ভেইলের সরলতায় তখনও ক্লডিয়া আঁচড় দেয়নি, অর্থাৎ জানায়নি বানজদের প্রকৃত মনোভাবের কথা। বরং ভেইলের সরলতা, বিশ্বাসপ্রবণতা এবং চলচ্চিত্রে তার আগ্রহ নিয়ে ক্লডিয়া মনে মনে বেশ মজাই পাচ্ছিল।
আলোচনার টেবিলে বানজ বলল আর্নেস্ট, তোমাকে সহযোগিতা করার জন্য আমরা ক্লডিয়াকে এনেছি। তার ব্যাপক কারিগরি জ্ঞান রয়েছে এ বিষয়ে ছবি কিভাবে ব্যবসা সফল হবে সে বিষয়েও ভালো ধারণা আছে তার। এ ছবি যে সুপার-ডুপার হিট করবে, তার গন্ধ পাচ্ছি। তবে মনে রেখো, এ ছবির লভ্যাংশের টেন পার্সেন্ট পাবে তুমি।
এমন প্রস্তাবে উজ্জ্বল হয়ে উঠল ভেইলের মুখ। ক্লডিয়া কিন্তু মোটেও খুশি হতে পারল না। গভীরভাবে লক্ষ্য করল ভেইলকে। মনে মনে ভাবল, এই হাবলাটা বুঝতেও পারছে না যে, মোটের ওপর দশ শতাংশ যে শূন্যও হয়ে যেতে পারে নিমেষে বানজদের চক্রান্তে।
তবে ভেইল এই প্রস্তাবে দারুণ কৃতজ্ঞ হয়ে উঠল তাদের প্রতি। আর এই কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ ঘটল যখন সে ক্লডিয়াকে উদ্দেশ করে তাদের বলল, অবশ্যই, আমি তার কাছে শিখব। ছবির জন্য স্ক্রিপ্ট লেখা অবশ্যই বই লেখার চেয়ে অনেক বেশি মজার হবে, যদিও বিষয়টি আমার কাছে একেবারেই নতুন।
ভেইলকে আশ্বস্ত করতে স্কিপি ডিরি এবার বলল, আর্নেস্ট, তোমার মাঝে আমরা সূক্ষ্ম বিচারবুদ্ধির আভাস দেখতে পেয়েছি। আমাদের এ প্রতিষ্ঠান থেকে তুমি ব্যাপক কাজ পেতে পারো। এ ছবি থেকেই তোমার সচ্ছলতাও ফিরে আসতে পারে, সত্যিই যদি ছবিটি হিট করে এবং একাডেমি অ্যাওয়ার্ড জিতে নেয়।
ক্লডিয়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টি হেনে দেখতে লাগল ডিরি ও বানজকে। দুজনই আজব ঠেকল ক্লাডিয়ার কাছে। তার মনে হলো––এ টেবিলে উপস্থিত তিনজনই অর্থাৎ বানজ-ডিরির সাথে গোবেচারা ভেইলও হলিউডে যেন তেমন একটা অপরিহার্য নয়– তারা না থাকলেও হলিউড চলবে আপন গতিতে এবং সগর্বেই। ক্লডিয়ার মনে পড়ে গেল তখনও সেই সার্জনের ছুরির পোচ পড়েনি তার। মাফিয়াদের মতো চিবুক নিয়েই ধুকে ধুকে চলছে তার স্বপ্নের জগতে পদচারণা। সবার চোখে সুন্দরী হয়ে ওঠেনি তখনও ক্লডিয়া। স্পষ্ট মনে আছে তার-~ এই ডিরি কি তাকে কম ঘটিয়েছে?
