ধীরে ধীরে, ক্রমশ আরো বেশী উত্তম অনুলিপনকারী হবার উপায় আবিষ্কৃত হয়। অনুলিপনকারীরা টিকে থাকে, শুধুমাত্র তাদের অন্তর্গত বৈশিষ্ট্যাবলীর জন্যই নয়, বরং এই পৃথিবীর উপর তাদের আরোপিত পরিণতির প্রভাবের কারণে। এই সব পরিণতিগুলো হতে পারে খুবই পরোক্ষ। যা প্রয়োজন শুধু সেটি হলো, শেষ অবধি পরিণতিগুলো, যতই তা পরোক্ষ কিংবা বাঁকা বা দুরবর্তী হোক না কেন, সেটি তার ফলাফলটি মূল প্রক্রিয়াকে জানান দেয়, সেই অনুলিপনকারীর নিজের প্রতিলিপি হবার সফলতার উপর প্রভাব ফেলে।
এই পৃথিবীতে একটি অনুলিপনকারীর সফলতা নির্ভর করে কোন। ধরনের পৃথিবী এটি– এর পূর্ববর্তী শর্তাবলীর উপর। এই সব শর্তাবলীর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তাবলী হবে, অন্যান্য অনুলিপনকারীরা এবং তাদের সৃষ্ট পরিণতিগুলো। ইংরেজ এবং জার্মান নৌকাচালকদের মত, অনুলিপনকারীরা যারা পারস্পরিকভাবে একে অপরের জন্য উপকারী তারা একে অপরের উপস্থিতিতে প্রাধান্য বিস্তার করবে। কোনো এক সময় আমাদের পৃথিবীতে জীবনের বিবর্তনে এইসব পারস্পরিক সহযোহিগতাকারী সম্পুরক রেপ্লিকেটররা দল বেধে পৃথক পৃথক বাহন সৃষ্টির ব্যাপারটি সুসংগঠিত করে– যে বাহনটি হচ্ছে কোষ এবং পরবর্তীতে বহুকোষী শরীর। বাহনগুলো, যারা একটি ‘বটোলনেক’ জীবনচক্র বিবর্তিত করেছিল, তারা সফলভাবে টিকে থাকে এবং আরো বেশী স্বতন্ত্র আর বাহক সরুপ হয়।
স্বতন্ত্র বাহকের মধ্যে জীবিত উপাদানগুলোর ‘প্যাকেজিং’ বা ‘মোড়কজাত করন’ আরো বশী সুস্পষ্ট এবং প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে যে যখন জীববিজ্ঞানীরা সেই দৃশ্যে এসে উপস্থিত হন এবং জীবন সংক্রান্ত তাদের প্রশ্নগুলো করতে শুরু করেন, তাদের প্রশ্নগুলো মূলত হয় সেই বাহনকে ঘিরে– একক জীব সদস্য। জীববিজ্ঞানীদের সচেতনতায় প্রথমেই আসে একক জীব সদস্য, অন্যদিকে অনুলিপনকারীরা– এখন যাদের আমরা ‘জিন’ নামে চিনি– তাদের দেখা হয় একক জীবসদস্যদের ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ হিসাবে। জীববিজ্ঞানে সঠিক উপায়ে আবার তাকানোর জন্য প্রয়োজন সুপরিকল্পিত মানসিক প্রচেষ্টা এবং আমাদের নিজেদের স্মরণ করিয়ে দেয়া যে রেপ্লিকেটররা প্রথমেই আসে, তাদের গুরুত্বে এবং একই সাথে ইতিহাসেও।
