শান্ত কণ্ঠে পিপি বলল, তুমি যা-ই সিদ্ধান্ত নাও না কেন, আই ডোন্ট কেয়ার। জাজের সিদ্ধান্তেও আমার কিছু যায়-আসে না। যদি সোজা পথে আসো, তবে আমার কাছেও অনুরূপ আচরণ পাবে। যদি বাঁকা হতে চাও তবে তোমার কপালে দুর্ভোগ আছে।
এই প্রথমবারের মতো ন্যালিনির মনে হলো পিপির সারা অঙ্গ যেন বিশ্রী রকমের পেশিবহুল বিদঘুটে। অথচ এই শক্ত-সমর্থ শরীরের প্রতি এক সময় ন্যালিনির ছিল প্রচণ্ড আগ্রহ, অপার ভালোবাসা। পিপিকে ভালোবাসার আরেকটি কারণ হলো তাদের বারো বছরের এই দাম্পত্য জীবনে পিপি কখনোই ন্যালিনির সাথে উচ্চ স্বরে কথা বলেনি, ন্যালিনির কোনো ব্যয়ে কৌতুক করেও কখনো কিছু বলেনি এবং এটাও সত্য, পিপি ছিল সন্তানদের জন্য সত্যিকার একজন ভালো বাবা। তাদের প্রতি তখনই পিপি রেগে যেত, যদি ক্রস কিংবা ক্লডিয়ার মধ্যে কেউ মায়ের অবাধ্য হতো।
কিছুটা নমনীয় হয়ে আসছিল ন্যালিনি কিন্তু পিপি যেন ক্রমেই হয়ে উঠছিল কঠোর। চেহারার বিকৃতি ঘটতে শুরু করেছিল। প্রচণ্ড রকমের মানসিক বিপর্যস্ত পিপির চিবুকে যেন অতিরিক্ত কিছু মাংস যোগ করে দিয়েছে কেউ। ন্যালিনির মনে হলো পিপির কপালে যেন কেউ খাজ কেটে তৈরি করে দিয়েছে রেখা। চিকন ঐ-জোড়া কপালের ভাঁজে মিশে ফর্সা করে ফেলেছে অংশটুকু। মাথার চুলগুলো যেন রুক্ষ মেজাজের সাথে ঘোড়ার মতো ঝরঝরে হয়ে উঠছে। সুন্দর নিষ্পাপ চোখ দুটোতে আগুনের লহমা– তাতে বিন্দুমাত্র অবশিষ্ট নেই নমনীয়তার ভাব।
ন্যালিনির কণ্ঠ ভিজে এলো। বলল, আমি জানতাম তুমি আমাকে ভালোবাস। কিন্তু কিভাবে তুমি আমার সাথে এতটা রুক্ষ আচরণ করতে পারছ? ন্যালিনি নিজেকে আর সামলাতে পারল না, কেঁদে ফেলল।
ন্যালিনির অশ্রুতে কিছুটা হলেও ভিজল পিপি, আমি, যা বলছি, শোনো। বলল, লয়ারের সাথে নয়, তুমি যদি কোর্টে যাও, তবে সব কিছু লক্ষ্মন করেই তোমাকে যেতে হবে। আর এখনই তুমি আমাদের সন্তানদের দুজনকে পাচ্ছ না। শোনো ন্যালিনি, আমাকে খেপিও না, আমি তা চাই-ও না।
একটু থেমে পিপি আবার বলল, আমি বেশ বুঝতে পারছি, তুমি আমার সাথে আর কোনো মতেই থাকতে চাইছ না। সব সময় আমি মনে করতাম তোমার মতো একজন নারী পেয়ে আমার জীবন ধন্য হয়েছে। সারা জীবন তোমাকেই আঁকড়ে থাকব। তোমাকে সুখ দিয়ে ভরে দেব তুমিও সুখী করবে আমাকে। আর আজ আমার সেই ভালোবাসার মানুষটিই আমার কাছ থেকে তো সরছেই, আমাকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে আদালতের কাঠগড়ায়।
কয়েক পলক থামল পিপি। কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো, আমি এখন বার্ধক্যে। পরিবার ছাড়া আমি থাকতে চাই না।
তোমার আছে ক্লেরিকুজিও পরিবার, ন্যালিনি বলল।
হ্যাঁ, তা আছে, প্রতিউত্তর পিপির, তোমার এটা মনে করা উচিত। যাই হোক, আমি আমার বার্ধক্য জীবন একাকী কাটাতে চাই না।
হাজার হাজার লোক আছে তোমার, ন্যালিনি বলল, নারীও আছে।
তারা আমার সহযোগী নয়। কোনো একজন আছেন, যিনি তাদের জীবনের সিদ্ধান্ত দেন। আর অনেকে তাদের অস্তিত্বে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। আমি তাদের মতো হতে চাই না।
উপহাসের স্বরে ন্যালিনি বলল, তুমিও তাদের পক্ষে ভেটো দাও!
