আমি মনে করি, রোজ এবং তার সহকর্মীরা নিজেদের কেক নিজেরা কেটে খাবার জন্য আমাদের অভিযুক্ত করেছেন। আমাদের হয় আমরা অবশ্যই ‘জিনগত পরিণামবাদী’ অথবা আমরা ‘ফ্রি উইল’ এ বিশ্বাস করি, কিছুতেই আমরা একসাথে দুটো হতে পারবো না। কিন্তু– এবং এখানে আমরা ধরে নিচ্ছি আমি অধ্যাপক উইলসনের পক্ষ হয়েও কথা বলছি, আমার জন্য তো বটেই। শুধুমাত্র রোজ এবং তার সহকর্মীদের চোখে আমরা জিনগত পরিণামবাদী। তারা যে বিষয়টি বুঝতে পারছেন না, সেটি হচ্ছে (যদিও খুব কঠিন তাদের সেই কৃতিত্ব দেয়ার জন্য) খুব ভালোভাবেই সম্ভব এমন কোনো মতামত ধারণ করা যে জিনরা একটি পরিসংখ্যানগত প্রভাব ফেলে মানুষের আচরণের উপর, এবং একই সাথে বিশ্বাস করা যে, এই প্রভাবটিকে কম বেশী পরিবর্তন, এটিকে প্রতিরোধ করা এবং প্রতিবর্তন করা সম্ভব অন্যান্য কিছুর প্রভাবের মাধ্যমে। জিন অবশ্যই একটি পরিসংখ্যানগত প্রভাব ফেলবে যে কোনো আচরণের উপর যা বিবর্তিত হয়েছে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে। আশা করা যেতে পারে রোজ এবং তার সহকর্মীরা একমত হবেন যে মানুষের যৌন কামনা বিবর্তিত হয়েছে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে, একই অর্থে যেমন যেকোনো কিছু কখনও বিবর্তিত হয়েছে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে। সেকারণে তারা নিশ্চয়ই একমত হবেন যে অবশ্যই কিছু জিন আছে যা যৌন কামনাকে প্রভাবিত করে– ঠিক যে অর্থে জিনরা অন্য যে কোনো কিছুর উপর তাদের প্রভাব বিস্তার করে থাকে। তারপরও মনে করা যেতে পারে তাদের কোনো সমস্যা হয়না এই কামনাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে যখন সামাজিকভাবে প্রয়োজন হয় সেটি করার জন্য। এর সাথে দৈত্ববাদীতার কি সম্পর্ক? অবশ্যই কোনো কিছুনা। স্বার্থপর অনুলিপনকারীদের নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার পক্ষে আমার ওকালতি করাও আদৌ দ্বৈতবাদীতা নয়। আমরা, অর্থাৎ আমাদের মস্তিষ্কগুলো, আমাদের জিন থেকে যথেষ্ট পরিমান পৃথক এবং যথেষ্ট পরিমান স্বতন্ত্র, তাদের প্রতি বিদ্রোহ ঘোষণার জন্য। ইতিমধ্যেই যা বলেছি, আমরা ছোট আকারে সেই কাজটিই করি যখনই আমরা জন্মনিরোধক ব্যবহার করি। আরো বড় আকারে আমাদের বিদ্রোহ করতে পারার কোনো কারণই নেই।
১২. ভালোরা সফল হয়
অধ্যায় ১২ : ভালোরা সফল হয়
নাইস গাইস ফিনিশ লাস্ট (ভালো মানুষদের অসফল হবার প্রবণতা আছে) প্রবাদ বাক্যটি মনে হয় উদ্ভব হয়েছে বেসবল খেলার জগতে, যদিও কিছু কতৃপক্ষ এর একটি বিকল্প অর্থের অগ্রাধিকার দাবী করে আসছেন। আমেরিকার জীববিজ্ঞানী গ্যারেট হারডিন এটি ব্যবহার করেছিলেন সেই বিষয়টির সারাংশ হিসাবে প্রকাশ করতে, যে বিষয়টির শিরোনাম দেয়া যেতে পারে ‘সোসিওবায়োলজী অথবা ‘সেলফিশ জিনেরী। এই যথার্থতা খুব সহজেই দেখা যেতে পারে। যদি ‘নাইস গাই’ শব্দটির