ভেইলকে এর আগে বেশ কয়েকবার টিভিতে দেখেছে ক্লডিয়া–হয়তো কোনো সাক্ষাৎকারে কিংবা কোনো আলোচনায়। সেসব অনুষ্ঠানে ভেইলের পোশাক-পরিচ্ছেদ, আভিজাত্যপূর্ণ ঠোঁটে ধরা পাইপ বাচনভঙ্গি– সব মিলিয়ে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পুরুষই মনে হয়েছে ক্লডিয়ার তবে টেলিভিশনের ভেইলের চেয়ে। শয্যাসঙ্গী ভেইল ক্লডিয়ার কাছে অনেক বেশি আকর্ষণীয়।
সত্যিকারের প্রেমময় কথোপকথন বলতে যা বোঝায়, তা কখনোই হয়নি দুজনার মাঝে। ক্লডিয়াও এমন আলোচনার প্রয়োজন মনে করেনি। আর ভেইলের মানসিকতা কেবল সাহিত্যের। ভেইলের আলোচনায় আবেগ এসেছে, সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গে। আর বিশ্বের এত নামকরা ঔপন্যাসিক হয়েও ভেইল কখনোই তা ফলাও করে জাহির করার চেষ্টা করেনি। ক্লডিয়ার সাথে ভেইলের মানসিকতায় এই সাহিত্য বিষয় ছাড়া আর কোনো কিছুতেই মিল নেই তেমন। তারপরও তাদের পারস্পরিক মানিয়ে চলার প্রবণতা থেকে তারা অবশেষে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে মনস্থির করে উভয়ের সম্মতিক্রমেই।
ক্লডিয়ার সাথে ভেইলের সাহিত্য বিষয়ে বিতর্ক না হলেও, বিতর্ক হতে মুভি নিয়ে। চলচ্চিত্র কোনো শিল্পই নয় ভেইলের দৃষ্টিতে। আর এতেই ছিল ক্লডিয়ার জোর আপত্তি। চলচ্চিত্রের মতো চিত্রশিল্পও ভেইলের দৃষ্টিতে কোনো শিল্প নয়।
ভেইলের এমন উস্কানিমূলক উক্তির বিরোধিতা করে ক্লডিয়ার যুক্তি, যদি চিত্রশিল্প তোমার দৃষ্টিতে আর্ট না হয় তবে বাখ বা বিথোভেনের কাজগুলোও শিল্প নয়, মাইক্যাল এঞ্জেলোর কাজও শিল্প নয়। তুমি একটা ষাঁড়ের মতো কথা বলছ। আরো এরপরই ক্লডিয়া বুঝতে পেরেছিল যে, ভেইল তাকে ক্ষেপানোর জন্যই এমন বিষয়ের অবতারণা করেছে। ক্লডিয়ার সাথে ভেইলের এরকম কৌতুককর আলোচনা হতো বেশিরভাগ সেক্সের পর।
স্ক্রিপ্টের কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়ে এলো। এবার ফিরে যাবার পালা ভেইলের। নিউইয়র্কে ফিরে যাবার আগে ক্লডিয়াকে উপহার দিল ছোট্ট একটি এনটিক রিং। চারটি ভিন্ন রঙের এক দিকে হেলানো জুয়েলের রিংটির মূল্য খুব বেশি নয় কিন্তু যে কোনো মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম। ভেইলের কাছ থেকে রিংটি পাওয়ার পর ক্লডিয়া আর কখনোই খুলেনি। সবসময় তার হাতে দেখা গেছে ভেইলের দেয়া এ উপহার। আংটিটি যেন তার মনে সৌভাগ্যের প্রভাব ফেলেছিল।
ভেইলও চলে গেল, ক্লডিয়ার সাথে তার যৌন সম্পর্কের ইতি ঘটল। কখনো কদাচিৎ ভেইল ফিরে এসেছে লস অ্যাঞ্জেলেসে। সে দেখতে পেয়েছে উভয়ের মধ্যে সম্পর্কের যেন একটা অবনতি ঘটেছে। তাদের সেক্স সেক্সচুয়াল সম্পর্কে ভাবাবেগের চেয়ে বেশি বন্ধুত্বের আবেগ। প্রকৃতপক্ষে ক্লডিয়া তখন। অন্য কারো সাথে প্রেম-প্রেম খেলার মধ্যগগনে।
