কয়েক পলক থামল পিপি। তারপর বলল, সন্তানরা যে আমার চেয়ে তোমাকেই বেশি ভালোবাসে এটা জেনেও কি তোমার জন্য যথেষ্ট হয়নি?
পিপির এ কথায় যেন ঘরের সমস্ত পরিবেশ রুদ্ধ হয়ে গেল। থেমে গেল পিপির থমথমে গলা। সে চায় না যে সে যা বলছে তা তার সন্তানরা বুঝুক। তবে ন্যালিনি বুঝতে পারল। সব কিছু উড়ে গেল, পিপির ওপর যে ভীতি ভাব ছিল তা-ও সরে গেল। ন্যালিনি যেন ছোঁ মেরে টেনে নিল ক্লডিয়াকে তার বুকের মাঝে।
আর ক্লডিয়া তাকিয়ে রইল তার ভাই ক্রসের দিকে। মিনতিভরে শুধু একবার ডাকল, ক্রস…।
ক্রসের মুখমণ্ডলে ছিল উদাসীন সৌন্দর্য। মায়ের দিক থেকে ঘুরে দাঁড়াল ক্রস। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল বাবার দিকে। পাশে গিয়ে দাঁড়াল সে। শান্ত কণ্ঠে বলল, আমি তোমার সাথেই যাব, ড্যাড। উচ্ছ্বসিত পিপি কৃতজ্ঞ চিত্তে ক্রসের হাত তুলে নিল নিজ হাতে।
অনাকাক্ষিত এ দৃশ্যে হতবাক ন্যালিনি ডুকরে কেঁদে উঠল। বলল, যখন তোমার ইচ্ছে হবে আমাকে দেখতে এসো, ক্রস। স্যাকরামেন্টোয় তোমার একটা আলাদা বেডরুম থাকবে সাজানো। সেটা কেউই ব্যবহার করবে না।
যা ঘটার ছিল— ঘটল না, ঘটল উল্টোটা। অন্তত ন্যালিনি কয়েক মুহূর্ত আগেও ভাবেনি যে ক্রসকে তার ছেড়ে যেতে হবে!
কিন্তু পিপি যেন উচ্ছ্বসিত। যেন ফিরে পেয়েছে তার জীবনের সব কিছু। মনের একটা ভারী বোঝা যেন নেমে গেল মুহূর্তেই। বোধশক্তিও লোপ পেল তার। অকস্মাৎ বলে উঠল, আমাদের এবার সেলিব্রেট করা উচিত।
একটু থেমে আবার বলল, এটা সত্য যে আমাদের বিচ্ছেদ হয়ে গেল। তবে এখন থেকে একটি সুখী পরিবারের বদলে আমাদের দুটি সুখী পরিবার হব এবং পরবর্তী যে কটা দিন বাঁচব, সুখেই থাকব।
পিপির এ কথা শুনে কঠিন মুখে তাকিয়ে থাকল সবাই তার দিকে। নিজেকে সামলে সে বলল, ঠিক আছে, যা ঘটেছে তা তো ঘটেছেই। আমরা সুখী হবার চেষ্টা করব।
প্রথমে দুবছর ভেগাস-স্যাকরামেন্টো যোগাযোগ মোটামুটি নিয়মিত ছিল। এরপর থেকে ক্লডিয়া আর কখনোই ভেগাসমুখো হয়নি। ক্রস কিন্তু অব্যাহত রেখেছিল ন্যালিনি ও তার বোন ক্লডিয়াকে দেখতে যাওয়া। ক্রসের যখন পনের বছর বয়স, তখন থেকে তার স্যাকরামেন্টো সফরও কমে যায়। শুধু ক্রিসমাসের ছুটিতেই সে যেত মা ও বোনের সাথে দেখা করতে।
এভাবেই দুই শহরে পৃথক থেকে বাবা ও মা তাদের প্রাপ্ত সন্তান নিয়ে কাটিয়ে যাচ্ছিল। ক্লডিয়া যতই বেড়ে উঠতে লাগল, তার মধ্যে ধীরে ধীরে দেখা গেল মায়ের গুণ। সে ভালোবাসে স্কুল, ভালোবাসে বই পড়তে, থিয়েটার তার পছন্দ, মায়ের মতো সে-ও ভালোবাসে ফিল্ম কিংবা মিউজিক। মোট কথা, মায়ের সব পছন্দ, ভালোলাগাগুলো তার মধ্যে দেখা গেল। আর ন্যালিনি তার মাঝে দেখতে পেল বাবার তেজোদীপ্ত চরিত্র ও উচ্ছ্বাস। বেশ সুখী ছিল মা ও মেয়ে স্যাকরামেন্টোতে।
