ডেন্টি কিংবা ক্রসেরই সমবয়সি লিলা। তবে তার শারীরিক কাঠামোয় এখনও নারীত্ব ফুটে ওঠেনি। এই বয়ঃসন্ধিক্ষণ কিংবা তার নব যৌবনের এই সময়ের কারণেই লিলার সৌন্দর্যে যেন একটা খুঁত রয়ে গেছে কোথাও। মধুরঙা চুল লিলার, ত্বকে যেন সদা সতেজতার আভা। সে তুলনায় মুখমণ্ডল পরিপূরক নয় মনে হবে যেন এখনো পরিপূর্ণ গঠনই হয়নি তার।
লিলার পরনে ছিল অ্যাঙ্গোরা সোয়েটার। এই পরিধেয়টি তার সফেদ ত্বককে করে তুলেছে স্বর্ণাভ। মুখোমুখি হতেই যেন ক্রস লিলার প্রেমে পড়ে গেল।
কিন্তু ক্রস যখন তার সাথে কথা বলতে আগ্রহী হলো, লিলা কেন যেন এড়িয়ে গেল তাকে। ক্রস ও ডেন্টির কাছ থেকে সরে লিলা গিয়ে বসল আরেক টেবিলে।
মর্মাহত হলো ক্রস। ডেন্টিকে বলল, আমার মনে হয় সে আমাকে ঠিক পছন্দ করেনি। মুখে একটা শুষ্ক হাসি টেনে ক্রসকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করল ডেন্টি। ধূর্ততার সাথে অপর এক দল সমবয়সি যুবকদের দিকে হাত উঠিয়ে অভিবাদন জানাল।
কোকড়ানো ঘন-কালো চুল ডেন্টির। অনেকটা ডন ক্লেরিকুজিও’র মতো। আর তা প্রদর্শনের জন্য সে ক্যাপ পরলেও অভিনব কায়দায় কিছুটা বের করে রাখে, যেমন রেখেছে এ মুহূর্তে। বেশ খাটো আকৃতির, উচ্চতা পাঁচ ফুটের দু এক ইঞ্চি বেশি হতে পারে বড়জোর। তবে তার আত্মবিশ্বাস, দৃঢ়তা প্রখর। আর এর মূলে রয়েছে স্বয়ং ডন ক্লেরিকুজিও’র প্রচ্ছন্ন নির্ভরতা ও ভালোবাসা। এ বয়সেও ডন প্রায়ই ডেন্টিকে নিয়ে মুক্ত বাতাসে হাঁটতে বের হন।
ক্রসের উদ্দেশ্যে ডেন্টি বলল, মেয়েটির নামের শেষে রয়েছে এনাকস্তা! ক্রস তার স্মৃতি হাতড়ে নামটি মনে করার চেষ্টা করল। মনে পড়ল তার বছর খানেক আগে এক এনাকস্তা পরিবার ট্র্যাজেডির মুখে পড়েছিল।
মিয়ামি হোটেলের এক কক্ষে পরিবারটির কর্তা এবং তার বয়োজ্যেষ্ঠ পুত্রকে কেউ যেন হত্যা করেছিল। মনে করতে পারল ক্রস। কিন্তু এই ঘটনার সাথে মেয়েটির সম্পর্ক কি?
ডেন্টি ক্রসের চিন্তাযুক্ত সংকুচিত মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার কাছ থেকে কোনো প্রশ্ন কিংবা উত্তর আশা করছিল ডেন্টি।
বিস্মিত ক্রসের সপ্রশ্ন কণ্ঠে বলল, এর মানে?
তুমি তো তোমার বাবার হয়েই কাজ করছ, তাই না? ডেন্টির সহজাত প্রশ্নঃ হ্যা! ক্রসের বিস্ময়বোধ যেন বাড়ছে।
লিলার সাথে নিশ্চয়ই সম্পর্ক গড়তে চাও? মুচকি হেসে বলল ডেন্টি। তুমি দুর্বল হয়ে পড়েছ।
ক্রস জানে এর উত্তর দেয়াটা বিপজ্জনক হতে পারে। ডেন্টির এ প্রশ্নের কোনো উত্তর দিল না ক্রস।
ডেন্টি এবার বলল, তুমি কি জানো না তোমার বাবার কাজটা কি?
