিণ-পূর্বে ছিল ‘আর’ শহরটির অবস্থান। মেসোপটেমিয়া একটি গ্রিক নাম, যার অর্থ দুটি নদীর মধ্যবর্তী এলাকা এই নদীদুটি হচ্ছে টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেতিস। ‘আর’ শহরটি ছিল সেই দেশে যে দেশটির বর্তমান নাম ইরাক।
