ক্লডিয়া বুঝতে পারল বিষয়টি। বলল, এমন সময় উপভোগ করে আমি কখনোই আমার সুবিধা আদায় করতে অভ্যস্ত নই। বরং কোনো স্ক্রিপ্ট নিয়ে যদি আপনি কখনো সমস্যায় পড়েন, আমাকে কল করবেন। সে ক্ষেত্রে উপদেশ হবে বিনা পয়সায়, আর যদি আমাকে লিখতে হয় তবে এর জন্য পে করতে হবে।
অত্যন্ত কাঠখোট্টা প্রফেশনাল জবাব শুনিয়ে দিল হলিউডের প্রভাবশালী, ক্ষমতাবান বৃদ্ধ ম্যারিয়নকে। এমন একটা ভাব দেখাল সে যেন ক্লডিয়ার প্রয়োজনে নয়, ম্যারিয়নেরই প্রয়োজন পড়তে পারে ক্লডিয়াকে এবং খুব একটা সত্য কথা না হলেও গর্ব ভরে ম্যারিয়নকে সে বলল, আমার নিজের মেধার প্রতি যথেষ্ট আস্থা রয়েছে।
বন্ধু হয়েই সেদিনের মতো বিদায় নিল ক্লডিয়া। ম্যারিয়নের মনেও ছেয়ে রইল ক্লডিয়ার ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব।
সমুদ্র উপকূলের হাইওয়ে ধরে এগিয়ে যাচ্ছিল ক্লডিয়া। এখানে গাড়ির গতিসীমা কম। বাম পাশে সমুদ্র সৈকত। রোদের আলোয় সমুদ্রের ঢেউয়ের ঝিলিক। আপন মনেই দৃষ্টি চলে গেল সেদিকে। সৈকতে অর্ধনগ্ন মানুষের শান্ত ঘোরাফেরা। তাকিয়ে রইল সেদিকে ক্লডিয়া। মনে পড়ে গেল সেই ছোটবেলার কথা– কতবারই না এসেছে সে বেড়াতে। মাথা উঁচু করে দৃষ্টি গেল সৈকত পেরিয়ে, সাগরের উত্তাল ঢেউ পেরিয়ে আরো অনেক দূর একেবারে দিগন্তরেখা অবধি। সেখানে যেন সাগরের উত্তালতা নেই। সর্ষে বিন্দুর মতো কিছু মাস্তুল চোখে পড়ল তার। দৃষ্টি ফিরে এলো হাইওয়ের ডান ডিকের এক জটলায়। ক্যামেরা, বোর্ড আর সাউন্ড সিস্টেম ঘিরে উৎসুক জনতা, হয়তো কোনো ছবির শুটিং চলছে। সৈকত তীরের এমন হাইওয়ে ধরে গাড়ি চালাতে ক্লডিয়ার খুব ভালো লাগে। আর ঠিক ততটাই এ বিষয়ে বিতৃষ্ণা আর্নেস্ট ভেইলের। ক্লডিয়ার মনে পড়ে গেল। ভেইল প্রায় বলত, এই হাইওয়ে ধরে গাড়ি চালানো যেন নরকের জন্য ফেরি ধরা।
আর্নেস্ট ভেইলের সাথে তার প্রথম সাক্ষাতের কথা স্পষ্ট মনে আছে ক্লডিয়ার। ভেইলের বহুল জনপ্রিয় নভেলের গল্প অবলম্বনে চিত্রনাট্য তৈরির জন্য যেদিন ডাক পড়ল ক্লডিয়ার, সেদিনই প্রথম দেখা। আগে থেকেই ভেইলের ভক্ত ছিল ক্লডিয়া। কিন্তু কখনো এই স্বপ্নের লেখকের সাথে সাক্ষাৎ হয়নি। দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ হলো একেবারে লেখকের গল্পের চিত্রনাট্য লেখার দায়িত্ব পেয়ে।
ভেইলের লেখা প্রতিটি বাক্যে ক্লডিয়া পেত ভিন্ন স্বাদ, যেন মিউজিকের একটা ছান্দিক ভাব ফুটে উঠত লেখায়। পরবর্তীতে এ ছন্দেই দুজন গড়ে নেয় জীবনের কাব্য। ভেইলের লেখাগুলো হতো সর্বদাই বিয়োগান্তক চরিত্রের বিয়োগান্তক পরিণতি ছাড়া যেন কিছুই বোঝে না সে। তবে এর মাঝেও ছিল তার লেখার অভিনবত্ব। নতুন নতুন লেখায় অভিনব কৌশলে মুগ্ধ হয়েছিল ক্লডিয়া।
.
