মনে মনে একরোখা হয়ে উঠলেও পরক্ষণেই সে পরিহার করল সেই মনোভাব। তার মনে হলো নারীমাত্রই তাদের পরিণাম সম্বন্ধে উদাসীন। পিপির মস্তিষ্কে উদয় হতে লাগল বিভিন্ন ধরনের ভাবনা। সে উপলব্ধি করল এগার বছরের ক্রস এবং দশ বছরের ক্লডিয়াকে তাদের মায়ের মতো করে গড়ে তুলতে পারবে না। তাছাড়া এ-ও বুঝতে পারল, তার সাথে ক্রসের ঘনিষ্ঠতা আছে সত্য, কিন্তু দুই সন্তানই ন্যালিকে খুব ভালোবাসে।
এমন ভাবনা থেকেই মনে মনে সে ন্যালিনির প্রতি উদারতা দেখাতে সম্মত হলো। প্রকৃত অর্থে তার কাছ থেকে পিপি পেয়েছে একটি গোছানো সংসার, সন্তান, পায়ের নিচে শক্ত এক খণ্ড মাটি যা সব পুরুষেরই জীবনের চরম চাওয়া-পাওয়া। ন্যালিনি যদি তার জীবনে না আসত তবে কে জানে পিপির জীবনের স্রোত কোন দিকে প্রবাহিত হতো?
আগের মতো শান্ত কণ্ঠে বলল, আচ্ছা, ঠিক আছে, এ প্রসঙ্গটি বাদ দাও। এই বিচ্ছেদের মুহূর্তে পরস্পরের মধ্যে যেন তিক্ততার সৃষ্টি না হয়। তারপর আরো স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করল পিপি। বলল, জাহান্নামে যাক আমাদের এই বারোটি বছর। এ সময়টি ছিল আমাদের সুখের, আনন্দের। এই ছোট্ট পরিসরে আমরা পেয়েছি দুটি ফুটফুটে সন্তান– এ সবের জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। কিছুক্ষণের জন্য থামল পিপি। তারপর আবারো ন্যালিনির কঠোর চেহারার দিকে তাকাল।
বলল, কাম অন ন্যালিনি, আমিও তো তাদের বাবা হিসেবে খারাপ ছিলাম না। তারাও আমাকে ভালোবাসে। আর তুমি যা চাও, সেভাবেই আমি তোমাকে সাহায্য করতে চাই। তুমি বরং ভেগাসেই থেকে যাও। আর আমি তোমাকে জানাদু হোটেলেই একটি দোকান দেয়ার ব্যবস্থা করছি, কাপড়, জুয়েলারি কিংবা অ্যানটিক, যে কোন প্রকারের। এ থেকে প্রতি বছর তুমি দুহাজার গ্রান্ড আয় করতে পারবে। এর ফলে আমরা খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও আমাদের সন্তানদের সাথে শেয়ার করতে পারব।
আই হেইট ভেগাস। সব সময় আমি ভেগাসকে ঘৃণা করে এসেছি।
এতক্ষণে মুখ খুলল ন্যালিনি। আমার শিক্ষকতার ডিগ্রি আছে এবং স্যাকরামেন্টোতে আমি একটা কাজও জুটিয়ে নিয়েছি। ইতিমধ্যে বাচ্চারা সে স্কুলে যাওয়া-আসাও শুরু করেছে।
এবার পিপির অবাক হওয়ার পালা। এতক্ষণে সে বুঝতে পারল এই নারী ছিল ভেতরে ভেতরে সর্বদাই তার বিরোধী এবং মারাত্মক। নারী সম্পর্কে পিপির এত দিনের ধারণাকে ভুল বলে প্রমাণিত করল ন্যালিনি। তার কাছে নারী কখনোই ভয়াবহ বলে কিছু ছিল না। সে যে নারীই হোক না কেন। স্ত্রীকে তো সে ভয়াবহ মনে করেইনি, মিসট্রেস থেকে শুরু করে মা, চাচি, খালা কিংবা কোনো বন্ধুর স্ত্রী, এমনকি ডনের কন্যা রোজ ম্যারিকেও তার কখনো সাংঘাতিক কিছু মনে হয়নি। পিপি তার এই দীর্ঘ জীবনে এমনই এক পৃথিবীতে বাস করে এসেছে, যেখানে নারীরা কখনোই শত্রু হিসেবে আবির্ভূত হয়নি।
