সবধরনের জীবনের পবিত্রতার ওপর গভীর বিশ্বাস ছাড়া, জৈনধর্ম খুব সামান্যই ধর্মীয় তত্ত্বের ভারে নিজেকে ভারাবনত করেছে। এর পদ্ধতির মধ্যে এটি চূড়ান্ত কোনো ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তার জন্যে জায়গা রাখেনি। জাত বা বর্ণপ্রথার নিষ্ঠুরতাগুলো এটি প্রত্যাখ্যান করেছিল। কিন্তু এর মোক্ষ বা মুক্তি লাভ করার পথটি মহাবিশ্বের একটি সুনির্দিষ্ট মানচিত্রের ওপর নির্ভরশীল। জৈনরা বিশ্বাস করতেন দুটি দানবীয় আকারের বিশাল গোলক দিয়ে এই মহাবিশ্ব তৈরি, যে গোলকদুটি একটি সংকীর্ণ কোমর দিয়ে পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে আছে। ছবিটি কল্পনা করতে চাইলে একটি বাতাসভর্তি বেলুনের মাঝখানে একটি গিঁট বাঁধার চেষ্টা করুন, যা এটিকে আপনার গিঁটটি দিয়ে সংযুক্ত দুটি ভাগে বিভক্ত করবে। জৈন ধর্মমতে এই মধ্যবর্তী গিঁটটি হচ্ছে আমাদের এই বিশ্ব, যেখানে পুনর্জন্মের চক্রে আত্মারা তাদের সময় অতিবাহিত করে। ঠিক যেমন বেশি পরিমাণ খাদ্য আমাদের শরীরকে স্থূল করে তোলে এবং যখন সেটি বহন করে চলতে আমাদের কষ্ট হয়, সেভাবে জৈন বিশ্বাসে মনে করা হয়, খারাপ আচরণ আমাদের আত্মাকে ভারী করে তোলে, পুনর্জন্মের চাকা থেকে মুক্তি পাবার বিষয়টিকে এটি আরো কঠিন করে তোলে। যে আত্মাগুলো এর আগে খারাপ জীবন কাটিয়েছে তারা ফিরে আসে নিম্নতর কোনো রূপে। হয়তো কোনো সাপ বা ব্যাঙ হিসাবে, এমনকি গাজর কিংবা পিয়াজ রূপেও হতে পারে। যে আত্মাগুলো আসলেই খুবই অশুভ জীবন কাটিয়েছে সেগুলো এতই ভারী হয়ে ওঠে যে, তাদের ওজন এদের নিচের দিকে টেনে নিয়ে যায় মহাবিশ্বের নিচের গোলকের মধ্যে সাতটি নরকের কোনো একটিতে, যেখানে প্রতিটি নরক নির্যাতনের মাত্রায় এর উপরের নরকের চেয়েও আরো বেশি ভয়ংকর।
আর এই একই আইন মেনে, যে আত্মারা নিজেদের পাপমুক্ত করতে পারে, সেটি আরো হালকা হয়ে যেতে থাকে যতই তারা সংগ্রাম করে। সত্যিকারের জৈনরা কৃচ্ছত; কঠোর তপশ্চর্যার আচার পালন করেন (অ্যাসেটিসিজম শব্দটি এসেছে প্রাচীন গ্রিকের ক্রীড়াজগৎ থেকে, যার অর্থ হচ্ছে খুবই কঠোরভাবে পরিশ্রম করা, যেন তার ক্ষেত্রে তিনি সবাইকে ছাড়িয়ে যেতে পারেন)। জিনরা, যারা জৈনধর্মের সেরা চরিত্র, তারা তাদের আত্মার শুদ্ধির জন্যে এতটাই পরিশ্রম করেন যে, সেটি ক্রমশ হালকা হয়ে উপরের গোলকে স্বর্গে আরোহণ করে, ছাব্বিশটি স্বর্গ অতিক্রম করে তারা নির্বাণে পৌঁছে যান, যা তাদের সব সংগ্রামের চূড়ান্ত গন্তব্য। এখানে তারা স্থির পরমানন্দময় একটি অবস্থায় চিরবিরাজমান। অবশেষে মোক্ষলাভ।
