শুধু নারীদের ক্ষেত্রেই নয়, আমেরিকা জুড়ে যে বর্ণ বৈষম্য বিরাজ করছে সে প্রসঙ্গেও ভেইল একবার এক দীর্ঘ আর্টিকেল লিখেছিল। তাতে সে জোর দিয়ে উল্লেখ করেছিল— কৃষ্ণাঙ্গরা যেন নিজেদের রঙিন বলে আখ্যায়িত করে। এটাই হবে তাদের জন্য উচিত কাজ। কেননা এই কৃষ্ণবর্ণ অর্থাৎ ব্ল্যাক বিবিধ অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন কালো চিন্তা, কালো নরকের মতে, কালো সমর্থন, কালো টাকা– এ সবই নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচিত। ভেইল শুধু আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গদের উদ্দেশ করেই বলেনি, তার লেখা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের ইতালীয় স্প্যানিয়ার্ডস, গ্রিকসহ বেশ কিছু জাতির কৃষ্ণাঙ্গদেরও আঘাত করে। এসব অঞ্চলের কৃষ্ণাঙ্গ নিজেদের রঙিন হিসেবে ঘোষণা করার ব্যাপারে জোর আপত্তি জানায়। বেশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াই সৃষ্টি হয়েছিল। ভেইলের এসব লেখায়।
চিত্রনাট্যের পাণ্ডুলিপি নিয়ে কাজ করতে করতে বেশ অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব গড়ে উঠল ক্লডিয়া ও ভেইলের মাঝে। ভেইল ছিল ক্লডিয়ার যেন অত্যন্ত মনোযোগী ছাত্র। একেবারেই ব্যতিক্রমী ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করল সে ক্লডিয়ার কাছে। তবে সামাজিক বোধের ওপর ভেইলের যে মারাত্মক চিন্তা চেতনা রয়েছে, সেসব বিষয়ে ক্লডিয়া উৎসাহিত হলেও, প্রায়ই তিক্ত রসিকতায় মেতে উঠত।
অর্থ বিষয়ে ভেইলের যে বেপরোয়া অসচেতনতা, বিষয়টি কিন্তু ক্লডিয়া মেনে নিতে পারেনি। তবে মোটের ওপর তাদের মাঝে সম্পর্কটি ছিল বেশ মজার।
ক্লডিয়া ডি লিনাও যে ইতিমধ্যে নিজেকে ঔপন্যাসিক হিসেবে প্রকাশ করেছে, তা জানিয়েছিল ভেইলকে। হলিউডের চিত্রনাট্য লেখক হিসেবেই সুনামের কারণেই হয়তো তার লেখা বই শেষ পর্যন্ত প্রকাশ হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে তার লেখা বইয়ের মন্তব্য করতে বলেছিল ক্লডিয়া। যেদিন কুডিয়ার এজেন্ট মেলো স্টুয়ার্ট তার লেখা নভেলের ওপর প্রকাশিত সমালোচনাগুলো এনে হাজির করে, সেদিনই আত্মবিশ্বাস দৃঢ় হয় তার। ভেইলকে তাই একটি বই দিয়ে ক্লডিয়া মন্তব্য আশা করেছিল।
ক্লডিয়ার লেখা নভেলের অনেকে প্রশংসা করলেও, সমালোচিত হয়েছে ব্যাপক। বাজারে খুব একটা কাটতি ছিল না। তবে তাতে সে আশাহত নয়। কেউ তার বই কিনুক কিংবা না কিনুক অথবা তার বই চলচ্চিত্রের জন্য যদি মনোনীত নাও হয়, তবুও তার নিজের লেখার প্রতি আস্থা রয়েছে ক্লডিয়ার। ভালোও বাসে সে তার নিজের সৃষ্টিকে। ক্লডিয়া তার এই উপন্যাসটি অবশ্য ভেইলকেই উৎসর্গ করেছিল। তাতে সে লিখেছিল– আমেরিকার জীবন্ত কিংবদন্তি নভেলিস্টকে।