ছোটবেলা থেকেই সে পড়ছে ভেইলের লেখা। আর যতই বড় হচ্ছিল সে, ততই যেন স্বপ্নের এই লেখকের সাথে সাক্ষাৎ লাভের বাসনা প্রগাঢ় হয়ে উঠেছিল। তার কথা চিন্তা করে রোমাঞ্চ অনুভূত হতো তার। কিন্তু যখন তাকে সামনে পেল, সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মানুষ হয়ে দেখা দিল ক্লডিয়ার কাছে।
ভেইলের তখন পঞ্চাশ বছর বয়স। শারীরিক অবকাঠামোকে তার লেখা গদ্যের মতো মনে হলো না ক্লডিয়ার। বোটে, মোটা এবং টাক মাথা। ক্লডিয়ার মনে হলো, তার এই টাক ঢাকার কোনো চেষ্টাই যেন সে করেনি কখনো। এমনকি তার দৈনন্দিন জীবনে নিজের সামান্যতম সৌন্দর্যের যত্ন নেয়নি কখনো। অথচ গল্পের চরিত্রগুলোর জন্য ছিল তার অপার স্নেহ, অশেষ যত্ন। হয়তো এটাই ছিল তার ব্যক্তি জীবনের সবচেয়ে উচ্ছ্বাসের বিষয়, শিশুর মতো সরলতা। বুদ্ধিমত্তাকে ছাপিয়ে যে সরলতা ক্লডিয়া ভেইলের মাঝে খুঁজে পেয়েছিল, তাতেই সে দুর্বল হয়ে পড়ল।
পোলো লাউঞ্জের প্রতি আর্নেস্ট ভেইলের রয়েছে সীমাহীন দুর্বলতা। সে মনে করে, পোলো লাউঞ্জে যদি অন্তত এক বেলা সকালের নাস্তা করতে পারত, তবে সে হতো পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। এই হচ্ছে তার মানসিক সরলতা। গুটিয়ে রাখাই যেন তার স্বভাব। তবে লেখক হিসেবে মোটেও নয়– নিখুঁত এবং প্রাণখোলা তার সব সৃষ্টি।
এ পর্যন্ত ভেইলের লেখা নভেলের সমালোচনা হয়েছে ব্যাপক। সমালোচকদের আকুণ্ঠ উদ্ধৃতি তার জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে, সে তুলনায় অর্থের প্রাপ্তি কিন্তু নগণ্যই বলা যায়। অর্থ প্রাপ্তি যাই হোক, শীর্ষ জনপ্রিয় ভেইলের নভেল অবশেষে চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য মনোনীত হয়েছে। আর এই উদ্যোগ বিখ্যাত লডস্টোন স্টুডিওর।
লডস্টোনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ববি বানজ। ভেইলের লেখাগুলো যেন তার হৃদয় স্পর্শ করেছে এভাবেই প্রশংসা করেছিল বানজ। তার সাথে তাল মিলিয়েছিল স্কিপি ডিরিও। তারা প্রায় এক সাথেই বলেছিল– চমৎকার তোমার লেখা। মুখোমুখি এমন প্রশংসায় লজ্জায় মাথা নত করে ফেলেছিল ভেইল। স্বপ্নের লেখক ভেইলের এমন সরলতায় সেদিন ক্লডিয়াও তাজ্জব বনে। গিয়েছিল।
লেখক ভেইলের সাথে সেটাই প্রথম মিটিং। ক্লডিয়ারও প্রথম সাক্ষাৎ। এরপর আবারও স্টুডিও কার্যালয়ে বসল তারা। কয়েকটা ঘণ্টা মাত্র অতিবাহিত হয়েছে এর মাঝে, অথচ কেমন বেমালুম পাল্টে গেল সুর বানজ-ডিরির মনোভাব, সামগ্রিক বাতাবরণ। যে মুখে ভূয়সী প্রশংসা করেছিল বানজ সেদিন, সে মুখেই দ্বিতীয় দিনের আলোচনায় ভেইলের উপন্যাসকে আকাশ থেকে একেবারে আছড়ে ফেলল মাটিতে। বলা হলো– সাদা কাগজ ভরে আবল তাবল কিছু আঁকিবুকি ছাড়া আর কিছুই নয়। এমন কথা অবশ্য ভেইলের অগোচরেই বলা হলো। শুধু জানল ক্লডিয়া, আর অবাক হলো বানজ ও ডিবির ধূর্ততায়।