আমাদের নিজেদের মনে করিয়ে দেবার একটি উপায় হচ্ছে, ভাবা যে, এমনকি আজও, কোনো একটি জিনের সব ফিনোটাইপিক প্রভাব তারা যে শরীরে বাস করে সেই পরিসরেই সীমাবদ্ধ থাকে না। অবশ্যই নীতিগত ভাবে এবং অবশ্যই বাস্তব সত্যে, জিন একক শরীরের সীমানার বাইরে তাদের প্রভাব বিস্তাব করে এবং বাইরের জগতে নানা কিছুর উপরও এর প্রভাব খাটায়, যাদের কিছু ‘জীবন্ত’ নয়, এবং কিছু অন্যান্য ‘জীব’, যাদের কারো কারো অবস্থান আবার বহু দুরে। শুধুমাত্র সামান্য কল্পনা শক্তির প্রভাবে একটি চতুর্দিকে জালের বিস্তৃত সম্প্রসারিত ফিনোটাইপিক শক্তির কেন্দ্রে আমরা জিনকে দেখতে পারি। এবং পৃথিবীর কোনো একটি অবজেক্ট বা বস্তু বসে আছে, বহু জীবের শরীরে বহন করা বহু জিনের সমকেন্দ্রাভিমুখী প্রভাবের একটি জালের কেন্দ্রে। জিনের দীর্ঘ হাত সুস্পষ্টভাবে কোনো সীমানা চেনে না। পুরো পৃথিবী জুড়েই ছড়িয়ে আছে কার্যকারণের তীর যা জিনদের তাদের ফিনোটাইপিক প্রভাবের সাথে যুক্ত করেছে, কাছে এবং দূরে।
এটি একটি বাড়তি বাস্তব সত্য, শুধুমাত্র আনুষঙ্গিক বা প্রাসঙ্গিক হিসাবে চিহ্নিত হবার চেয়ে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু যথেষ্ট আবশ্যিক নয় তত্ত্বে অবশ্যম্ভাবী হিসাবে চিহ্নিত করা যেতে পারে যে এইসব কার্যকারণের তীরগুলো একই সাথে আঁটি বাধে, জমায়েত হয়। সাগরে আর অনুলিপনকারীরা মুক্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে না। তারা একসাথে জমায়েত হয়ে থাকে বিশাল কলোনি হিসাবে– স্বতন্ত্র একক জীব সদস্যদের শরীরে। এবং ফিনোটাইপিক পরিণতিগুলো, সারা পৃথিবীজুড়ে খুব সুষমভাবে বন্টন হবার বদলে,বহু ক্ষেত্রে এটি সুসংগঠিত ও সংঘবদ্ধ হয় ঐসব একই শরীরে। কিন্তু একক শরীরগুলো, আমাদের এই গ্রহে যারা সুপরিচিত, তাদের অস্তিত্ব থাকার বাধ্যবাধকতা ছিলনা। শুধুমাত্র একটি সত্তা জীবনের উদ্ভবের জন্য যার অস্তিত্ব থাকতেই হবে, সেটি মহাবিশ্বের যে-কোনো জায়গায় হোক না কেন, সেটি হচ্ছে অমর অনুলিপনকারী।
১৪. ৪০ তম প্রকাশনা বার্ষিকী সংস্করণের এপিলগ
৪০ তম প্রকাশনা বার্ষিকী সংস্করণের এপিলগ
বিজ্ঞানীরা, রাজনীতিবিদদের ব্যতিক্রম, ভুল প্রমাণিত হবার মধ্যে আনন্দ অনুভব করতে পারেন। একজন রাজনীতিবিদ যিনি তার মন পরিবর্তন করেন, “ডিগবাজি দেয়া বা আদর্শের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার অপরাধে তাকে অভিযুক্ত করা হয়। টনি ব্লেয়ার গর্ব করে বলেছিলেন, তার কোনো রিভার্স (বা পেছনে যাবার) গিয়ার নেই। মোটামুটিভাবে সব বিজ্ঞানী দেখতে চান যে তাদের ধারণা প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু মাঝেমধ্যে সেই ধারণার বিপৰ্যাস শ্রদ্ধা অর্জন করতে পারে, বিশেষ করে যখন উদারতার সাথে সেটি স্বীকার করে নেয়া হয়। আমি এমন কোনো বিজ্ঞানীর নাম শুনিনি, মত পরিবর্তনের জন্যে যাকে কিনা বিদ্বিষ্ট হতে হয়েছে।