যাই হোক, ভেইল কিন্তু ক্লডিয়ার সমালোচনাই করেছে। এক সাক্ষাতে সে বলল, তুমি খুব ভাগ্যবতী নারী। একজন স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে সত্যিই তুমি ভাগ্যবান কিন্তু ঔপন্যাসিক তুমি নও, আর কখনো হবেও না।
সে দিন প্রায় আধা ঘন্টা ধরে ভেইল ক্লডিয়ার উপন্যাসের সমালোচনা করে। নভেলের অঙ্গচ্ছেদ করে সে বুঝিয়ে দেয়– এটা কোনো লেখাই নয়-~~~ সমালোচনায় নগ্ন করে ছাড়ে তাকে। ক্লডিয়ার লেখাকে সে একটা ছেলেখেলা পাণ্ডুলিপি হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ক্লডিয়াকে বুঝিয়ে দিয়েছে তার লেখায় যেমন আছে কাঠামোগত সমস্যা তেমনি অগভীর। নেই চরিত্র গঠনের শাব্দিক উৎকর্ষ, এমনকি সংলাপেও নেই আকর্ষণ। অথচ এই সংলাপই হচ্ছে তার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। এতে বুদ্ধিদীপ্ত সরলতা আছে কিন্তু প্রাণ নেই। ভেইলের এমন সমালোচনায় ক্লডিয়া আঘাত পেলেও, তার কথায় যে সত্যতা আছে, আছে যুক্তি এটা মেনেই তর্ক করল না।
এত সমালোচনার পর দয়াপরবশ হয়ে ভেইল শুধু এটুকুই বলল, তোমার লেখা বইটি অষ্টাদশী মেয়েদের জন্য হবে বেশ চমঙ্কার। আর আমি এতটা সময় ধরে তোমার লেখার যে সমালোচনা করলাম তা আমার অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান থেকে। তোমার লেখায় এমন কিছু সমস্যা আছে যা তুমি কখনোই শোধরাতে পারবে না। পারবে না মেরামত করতেও। তোমার আসলে ভাষা জ্ঞানের দারুণ অভাব।
ভেইলের এতক্ষণের কঠোর সমালোচনায় আঘাত পেলেও ভেঙে পড়েনি। কিন্তু এবার আর নিজেকে শক্ত রাখতে পারল না– ভেঙে একেবারে যেন খান খান হয়ে গেল। তারপরও শেষ চেষ্টা চালাল যারা তার বইয়ের প্রশংসা করেছে। তাদের দেয়া কৃতিত্বের কথা বলে। ক্লডিয়া বলল, তবে কি যারা প্রশংসনীয় সমালোচনা করেছে তাদের সমালোচনাও ভুল? আমি তো যথাসাধ্য সাবলীল বাক্যই লেখার চেষ্টা করেছি। আরেকটি বিষয়, আমি মূলত তোমার লেখার ছান্দিক ভাষাকেই অনুসরণ করার চেষ্টা করেছি।
এই প্রথম বারের মতো হাসল ভেইল, ধন্যবাদ তোমাকে বলল ভেইল। আমি কিন্তু আমার লেখায় ছান্দিক ভাষারীতি আনার চেষ্টা করিনি। চরিত্রের আবেগেই এমন ভাষা চলে এসেছে। আর তোমার এসেছে জোর করে, যা অবশ্যই ভুল এবং মেকি।
ক্লডিয়া আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। অঝোর ধারায় নেমে এলো অশ্রু। তুমি কি ধরনের মানুষ কেঁদে কেঁদেই বলতে লাগল ক্লডিয়া। এত কঠোর ভাবে কিভাবে তুমি আমাকে বলতে পারলে?
ক্লডিয়াকে স্বাভাবিক করতে ভেইল তৎপর হলো। বলল, একটা প্রকাশনা থেকে প্রকাশ করার মতো মান তোমার লেখায় আছে। তুমি একজন স্বনামধন্য চিত্রনাট্যকার হয়েও ঔপন্যাসিক হওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছ কেন? আমার মতো অনাহারে মরবে তুমি। তুমি চিত্রনাট্যকার হিসেবে অবশ্যই জিনিয়াস।
