তবে প্রসঙ্গ পাল্টে ন্যালিনি আবারো পিপির উদ্দেশ্যে বলল, মনে রেখো, যদি সন্তানরা দুজনই আমার সাথে থাকতে চায় তবে তুমি বাধা দিতে পারবে না।
তারা তাদের বাবাকেও ভালোবাসে, পিপির নিশ্চিত উত্তর। সে বলল, তাদের যে কোনো একজন থাকবে এই বুড়ো মানুষটির সঙ্গে।
ডিনার পর্ব শেষ হলো। সারাটা ঘরে ছিল বরফ শীতল ঠাণ্ডা। অপরদিকে বাইরের আবহাওয়া যেন মরুভূমির তপ্ত প্রবাহ। এমনই এক পরিমণ্ডলে আজ হতে চলেছে দুটি জীবনের চূড়ান্ত ফয়সালা।
এগার বছরের ক্রস আর দশ বছরের ক্লডিয়া। বাবা-মায়ের পরিণাম ভোগ করতে হবে তাদেরও, বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের রেশ পোহাতে হবে তাদেরও। তারাও একরকম প্রস্তুত। ইতিমধ্যেই সব কিছু খুলে বলা হয়ে গেছে ক্রস এবং ক্লডিয়াকে। এখন শুধু তাদের মতামতের অপেক্ষা- কে যাবে কার সাথে।
সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার, বাবা-মায়ের ডিভোর্সের এই সিদ্ধান্তে ক্রস কিংবা ক্লডিয়ার চোখে-মুখে কোনো ভাবান্তর নেই। ভাবনা কেবল এই, তারা কার সাথে যাবে, বাবা, না-কি মায়ের সাথে?
ক্রস হ্যান্ডসাম। তার মায়ের মতোই সুন্দর। তবে তার ভেতরে যে দৃঢ়তা, তা বাবার মতো। এ মুহূর্তে সে সম্পূর্ণরূপে ভীতিহীন। দৃঢ়তার সাথে ক্রস বলল, আমি মার সাথেই থাকছি।
ক্লডিয়া একটু ঘাবড়ে গিয়েছে– কি বলবে সে? ভেবে পাচ্ছে না। তবে ক্রসের মতামত শুনে এই ছোট্ট শিশু ক্লডিয়া বলল, আমি ক্রসকে ছেড়ে যাব না।
হোঁচট খেল, পিপি সাথে বিস্মিতও হলো। ক্রস ছিল পিপির সবচেয়ে কাছের। ন্যালিনির চেয়েও বেশি। ক্রস হচ্ছে সেই ছেলে যে পিপির সাথে হতো শিকারের সঙ্গী। সে বাবার সাথে কার্ড খেলতে পছন্দ করত– খেলত গলফ এবং বক্সিং। ন্যালিনির বই পড়া কিংবা মিউজিক শোনায় তার কোনো আগ্রহই ছিল না। এই সেই ক্রস! পিপি ভেবেছিল অন্তত ক্রস তাকে ফেলে যাবে না।
বিস্মিত হলো ক্লডিয়ার অত্যন্ত কৌশলী উত্তরে। এ মেয়েটি অনেকটাই তার নিজের মতো দেখতে অবশ্যই স্মার্ট। তবে সে যে তার মায়ের দিকটাই টানবে, এটা যুক্তিযুক্ত। এর কারণ– ন্যালিনি যা করে ক্লডিয়া তাই ভালোবাসে। বাবার কর্মকাণ্ডের প্রতি তার আগ্রহ নেই বললেই চলে। এমন সন্তান নিয়ে পিপি কি করবে?