সে তার বন্ধু-বান্ধব নিয়ে এক প্রকার সুখী জীবনই কাটিয়ে যাচ্ছিল। ইতিমধ্যেই তার পদোন্নতি হলো। একটি পাবলিক হাই স্কুলের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রিন্সিপাল হলো ন্যালিনি।
অপর দিকে পিপি ও ক্রস ও কাটিয়ে যাচ্ছিল সুখী জীবন। তবে ন্যালিনি ক্লডিয়ার চেয়ে ভিন্ন ভিন্ন তাদের জীবন পদ্ধতি, ভিন্ন তাদের প্রেক্ষাপট। পিপি তার মতো করে গড়ে তুলছিল ক্রসকে। ক্রস যখন হাই স্কুলে, তখন পিপি বুঝতে পারল, এথলেটে সে তার সব বন্ধুদের চেয়ে অনেক এগিয়ে আর লেখাপড়ায় ঠিক ততটাই পিছিয়ে। হাই স্কুলের পাট চুকিয়ে ক্রস আর কলেজের লেখাপড়ায় আগ্রহী হলো না। তাছাড়া তার মধ্যে আরেকটি বিষয় ছিল লক্ষ্য করার মতো একজন সুদর্শন যুবক হয়েও ক্রসের নারীর প্রতি তেমন একটা আসক্তি ছিল না।
ক্রস তার বাবার সাথে উপভোগ করছিল জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র। পিপির যে কোনো সিদ্ধান্ত যতই খারাপ হোক না কেন ক্রস যেন উৎসাহিত হয়ে উঠত, উপভোগ করত। ক্লডিয়ার কাছে যেমন তার মা তেমনি পিপিও ক্রসের কাছে। একজন ভালো বাবা, একজন ভালো বন্ধু হয়ে উঠল। ক্রসের মাঝে পিপি বিলিয়ে দিল তার সবটুকু তৈরি করল সম্পূর্ণ তার মতো করে।
ক্রস মেতে উঠল জানাদু হোটেলের কাজকর্ম নিয়ে। শো-গার্লদের প্রতি তার ছিল খুব সাধারণ প্রবৃত্তি। এসব ক্ষেত্রে অবশ্য পিপি তার পুত্রের ওপর জোর করে কোনো বাধা-নিষেধ আরোপ করেনি। তবে তার ইচ্ছে ক্রস যাতে ক্লেরিকুজিও পরিবারে তার অবস্থান করে নেয়। আর ডন ক্লেরিকুজিও’র একটি উদ্ধৃতির প্রতি পিপির দারুণ বিশ্বাস। ডন প্রায়ই বলতেন, প্রত্যেকটি মানুষের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তার রুটিটুকু আয় করে নেয়া।
ছেলের ভবিষ্যৎ চিন্তা করেই পিপি তাকে কালেকশন এজেন্সির অংশীদার করে নিল। তাছাড়া প্রায়ই ক্রসকে নিয়ে সে যেত গ্লোনিভেন্টের সাথে ডিনার করতে। এই সাক্ষাতে, আলাপ-আলোচনায় যাতে গ্রোনিভেল্ট তার দিকে শুভ দষ্টি দেয়। এভাবে ধীরে ধীরে ক্রস গ্রোনিভেল্টের গলফ সঙ্গীতে পরিণত হলো। ক্রসের মাত্র সতের বছর বয়সে যেভাবে গলফের বল নির্দিষ্ট গর্তে পৌঁছে দিত, দেখে মুগ্ধ হতে গ্রোনিভেল্ট। আর তাই সে ক্রসকেই তার পার্টনার করত প্রায় সময়। দুপার্টনার মিলে জিততে শুরু করল একের পর এক চ্যালেঞ্জ। পিপি উচ্ছ্বাস নিয়ে তাদের এই জয়ের আনন্দ উপভোগ করত, গর্বিতও হতো।