ক্লডিয়া জানে এই প্রকল্পটি হাতে নেয়ার সাথে সাথেই হাজারো সমস্যা এসে জুটেছে। যাই হোক সে রাতে ভেইল তাকে ডিনারের প্রস্তাব দিল। খুব সাদামাটা উদ্দেশ্য। নতুন স্ক্রিপ্ট নিয়ে তারা কিভাবে কাজ করবে, তার একটা পরিকল্পনার জন্যই ভেইলের এ প্রস্তাব। ক্লডিয়া সম্মত হলো। কিন্তু সে নিজেকে মোটেও আকর্ষণীয় করে উপস্থিত হলো না সে সাক্ষাতে। কৌশলে এড়িয়ে গেল রোমান্টিক সব বিষয়। কাজের সময় এসব রোমান্স-টোমান্স ক্লডিয়ার একেবারে পছন্দ নয়। বিশেষ করে লেখালেখির সময় এ ধরনের বিষয় যোগ হলে কাজে মারাত্মক সমস্যা হয় ক্লডিয়ার।
সেই রাতের ডিনার থেকে শুরু হলো একসাথে স্ক্রিপ্ট লেখার কাজ। দেখতে দেখতে কেটে গেল দুটি মাস। আর আশ্চর্যের সাথে ক্লডিয়া লক্ষ্য করল তাদের সম্পর্ক অনায়াসে বন্ধুতে পরিণত হয়েছে।
কাজ করতে করতে একঘেয়ে হয়ে উঠেছিল তারা। মনে হলো যেন কিছুটা অবসরের দরকার। দুজনেরই এক দশা। মনোস্থির করল ভেগাসে যবে। ক্লডিয়া ভেইল একসাথেই রওনা হলো ভেগাসের উদ্দেশে গ্যাম্বলিংয়ে বেশ দুর্বলতা রয়েছে ক্লডিয়ার। ভেইলও একই পথের পথিক, এ লাম্পট্যে দুর্বলতা তারও।
ভেগাসে ক্লডিয়া ভেইলকে পরিচয় করিয়ে দিল তার ভাই ক্রসের সাথে এবং অবাক হয়ে লক্ষ্য করল তাদের সম্পর্কটি যেন তেলে আর জলে– কোনো দিনই তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হওয়ার কোনোই সম্ভাবনা নেই। বেশ বুঝতে পারল ক্লডিয়া।
আর্নেস্ট প্রকৃতই একজন বুদ্ধিজীবী। গলফের প্রতি তার আগ্রহই নেই। অপরদিকে ক্রস বছরেও একটা বই পড়ে কি-না সন্দেহ। ভাই ক্রসকে ভেইলের কেমন লাগল– এমন প্রশ্নের জবাবে ভেইল বলল, সে হচ্ছে শ্রোতা আর আমি যেন বক্তা।
এটা কোনো প্রকৃত ব্যাখ্যা হলো না। ক্লডিয়া হতাশ হলো। এরপর ভেইল সম্পর্কে ক্রসের কাছে জানতে চাইল ক্লডিয়া। ক্রসের উত্তর যেন আরো দুর্বোধ্য, আরো রহস্যময় মনে হলো।
ক্লডিয়ার প্রশ্নে ক্রসের ভেতর যেন তোলপাড় করে উঠল। বেশ কিছুটা সময় নীরব ছিল সে। অবশেষে বলে উঠল, তার প্রতি তোমার একচোখা দৃষ্টি দেয়া ঠিক হবে না। আমি যতটুকু বুঝতে পেরেছি তার যেন কিছুই চাওয়ার নেই। এবং সে ক্লডিয়াকে হুঁশিয়ার করে দিল সে খুব শিগগিরই তা বুঝতে পারবে। খুব অবাক ঠেকল ক্রসের এই খোলামেলা মন্তব্য। আর্নেস্ট ভেইল এমনই এক দুর্ভাগা যে তার কোনো কিছুই গোপনীয় নয়, এমনকি ভবিষ্যৎ কর্মপন্থাও।
আর্নেস্ট ভেইলের সাথে ক্লডিয়ার সম্পর্কটি একটু ভিন্ন ধরনের। সারা বিশ্বের অত্যন্ত জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক হলেও, হলিউডে তার কোনো ক্ষমতাই নেই। এছাড়া তার যেমন নেই কোনো সামাজিক প্রাপ্তি তেমনি সে মারাত্মক ধরনের সদাবিরুদ্ধচারী। পত্র-পত্রিকা, ম্যাগাজিনে তার আর্টিকেলগুলো সব সময়ই জাতীয় বিরোধের উস্কানিমূলক এবং দেখা গেছে তার অনুমানগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুল হয়ে থাকে। তবে রাজনৈতিক দলগুলোকে বেশ তাতিয়ে তোলে তার লেখাগুলো। আমেরিকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ব্যঙ্গ করে তার লেখাগুলো। নারীবাদের ঘোর সমালোচক ভেইল। এক লেখায় সে স্পষ্টই উল্লেখ করেছিল শারীরিক কাঠামোগত দিক দিয়ে সমান না হওয়া পর্যন্ত নারীরা পুরুষদের বশীভূত হয়ে থাকবে। নারীবাদীদের প্রতি তার উপদেশমূলক উক্তি হলো–তাদের পার্লামেন্টারি প্রশিক্ষণ দল প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