ভেইলের প্রতি ক্লডিয়ার বিদায়ের উপহারটি ছিল যেন হলিউডের পথে একটি নিদারুণ শিক্ষা। ক্লডিয়া তাকে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করে জানিয়ে দিল— তাদের লেখা স্ক্রিপটি পুনর্লিখনের জন্য বিখ্যাত বিনিম্নাইয়ের কাছে পাঠানো হয়েছে। বিনিস্লাই হলিউডের একজন লিজেন্ড স্ক্রিপ্ট রাইটার। কয়েক দফা সে এ ক্ষেত্রে একাডেমি অ্যাওয়ার্ডেও ভূষিত হয়েছে। আর তাকে দিয়ে কাজ করিয়ে অবাণিজ্যিক গল্পটি একশ মিলিয়ন ডলারের ব্লকবাস্টার ছবিতে ব্যবহার করা হবে। ভেইল নিঃসন্দেহ যে তার বইয়ের গল্পটি এবার সত্যিই মুভিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। বিষয়টি ভেইলের খুব পছন্দের নয়। কিন্তু একটি ক্ষেত্রে তার দ্বিধার অবকাশ নেই যে, ছবিটি তৈরি হলে নিশ্চিত অনেকগুলো ডলার তার হস্তগত হবে।
ক্লডিয়ার কাছে তথ্যগুলো শুনে ভেইলের মাথা নুয়ে পড়েছিল। এবার মাথা তুলল সে। বলল, ঠিক আছে, আমি, দশ শতাংশ তো পেতে যাচ্ছি। এতেই আমার সচ্ছলতা ফিরে আসবে।
অভিজ্ঞ ক্লডিয়ার কণ্ঠে ঝরে পড়ল বিস্ময়। দশ শতাংশ? কণ্ঠস্বরকে আরো তীক্ষ্ণ করে বলল, তুমি একটি পেনিও চোখে দেখবে না। মুভির ব্যবসা যতই হোক না কেন তুমি আদৌ এর ধারে-কাছে ভিড়তে পারবে কি-না সন্দেহ। লডস্টোনের এই ঠগ প্রবণতার দীর্ঘ রেকর্ড রয়েছে। এ ক্ষেত্রে তারা সত্যিই জিনিয়াস।
একটু থামল ক্লডিয়া। বলল, আমার কথা শোনো, ইতিমধ্যেই আমি লডস্টোনের প্রায় পাঁচটি ছবিতে কাজ করেছি। ছবিগুলো প্রচুর অর্থ আয় করেছে। অথচ আজ অবধি আমি একটি পেনিও চোখে দেখিনি। আর তোমার তো প্রশ্নই আসে না।
ভেইল আহত হলো। মাথা তুলে তাকাল ক্লডিয়ার দিকে। তবে খুব একটা চিন্তিত হলো না সে। গত কয়েক বছর ধরে তার জীবনটা এক ফেরের মধ্যেই কেটেছে– সব কিছুতেই যেন একটা জট। ক্লডিয়ার কথাগুলো কিছুটা ভাবিয়ে তুলল ভেইলকে।
আর্নেস্ট ভেইল একবার ক্লডিয়াকে তার মায়ের একটি কথিত উদ্ধৃতি শুনিয়েছিল। উদ্ধৃতিটি হলো– জীবন হচ্ছে এক বাক্স হ্যান্ড গ্রেনেডের মতো। ভেইলের মায়ের এই উদ্ধৃতিটি ক্লডিয়ার ক্ষেত্রে যেন যথাযথভাবে মিলে গেছে।
ক্লডিয়া-গ্রেনেডের পরবর্তী বিস্ফোরণ অর্থাৎ প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হলো। ক্লডিয়ার মনের অবিরাম ধারার প্রেম আটকে রাখতে পারল না ভেইল, ভেইলের ভালোবাসা এমনকি ভেইলের এন্টিক রিং। যথেষ্ট মেধাবী ক্লডিয়া এই প্রথমবারের মতো জড়াল এমন এক ব্যক্তির সাথে, যে ক্লডিয়ার তুলনায় মোটেও যথার্থ নয়। তবে সে যুবক এবং জনসাধারণের কাছে স্বীকৃত জিনিয়াস পরিচালক। শুধু এই পরিচালকের সাথে প্রেম করেই ক্ষান্ত দেয়নি ক্লডিয়া, এরপর সে আবারো প্রেমে পড়ল। এবারের সম্পর্কটি ছিল যেন আরো গভীর এবং বেপরোয়া। কিন্তু ক্লডিয়ার মেধার কাছে একেবারেই নগণ্য। এ ব্যক্তি হচ্ছে চলচ্চিত্র জগতের এমনই এক সুদর্শন পুরুষ, যার কাছে যে কোনো নারী নির্দ্বিধায় বিলিয়ে দেবে সব।