সে একজন মানি কালেক্টর। তাৎক্ষণিক জবাব দিল ক্রস।
ডেন্টি মাথা নেড়ে নেতিবাচক উত্তর দিল। বলল, তোমার জানা দরকার। তোমার বাবা ফ্যামিলির জন্য মানুষদের একেবারেই সরিয়ে ফেলে।
এক ঝটকা ঝড়ো হাওয়ায় সব কিছু যেন পরিষ্কার হয়ে গেল। ক্রস এত দিনে বুঝতে পারল, কেন তার মা বাবাকে পছন্দ করত না। কেন বন্ধুরা বাবাকে এত শ্রদ্ধা করত, শ্রদ্ধা করত ক্লেরিকুজিও পরিবারকে। ক্রসের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল, কেন তার বাবার সার্বক্ষণিক অস্ত্র এবং দেহরক্ষীর প্রয়োজন হয়।
ক্রস স্পষ্ট মনে করতে পারছে তার বাবার হত্যা মামলার রায়ের ঘটনা। এটি প্রায় ভুলেই যেতে বসেছিল ক্রস। বিশেষ করে সেদিন রাতে বাবা যখন তার হাতটি নিজের হাতে তুলে নিয়েছিল গভীর স্নেহে, ক্রস ভুলে গিয়েছিল সব। তবে এসব ভেবেও বীতশ্রদ্ধ হলো না সে তার বাবার প্রতি। বরং উষ্ণ এক আবেগ যেন আরো ঘনীভূত হলো। উপলব্ধি করতে পারল, এখন যতই নগ্ন হোক না কেন, বাবার সুরক্ষায় তাকেই এগিয়ে যেতে হবে।
ডেন্টির ওপর ভয়ানক ক্ষুব্ধ হলো ক্রস। বাবার এই গোপনীয় সত্যতা সে তাকে না বললেও পারত।
ডেন্টির উদ্দেশে বলল, না, আমি সে সব জানি না এবং তুমিও কিছুই জানো না। কেউই জানে না কিছু।
ভয়ানক ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল ক্রস। সংযত করার চেষ্টা করল নিজেকে। কিছুটা সময় থামল মাত্র কয়েক পলক। তারপর রসিকতা করে বলল, তোমার ওই ফাঁক-ইন হ্যাটটি কোত্থেকে পেলে?
.
ইস্টার সানডের ইস্টার এগ হান্টিং ইভেন্টে বাচ্চাদের সাথে তুমুল হৈচৈয়ের মধ্যে মেতে ছিল ভার্জিনো ব্যালাজো। শিশুদের সাথে এ খেলায় এমনভাবে মগ্ন হয়ে গিয়েছিল, যেন সে জন্মসূত্রেই একজন ভাড়। আর শিশুরাও মজে গিয়েছিল তার ভাঁড়ামিতে। তাকে ঘিরে ধরেছিল সবাই। ছোট্ট শিশুগুলোকে ফুলের মতো দেখাচ্ছিল– ছোট ছোট মুখ, ডিমের খোলসের মতো সাদা ত্বক, মাথায় গোলাপি সুদৃশ্য টুপি আর বাহারি পোশাক– চমৎকার এক দৃশ্যের অবতারণা। ব্যালাজো শিশুদের হাতে ধরিয়ে দিচ্ছিল খর ভর্তি একটি করে ছোট বাক্স, বিনিময়ে শিশুরা ব্যালাজোর গালে এঁকে দিচ্ছিল একটি করে চুমু। বাক্স নিয়েই শিশুরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিল ব্যালাজোর সামনে থেকে।
বেশ পরিপাটি হয়ে ইস্টার সানডের এ উৎসবে এসেছে ভার্জিনো ব্যালাজো। তার পরনের সুটটি লন্ডনের তৈরি, জুতো জোড়া ইতালির, শার্ট ফ্রান্সের। চুলগুলো কাটিয়েছে ম্যানহাটানের মাইকেল এঞ্জেলোতে। তাকে দেখে যে কেউ মনে করবে অত্যন্ত আশীর্বাদপুষ্ট সুখী জীবন তার। সুখী তার মেয়েও। সার্বক্ষণিক বাবার পাশে রয়েছে। শিশুদের সাথে আনন্দে মেতে রয়েছে সে-ও।