ন্যালিনির আচরণে ধাক্কা খেলেও, চট করে বদলে গেল পিপি। কেউ যখন তাকে নিয়ে খেলতে আরম্ভ করে, কিংবা তার বন্ধুত্বকে অস্বীকার করে– এমনকি তার উচ্চাসকে দমাতে চেষ্টা করে তখন সে আর আত্মসংবরণ করতে পারে না। মাথায় আগুন ধরে যায়। ন্যালিনির আচরণেও তার এমন হলো।
স্পষ্ট জানিয়ে দিল পিপি, আমি স্যাকরামেন্টো গিয়ে আমার সন্তানদের সাথে দেখা করতে পারব না। পিপি ভীষণভাবে চটে গেল। তবে নিজেকে সংযত রেখে গম্ভীরভাবে কথাগুলো বলল সে। ন্যালিনি যে গোপনে এতদূর এগিয়েছে, পরিকল্পনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে– একথা ভেবে পিপি সবচেয়ে বেশি আশ্চর্য হয়েছে।
পিপি বলল, একটু আগেই বলেছ যে তুমি আমার সম্পর্কে জেনে গেছ। তাই বলছি, সতর্ক হও। স্যাকরামেন্টো যাও, আর সমুদ্রের তলদেশে যেখানে ইচ্ছে সেখানে যাও, আমার আপত্তি নেই। তবে তুমি কেবল একজনকে নিয়ে যেতে পারবে। অপরজন থাকবে আমার কাছে।
খুব শীতল দৃষ্টিতে ন্যালিনি তাকাল পিপির দিকে। বলল, আদালতই এর রায় দেবে। আমার মনে হয় তোমার একজন লয়ার নিয়োগ করা উচিত, যে আমার লয়ারের সাথে আলোচনা করবে।
বিস্ময়ে বিস্ময়ে হতবাক পিপি। যতই সময় যাচ্ছে সে যেন নতুন থেকে নতুন ভুবনে প্রবেশ করছে, আর আশ্চর্য হচ্ছে। ন্যালিনির এমন উপদেশে পিপি যখন বিস্ময়ে হা হয়ে গেছে তখন ন্যালিনি হেসেছে তার ক্রুর হাসি।
তুমি উকিলও নিয়োগ করেছ!পিপির বিস্ময়। তুমি? আইনের ভয়ও দেখালে?
এবার আর বিস্ময় নয়, নিজেকে আরেক দফা পরিবর্তন করল পিপি। অকস্মাৎ উচ্চস্বরে হেসে উঠল। দীর্ঘ সময় ধরে পিপির এ হাসি যেন উন্মাদের মতো, ভয়াবহ বিপদের আশঙ্কাযুক্ত। ন্যালিনি চমকে গেল কিছুটা। প্রচণ্ড ঘৃণাবোধ হলো তার পিপির প্রতি। মনে হলো সে এক বিকারগ্রস্ত মানুষ।
বারো বছর ধরে সে এই মানুষটির সাথে কাটিয়েছে। প্রেমিক সেজে তার শরীরের একটু উষ্ণতা পেতে এই লোকটিই তার কাছে কত অনুনয়-বিনয়ই না করেছে, অবশেষে তার কাছে সঁপে দিয়েছে সে নিজের দেহ, মন, প্রাণ। হায় কপাল! একটুও বুঝতে পারেনি সে। চুড়ান্ত মুহূর্তে এসে আজ ন্যালিনি বুঝতে পারল সব– কেন সবাই পিপিকে শ্রদ্ধা করে এত, কেন তাকে ভয় পায় সবাই।
পিপির সার্বিক আচরণে ন্যালিনি যতটা না পেয়েছে ভয়, তার চেয়ে অনেক বেশি পেল কষ্ট। আর খুব সহজেই পিপির প্রতি তার ভালোবাসাও নিঃশেষ হয়ে গেল। বারোটা বছরের সমস্ত স্মৃতি, সমস্ত ভালোলাগা ভালোবাসা যেন নিমেষেই মিলিয়ে গেল ন্যালিনির মন থেকে।