ঠিক তাই হয়তো করা উচিত, হেসে ফেলল পিপি। ন্যালিনির দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ।
ন্যালিনি বলল, ঠিক আছে যখন তোমার ইচ্ছে, তুমি সন্তানদের দেখে আসতে পারবে। তবে দুজনই থাকবে আমার কাছে।
একথা শুনে পিপি ন্যালিনির দিকে পেছন ফিরে দাঁড়াল এবং বলল, তোমার যা ইচ্ছে হয় করো। বলেই পিপি চলে যেতে উদ্যত হলো।
দাঁড়াও, ন্যালিনির ডাকে ঘুরে দাঁড়াল পিপি। তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল ন্যালিনি কিছুক্ষণ। প্রাণহীন এক ফ্যাকাশে মুখ দেখে ন্যালিনির খুব মায়া হলো। বলল, ঠিক আছে, সন্তানদের কেউ যদি তোমার সাথে যেতে চায়, আমি মেনে নেব।
পিপি উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল। নিমেষেই যেন সমস্ত বিপর্যস্ত ভাব উবে গেল তার চেহারা থেকে। পিপির মনে হলো জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে খুব কঠিন। কোনো সমস্যার সমাধান হলো এই মাত্র।
চমৎকার, চেঁচিয়ে উঠল পিপি। তোমার শিশুটি ইচ্ছে হলেই ভেগাসে এসে আমার সাথে দেখা করবে। আর আমারটাও যাবে স্যাকরামেন্টো তোমার সাথে দেখা করতে। দারুণ হবে। চলো, আজ রাতেই আমরা প্রস্তুতি নিয়ে ফেলি।
ন্যালিনি পিপিকে নতুন জীবন শুরু করার জন্য আরেক দফা শেষ প্রস্তাব দিতে কার্পণ্য করল না। বলল, চল্লিশ বছর এমন কোনো বয়স নয়। তুমি আবার নতুন করে শুরু করতে পারো।
পিপি মাথা নেড়ে বলল, কখনোই না। তুমিই ছিলে আমার জীবনে একমাত্র নারী! তুমি ছিলে আমার কাছে সেই ভারতীয় বধূদের মতো। আমি তোমাকে বিয়ে করেছিলাম একটু দেরিতেই। তবে আমি জানি আমি আর কখনোই বিয়ে করব না। ঠিক যেভাবে তোমাকে আমি ধরে রাখতে পারিনি, সেভাবে নতুন করে কোনো কিছুই শুরু করা হবে না আমার।
হয়তোবা, ন্যালিনির সন্দিগ্ধ উত্তর। আর তুমি আমাকে পুনরায় ভালোও বাসতে পারবে না।
তবে তোমাকে হত্যা করতে পারব। ন্যালিনির দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল পিপি। কথাটি কৌতুক করেই বলল সে।
কিন্তু পিপির চোখের দিকে তাকিয়ে বিশ্বাস করল ন্যালিনি। সে বুঝতে পারল এটা পিপির একটা ক্ষমতার সূত্র। যদি সে কাউকে হুমকি দেয়, তাতে বাস্তবতার মিশেল তো থাকেই।