গভীরভাবে লক্ষ্য করতে লাগল পিপি তার সন্তানদের। মনে মনে গর্বিত হলো সে। অন্তত সন্তানরা তাদের মাকে চিনতে পেরেছে।
ন্যালিনি আজ সেজেছে বিশ্রী কালো পোশাকে কালো ট্রাউজারের সাথে কালো পুলওভার। মাথার সোনালি চুলগুলোও ঢেকে দিয়েছে কালো হেডব্যান্ড বেঁধে। চিকন, লম্বাটে দেখাচ্ছে ন্যালিনির মুখ– কালোর মাঝে সাদা এক লম্বাটে বৃত্ত।
এ অবস্থায় সচেতন পিপি— অন্তত শিশুদের সামনে তার নির্দয় আচরণ ও অভব্যক্তি থেকে স্বভাবসুলভ স্বাভাবিক থেকে পিপি শিশুদের উদ্দেশে বলল, সব কিছুর পরও আমি তোমাদের মধ্য থেকে অন্তত একজনকে পেতে চাই। কথা দিচ্ছি, ইচ্ছে করলেই তোমরা যে কোনো সময় দুজন দুজনের সাথে দেখা করতে পারবে। তোমরা আমাকে এই ভেগাসে একা ফেলে যেও না।
স্থির দৃষ্টি হেনে দুজনই তাকিয়ে থাকল বাবার দিকে। পিপি ন্যালিনির দিকে তাকাল। কণ্ঠে অনুনয়ের স্বর। বলল, এ ব্যাপারে তোমাকেই সহযোগিতা করতে হবে। তোমাকেই নির্ধারণ করতে হবে কাকে তুমি নেবে।
উত্তেজিত হয়ে উঠল পিপি, আমাকেই কেন ছাড়তে হবে সব?
তুমি কিন্তু কথা দিয়েছিলে– তাদের দুজনই যদি আমার সাথে যেতে চায় তবে তুমি বাধা দেবে না। ন্যালিনি মনে করিয়ে দিল পিপিকে তার প্রতিশ্রুতির কথা।
পিপির অনুভূতিগুলো যেন কেমন হয়ে যাচ্ছে। কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না যে সব কিছু শেষ হয়ে যাবে অল্প সময়ে। তবে সে জানে তার সন্তানরা তাকে ভালোবাসে। মাকে ভালোবাসে একটু বেশি, এই যা। তার অর্থ এই নয় যে শিশুরা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা একেবারে সঠিক। অবজ্ঞাভরে ন্যালিনি বলল, এর পর আর কিছুই বলার থাকে না। তুমি যেখানে কথা দিয়েছ
পিপি বুঝতে পারছে না তার সামনে দাঁড়ানো মানুষগুলোর চোখে তাকে কেমন দেখাচ্ছে। তবে সে নিজেকে যতটা সম্ভব সংযত রাখার চেষ্টা করেছে। কথায়-আচরণে স্বাভাবিকই থাকার চেষ্টা চালিয়ে গেছে, যেন নিজের বিরুদ্ধে নিজের যুদ্ধ। কিন্তু অপর পক্ষের আচরণ কেন এত কঠিন?
সংযত কণ্ঠেই পিপি বলল, আমি তো আমার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করিনি। আমি শুধু তোমার সহযোগিতা চেয়েছি। শেষ চেষ্টাটুকুতেও কি তোমার এত আপত্তি?
ন্যালিনি অনমনীয়। মাথা নেড়ে বলল, নাহ, তুমি অসম্ভব হয়ে উঠছ। আমাদের শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থই হতে হবে।
পিপি এবার বুঝতে পারল এই মুহূর্তে তার কি করা উচিত। খুব ধীর কণ্ঠে যেন ফোয়ারা ছুড়ল পিপি ন্যালিনির উদ্দেশে, তুমি যা চাইছ, আমার জন্য তা কঠিন কোনো ব্যাপারই নয়। তুমি তোমার পথে যেতে পারো। তবে আজকের এ বিষয়টি মনে রেখো। মনে করে দেখো আমাদের জীবনের কথা। একটু ভেবে দেখো–তোমার পরিচয় কি, আরো আমিইবা কে? আমি তোমার কাছে কাকুতি করে ভিক্ষে চেয়েছি। এই চাওয়া আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই। ক্রস আমার মতো, পক্ষান্তরে ক্লডিয়া পেয়েছে তোমার গুণ। ক্রস আমার সাথেই থাকবে ভালো, আর ক্লডিয়া তোমার সাথে, তোমার পরিমণ্ডলে। এটাই হচ্ছে আমার চাওয়ার উদ্দেশ্য।
