আমাদের আরো একটু সতর্কতার সাথে ভাবতে হবে। যদি মোটা খোলসগুলো আসলেই শামুকদের জন্য ভালো হয়, তাহলে তারা নিজেরাই সেটি তৈরী করছেনা কেন, পরজীবি থাকুক বা না থাকুক। এর উত্তর সম্ভবত আছে অর্থনীতিতে। খোলস বানানো কোনো একটি শামুকের জন্য শক্তি খরচের ভাষায় বেশ ব্যয়সাপেক্ষ একটি প্রকল্প। কারণ এর জন্য বাড়তি শক্তিরও প্রয়োজন। এর জন্য দরকার ক্যালসিয়াম এবং অন্য রাসায়নিক দ্রব্য যা সংগ্রহ করতে হয় কঠোর পরিশ্রম করে অর্জন করে সংগৃহীত খাদ্য থেকে। এই সব সম্পদ, যদি খোলস নির্মাণে ব্যবহৃত না হয়, তাদের অন্য কোনো ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হতো, যেমন, আরো বেশী সন্তান সৃষ্টি। কোনো শামুক যে অনেক বেশী সম্পদ ব্যবহার করেছে বাড়তি পুরুত্বের খোলস বানানো জন্য, সে অবশ্যই তার নিজের শরীরের জন্য নিরাপত্তা ক্রয় করে ঠিকই; কিন্তু কি মূল্যে? এটি হয়তো দীর্ঘদিন বাঁচবে, কিন্তু এটি অপেক্ষাকৃতভাবে প্রজননে কম সফল হবে অথবা হয়তো তার জিনগুলো পরের প্রজন্মের হস্তান্তরিত করতে ব্যর্থ হবে। যে সকল জিনগুলো হস্তান্তরিত হতে ব্যর্থ হবে সেগুলো হচ্ছে বাড়তি মোটা খোলস বানানোর জিন। অন্যভাবে বললে, কোনো খোলসের পক্ষে খুব বেশী মোটা এবং খুব বেশী (আরো সুস্পষ্টভাবে) পাতলা হওয়া সম্ভব হতে পারে। সুতরাং, যখনই পরজীবি ফ্লক কোনো একটি শামুককে বাধ্য করে বাড়তি মোটা খোলস বানানোর জন্য, সেই ফুকটি শামুকের জন্য উপকারী কোনো কাজ করছে না, যদি না ফুক নিজেই এই বাড়তি মোটা খোলস বানাবার অর্থনৈতিক ব্যয়ভারটি বহন না করে থাকে। এবং আমরা নিরাপদে বাজি রাখতে পারি খুব একটি উদারতার কোনো কাজ সে এখানে করছে না। ফুকটি কোনো গোপন রাসায়নিক প্রভাব ফেলছে শামুকের উপর যা শামুককে বাধ্য করে তার পছন্দমত’ আর ‘সূবিধাজনক’ পুরুত্বসহ শামুকের খোলসটি থেকে দুরে সরে আসার জন্য। এটি হয়তো শামুকের জীবন দীর্ঘ করে, কিন্তু এটি শামুকের জিনদের কোনো উপকার করছে না।
এই হিসাব নিকাশের মধ্যে ফুকের কি লাভ? কেন সে এটি করছে? আমরা প্রস্তাবনা হচ্ছে এমন: শামুকের জিন ও ফ্লক জিন, উভয় জিনই শামুকের শরীর দীর্ঘায়ু হওয়ার কারণে সুফল পাবার অবস্থানে থাকে যদি শামুকটি দীর্ঘসময় ধরে বেঁচে থাকে, বাকি সবকিছু যদি অপরিবর্তিত থাকে। কিন্তু টিকে থাকা আর প্রজনন এক কথা না, এখানে একটি লাভক্ষতির হিসাব নিকাশ আছে। যখন শামুকের প্রজনন থেকে শামুকের জিন লাভ করবে, ফুকের জিন কোনো লাভ করবে না। এর কারণ একটি ফ্লকের বিশেষভাবে নিশ্চিৎ কোনো সম্ভাবনা নেই যে এর জিনগুলো বর্তমান পোষকের সন্তানদের শরীরে বাস করবে। তারা সেটি করতে পারে, এবং একইভাবে সেটি করতে পারে প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য ফুকরা। যেহেতু শামুকের দীর্ঘায়ু কিনতে হবে শামুকের প্রজনন সাফল্যর খানিকটা ক্ষতি সাধন করে, সেকারণে। ফুক জিনরা খুশী’ শামুকের জিনদের এর মূল্য পরিশোধ করিয়ে। যেহেতু তাদের নিজেদের এই শামুকের প্রজননের ব্যপারে সহায়তা করার কোনো আগ্রহ নেই। শামুকের জিনগুলো খুশী না এর মূল্য পরিশোধ করার ব্যপারে, কারণ শামুকের প্রজননের উপর তাদের দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। সুতরাং, আমি প্রস্তাব করছি যে, ফুক জিনরা শামুকের খোলস নিঃসরণকারী কোষগুলোর উপর একধরনের প্রভাব ফেলে, এই প্রভাবটি পরজীবিদের উপকার করে, কিন্তু এটি শামুকের জিনের জন্য বেশ ব্যয়সাধ্য একটি ব্যপার। এই তত্ত্বটি পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে, যদিও এখনও তা পরীক্ষা করে দেখা হয়নি।