আংশিকভাবে ‘দ্য সেলফিশ জিন’ বইটির কেন্দ্রীয় বার্তাটি প্রত্যাহার করে নিতে পারার একটি উপায় খুঁজে পেলে আমি হয়তো বেশ তৃপ্ত হতাম। জিনোমিক্সের জগতে এত বেশী সংখ্যক উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনা খুব দ্রুততার সাথে ঘটা অব্যহত আছে যে, মনে হতে পারে প্রায় অবশ্যম্ভাবী, এমনকি লোভের উদ্রেক করে, কোনো একটি বই যার শিরোনামে কিনা ‘জিন’ শব্দটি আছে, এই চল্লিশ বছর পরে সেটি একেবারে পুরোপুরিভাবে বাতিল না করলেও, অন্ততপক্ষে সেখানে বেশ বড় মাপের পুনর্বিবেচনা আর সংশোধন প্রয়োজন আছে। আসলেই হয়তো সেটি করতে হতো, যদি না এই বইয়ে সেই ‘জিন’ শব্দটি একটি বিশেষ অর্থে ব্যবহার করা না হতো, যা ঐণতত্ত্ব নয় বরং বিবর্তনের সাথে যথোপযুক্ত করে ব্যবহৃত হয়েছিল। আমার সংজ্ঞাটি ছিল জর্জ সি উইলিয়ামসের সেই সংজ্ঞা, এই বইটির স্বীকৃত বীরদের একজন, জন মেনার্ড স্মিথ এবং বিল হ্যামিলটনের মত যিনি এখন আর আমাদের সাথে নেই: ‘একটি জিনকে ক্রোমোজোম উপাদানের যেকোনো একটি অংশ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, প্রাকৃতিক নির্বাচনের একক হিসাবে কাজ করার জন্যে যে অংশটির যথেষ্ট সংখ্যক প্রজন্ম টিকে থাকার সম্ভাবনা থাকে। আমি এটিকে আরো খানিকটা ঠাট্টাপূর্ণ একটি উপসংহারের দিকে ধাক্কা দিয়েছিলাম.. “খুব কঠোরভাবে বললে, এই বইটির নাম হওয়া উচিৎ, ক্রোমোজোমের খানিকটা স্বার্থপর বড় অংশ এবং এমনকি ক্রোমোজোমের আরো বেশী স্বার্থপর ছোটো অংশ। কিভাবে জিন ফিনোটাইপের কোনো ট্রেইট বা বৈশিষ্ট্যের বাহ্যিক প্রকাশ) উপর প্রভাব ফেলে সেই বিষয়ে ভ্রূণতত্ত্ববিদদের চিন্তার বিপরীতে, এখানে আমরা জনগোষ্ঠীতে সেই সত্তাগুলোর উপস্থিতির হার সংক্রান্ত নব্য ডারউইনীয় ভাবনাগুলো বর্ণনা করেছিলাম। এই সত্তাগুলো উইলিয়ামসের বর্ণিত অর্থে ‘জিন’ (পরে উইলিয়ামস সেই ধারণাটির নাম দিয়েছিলেন: কোডেক্স)। জিন গণনা করা যেতে পারে,এবং তাদের সংখ্যা তাদের সফলতারই পরিমাপসূচক। এই বইটির কেন্দ্রীয় বার্তাগুলোর একটি হচ্ছে এককভাবে কোনো জীব সদস্যের জিনদের মত এই বৈশিষ্ট্যটি থাকে না। কোনো একটি জীবের ক্ষেত্রে এই উপস্থিতির হার ‘এক’ আর সেকারণে ‘প্রাকৃতিক নির্বাচনের একক হিসাবে সেটি কাজ করতে পারেনা। আর যাই হোক, ‘অনুলিপনকারী’ অর্থে না। যদি কোনো জীব প্রাকৃতিক নির্বাচনের একক হয়, তবে সেটি জিন ‘বাহনের খুব ভিন্ন একটি অর্থে। এর সফলতার পরিমাপ হচ্ছে পরবর্তী প্রজন্মগুলোর মধ্যে এর জিনগুলোর উপস্থিতির হার, এবং যে সংখ্যাটি এটিকে সর্বোচ্চ পরিমানে বাড়ানোর প্রচেষ্টা করে, হ্যামিলটন ‘ইনক্লসিভ ফিটনেস হিসাবে যা সংজ্ঞায়িত করেছিলেন।