চলিত কথ্য ভাষার অর্থটি ডারউইনীয় সমার্থক শব্দার্থে অনুবাদ করি, একজন ‘নাইস’ গাই হচ্ছে সেই সদস্য, যে নিজে মূল্য পরিশোধ করার বিনিময়ে প্রজাতির অন্যান্য সদস্যদেরকে তাদের জিন পরবর্তী প্রজন্মে হস্তান্তরিত করতে সহায়তা করে। তাহলে নাইস গাইস বা এই সব ভালো সদস্যদের সংখ্যা প্রজাতির সদস্যদের মধ্যে কমে যেতে বাধ্য: এই পরোপকারীতা একটি ডারউইনীয় মৃত্যুর শিকার হয়। কিন্তু কথ্য ‘নাইস’ শব্দটির আরো একটি কারিগরী ব্যাখ্যা আছে। আমরা যদি সেই সংজ্ঞাটিকে গ্রহন করে নেই, যা শব্দটির কথ্য রুপের অর্থ থেকে খুব বেশী দূরে নয়, ‘নাইস গাইস ক্যান ফিনিস ফার্স্ট’ বা ভালো সদস্যরা সফল হতে পারে। এই আরো বেশী আশাবাদী উপসংহারটি হচ্ছে এই অধ্যায়ের মূল বিষয়।
অধ্যায় ১০ এ উল্লেখিত ‘গ্রাজারদের কথা মনে করুন। এরা ছিল পাখি, যারা সাধারণত একে অপরকে সাহায্য করে আপাতদৃষ্টিতে একটি পরার্থবাদী উপায়ে, কিন্তু তারা সাহায্য করতে অস্বীকার করে– গ্রাজ কিংবা ক্ষোভ ধারণ করে তাদের বিরুদ্ধে– সেই সব সদস্যদের যারা এর আগে তাদেরকে সাহায্য করতে অস্বীকার করেছে। গ্রাজাররা জনগোষ্ঠীতে প্রাধান্য বিস্তার করে কারণ তারা যেকোনো ‘সাকার’ (যারা নির্বিচারে সবাইকে সাহায্য করে, এবং সেকারণে সবাই নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে তাদের ব্যবহার করতে পারে) অথবা “চিটদের’ (যারা সবাইকে তাদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে নিষ্ঠুরভাবে চেষ্টা করে, পরিণতিতে পরস্পরের ক্ষতি করে) তুলনায় অনেক বেশী জিন তাদের পরবর্তী প্রজন্মে হস্তান্তর করতে সফল হয়। গ্রাজারদের কাহিনী একটি গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ মূলনীতিকে ব্যাখ্যা করে, রবার্ট ট্রিভার্স যার নাম দিয়েছিলেন ‘রেসিপ্রকোল আলট্রইজম’ বা পারস্পরিক পরার্থবাদিতা। আমরা যেমন ক্লিনার ফিশদের উদাহরণে দেখেছিলাম ( মূল বইয়ের পৃষ্ঠা ২৪৩-৪), পারস্পরিক পরার্থবাদীতা শুধুমাত্র একটি প্রজাতির সদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি সব ধরনের সম্পর্কেই কাজ করে, যাদের বলা হয় সিমবায়োটিক (মিথোজীবি)– যেমন, পিপড়াদের তাদের এফিড ‘গবাদী’ থেকে দুধ সংগ্রহ করার আচরণ (মূল বইয়ের পৃষ্ঠা ২৩৫-৬)। অধ্যায় ১০ লেখা শেষ করার পরে, আমেরিকার রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট অ্যাক্সেলরড (যিনি ডাবলিউ, ডি, হ্যামিলটনের সাথে কাজ করেছিলেন, যার নাম এই বইয়ের বহু পাতায় আমরা দেখতে পাবো) এই রেসিপ্রোকাল অ্যালট্রইজিমের ধারণাটিকে একটি উত্তেজনাময় নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করেছিলেন। এবং অ্যাক্সেলরডই প্রথম ব্যাক্তি যিনি ‘নাইস’ শব্দটির একটি কারিগরী অর্থ প্রস্তাব করেছিলেন, আমি শুরুর অনুচ্ছেদে যে অর্থটির প্রতি তথ্য-নির্দেশ করেছি।