আমরা এখন এমন একটি অবস্থানে আছি, যেখানে ক্যাডিসদের থেকে পাওয়া শিক্ষাকে সাধারণীকরণ করতে পারি। যদি আমি সঠিক হই ফুক জিনরা কি করছে সেই বিষয়ে, এর মানে যে আমরা বৈধভাবেই বলতে পারি, ফুক জিনরা শামুকদের শরীরকে প্রভাবিত করছে, ঠিক সেই একই অর্থে যে অর্থে শামুকদের জিন শামুকদের শরীরে প্রভাব ফেলে। এটি যেন জিনরা তাদের নিজেদের বাহক শরীরের বাইরের পৃথিবীকে প্রভাবিত করছে। ঠিক যেমন ক্যাডিসদের ক্ষেত্রে যা ঘটেছে, এই ভাষা জিনতাত্ত্বিকদের খানিকটা অস্বস্তিতে ফেলে। তারা সাধারণত অভ্যস্ত শুধুমাত্র একটি শরীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো জিনের কাজ সম্বন্ধে। কিন্তু, ক্যাডিসের ক্ষেত্রে
যেমন আবার, যদি খুব ভালোভাবে লক্ষ করার হয় জিনতাত্ত্বিকরা সাধারণত জিনের প্রভাব আছে বলতে কি বোঝান, সেটি প্রদর্শন করছে এধরণের ইতস্ততার কোনো প্রয়োজন নেই। আমাদের শুধুমাত্র মেনে নেয়া দরকার, শামুকের খোলসের পুরুত্ব পরিবর্তন হচ্ছে ফ্লুকদের অভিযোজন। যদি তাই হয়, এটি ঘটেছে ফুক জিনের উপর কাজ করা ডারউইনীয় নির্বাচনের কারণে। আমরা দেখিয়েছি যে কোনো একটি জিনের ফিনোটাইপিক প্রভাব সম্প্রসারিত হতে পারে, শুধু প্রাণহীন কোনো বস্তু, যেমন, পাথরই শুধু না, অন্য জীবন্ত শরীরেও।
শামুক আর ফ্লুকদের গল্প শুধুমাত্র শুরু। সব ধরণের পরজীবি, যাদের সাথে আমার বহুদিন ধরে পরিচিত তারা প্রত্যেকেই বিস্ময়কর দক্ষতার সাথে অশুভ প্রভাব খাটাতে পারে তাদের পোষকের শরীরে। আণুবীক্ষণিক প্রোটোজোয়া পরজীবির একটি প্রজাতি আছে, ‘নোসেমা’, ফ্লাউয়ার বীটলদের লার্ভাদের যারা আক্রমণ করে, তারা ‘আবিষ্কার করেছে কিভাবে একটি রাসায়নিক দ্রব্য আবিষ্কার করা যায়, যা এই সব বীটলদের জন্য খুবই বিশেষ ভূমিকা পালন করে। অন্যান্য কীটপতঙ্গের মত, এই সব বীটলগুলোর শরীরে এক ধরনের হরমোন থাকে যাদের বলে ‘জুভেনাইল’ হরমোন, যার কাজ লার্ভাকে লার্ভা স্তরে রাখা। লার্ভা থেকে পূর্ণবয়স্ক হওয়ার স্বাভাবিক পরিবর্তনটির সূচনা করে যখন লার্ভা এই জুভেনাইল হরমোনটির উৎপাদন করা বন্ধ করে দেয়। নোসেমা পরজীবি সফল হয়েছে এই হরমোনটি সংশ্লেষণ করতে ( এর খুব কাছের রাসায়নিক একটি সমরুপ যৌগ)। লক্ষ লক্ষ নোসেমা একসাথে হয়ে বীটল লার্ভার শরীরে এই হরমোনটি ব্যাপক হারে উৎপাদন করে। ফলে লার্ভা থেকে পূর্ণবয়স্ক বীটল হওয়া থেকে এটি বাধা দেয়। এর পরিবর্তে এটি আকারে বাড়তেই থাকে, এবং অবশেষে পূর্ণবয়স্ক বীটলের চেয়ে দ্বিগুণ ওজনের দানবাকৃতির একটি লার্ভায় রূপান্তরিত হয়। বীটলের জিন প্রজন্মান্তরে হস্তান্তরের যা ভালো না, বরং নোসেমা পরজীবিদের জন্য এটি একটি করনুকোপিয়া। বীটল লার্ভার দানবীয় আকার প্রোটোজোয়া জিনদের একটি সম্প্রসারিত ফিনোটাইপিক প্রভাব।