জৈনধর্মের আরেকটি কৌতূহলোদ্দীপক দিক হচ্ছে, যেভাবে এটি তার। নির্ভারতার (আত্মার লঘুতা) সংগ্রামটির সম্প্রসারণ করেছিল ধারণার জগতেও। খারাপ কাজের মতোই, খারাপ ধারণাও আমাদের আত্মাকে আরো ভারী করে তুলতে পারে। ইতিহাস অবশ্যই সাক্ষী যে, ধর্মীয় ধারণাসহ নানাধরনের ধারণা নিয়ে অমিল মানুষের মধ্য সংঘর্ষের অন্যতম প্রধান একটি কারণ। কারণ জৈনদের জন্যে, অহিংসার মতবাদ সেই ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যায়, যেভাবে তারা মানুষের শরীরকে দেখেন, তেমনি তাদের ধারণাগুলোকেও দেখেন। এমনকি তাদের মানসিক জীবনেও জৈনরা কারো ক্ষতি করার কথা এবং অহিংস আচরণ করা থেকে বিরত থাকেন। তারা সেই ভিন্নপথগুলোকে শ্রদ্ধা করেন, যেভাবে বিভিন্ন মানুষ তাদের বাস্তবতাকে পর্যবেক্ষণ আর অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, এবং একই সাথে সেই বিষয়টিকেও শনাক্ত করেন : আসলে কেউই সার্বিকভাবে পুরো ব্যাপারটি একা দেখতে পারেন না।
শ্রদ্ধার এই মতবাদটির তারা নাম দিয়েছেন ‘অনেকান্তবাদ’। এবং এটি ব্যাখ্যা করার জন্য তারা অন্ধ ছয় ব্যক্তির একটি কাহিনি বর্ণনা করেছিলেন, যাদের শরীরের বিভিন্ন অংশ অনুভব করে একটি হাতির বিবরণ দিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। যে ব্যক্তি এর পা অনুভব করেছিলেন, তিনি বলেছিলেন হাতি স্তম্ভের মতো দেখতে। যিনি এর লেজ স্পর্শ করেছিলেন তার কাছে এটি ছিল দড়ির মতো। যিনি এর শুড় অনুভব করেছিলেন, তিনি বলেছিলেন এটি দেখতে একটি গাছের শাখার মতো। যে ব্যক্তি কান স্পর্শ করেছিলেন তার কাছে হাতি ছিল একটি হাতপাখার মতো, যিনি এর পেটে হাত বুলিয়েছিলেন এটি ছিল তারা কাছে একটি দেয়ালের মতো, যিনি এর শক্ত দাঁত ধরেছিলেন তিনি বলেছিলেন হাতি শক্ত একটি নলের মতো দেখতে। তাদের শিক্ষক সবাইকে বলেছিলেন, তারা সবাই সঠিক তাদের বিবরণে তবে একটি দৃষ্টিকোণ থেকে, কিন্তু প্রত্যেকেই পুরো অংশটির শুধুমাত্র একটি অংশ বুঝতে পেরেছিলেন। এই গল্পের নীতিবাক্য হচ্ছে যে, বাস্তবতা অনুধাবন করার ক্ষেত্রে মানুষের একটি সীমাবদ্ধতা আছে। যদিও তারা সম্পূর্ণ বিষয়টির প্রতি অন্ধ নাও হতে পারেন, কিন্তু শুধুমাত্র একটি একক দৃষ্টিকোণ থেকে তারা সেটি দেখতে পারেন। আর এটি ঠিক আছে, যতক্ষণ-না তারা দাবি করছেন যে, একমাত্র তাদের দৃষ্টিভঙ্গিটাই হচ্ছে সার্বিক চিত্র, এবং একইভাবে বিষয়টি দেখতে যখন তারা অন্যদের ওপর বল প্রয়োগ করেন।
জৈনরা মনে করেন, আমাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা হচ্ছে সেই মায়া বা অবাস্তবতার পরিণতি যেখানে আমরা আমাদের এই পাপপূর্ণ অস্তিত্বে আটকে আছি। শুধুমাত্র সর্বজ্ঞানপ্রাপ্তরাই নিখুঁত জ্ঞান অর্জন করতে পেরেছেন। জৈনধর্মের অন্য বিষয়গুলো নিয়ে আমরা যাই ভাবি না কেন, তবে আধ্যাত্মিক নম্রতার ব্যাপারে এর প্রণোদনা অন্যসব ধর্মের মধ্যে বিরল একটি বিষয়। ধর্মগুলো সাধারণত এমন কিছু দাবি করতে উৎসুক থাকে যে, শুধুমাত্র তাদের কাছে চূড়ান্ত সত্যটি আছে, সব ব্যাপারে তারাই সবকিছু জানেন। তারা সবাই সেই অন্ধ ভিখারিদের মতো, যারা একটি হাতির আকার নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করছে, এমন ধারণা তাদের কাছে আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়।
