ফিউবার্টাকে হত্যার পর পালিয়ে যাওয়ার সময় টহল পুলিশের উপস্থিতিতে পিপি আর কোনো চেষ্টাই করল না। এমনকি নিজের পালিয়ে যাওয়ার রাস্তা পরিষ্কার করতে সে কোনো কর্মকর্তাকে হত্যাও করল না। এ বিষয়ে ডন ক্লেরিকুজিও’র স্পষ্ট ও কঠোর নির্দেশ পিপি সেই বিশৃঙ্খল মুহূর্তেও পালন করেছিল, সম্মানের সাথে। ডনের নির্দেশ ছিল, কখনো, কোনো অবস্থাতেই যেন আইনের কোনো কর্মকর্তাকে হত্যা করা না হয়। পিপি অক্ষরে অক্ষরে পালন করল তা। পুলিশ দেখে থমকে দাঁড়াল সে, তারপর তার হাতের অস্ত্রটি রাখল পায়ের কাছে লাথি মেরে অস্ত্রটি পৌঁছে দিল পুলিশ কর্মকর্তাদের দিকে। অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করল পিপি। কিন্তু স্পষ্ট অস্বীকার করল পথের ওপর পড়ে থাকা মৃত মানুষটির সাথে তার কোনো সম্পর্কের কথা।
এমনভাবে ঘটনাগুলো ঘটে গেল, যেন সবকিছুই ছিল পূর্ব পরিকল্পিত। কোনো দৈব ঘটনা নয়, আকস্মিক ঘটনা নয়। পিপির জীবনটাই এমন। সে যতই পরিকল্পনা করুক, সম্ভাব্য বিপদ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে যত্নশীল হোক– সমস্যা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরবেই। দুর্ভাগ্য যেন তার নিত্য সঙ্গী। পুলিশ কাস্টোডিতে বসে পিপির এ মুহূর্তে মনে হচ্ছে যেন, সে অস্বচ্ছ ভাগ্যের ঘূর্ণি আবর্তে ক্রমেই তলিয়ে যাচ্ছে। তবে এ চিন্তায় ভেঙে পড়েনি সে। বরং সে জানে, এমন অবস্থায় তাকে থাকতে হবে যথাসম্ভব শান্ত-মস্তিষ্ক। আরেক ভরসা ক্লেরিকুজিও ফ্যামিলি– তারা তাকে ঘূর্ণি আবর্ত থেকে তুলে এনে তীরে নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করবে।
তীরে তরী ভেড়াতে সম্ভাব্য পদক্ষেপগুলো নিমেষেই ভাসতে লাগল পিপির মনে– প্রথমেই পিপির জামিন লাভের জন্য নিয়োগ করা হতে পারে উঁচু দরের উকিল তারপর হবে আইনি মারপ্যাঁচ। বিজ্ঞ বিচারক ও আইনজীবীরা অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে, সাহসিকতার সাথে পিপিকে সুরক্ষার জন্য উপস্থাপন করবে একে একে যুক্তি তর্ক। এসব যুক্তি তর্কে পিপির বিরুদ্ধে হয়তো দাঁড়াবে প্রত্যক্ষদর্শীরা। আইনজীবীরা তাদের দেখা ঘটনাকে ভিত্তিহীন বলে প্রমাণ করার চেষ্টা চালাবে। তাদের স্মৃতিশক্তি নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। এমনকি যে আমেরিকান আইনজীবী তাদের পেশায় বিশ্বস্ত, অনুগত বলে পরিচিত, তারাও হয়তো পিপিকে সরাসরি অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করবে না– কিঞ্চিৎ উৎসাহী হবে কর্তৃপক্ষকে পরাজিত করতে।
ক্লেরিকুজিও ফ্যামিলির পক্ষে দীর্ঘজীবনে পিপি ডি লিনার এটাই প্রথম আদালতে উপস্থিতি এবং সবচেয়ে বিব্রতকর অবস্থা তার জন্য এই যে, আদালতে মামলা চলাকালীন পিপির সাথে তার স্ত্রী ও সন্তানদেরও উপস্থিত থাকতে হবে। এই নিরপরাধ পরিবারের জন্য একটি আনন্দদায়ক রায়ের ব্যবস্থা আইনজীবীরা অবশ্যই করবে।
পিপি ডি লিনার বিরুদ্ধে যে মামলার রায় যাবে না এ বিষয়ে নিঃসন্দেহ সে। তারপরও এক অজানা আশঙ্কা।
রায়ের দিন সেই পুলিশ কর্মকর্তারা পিপি ডি লিনাকে ঘটনাস্থলেই দেখেনি বলে সাক্ষী দিল। পিপির বিরুদ্ধে সাক্ষী দেয়ার জন্য উপস্থিত হয়েছিল পাঁচজন প্রত্যক্ষদর্শী। তাদের তিনজন আইনজীবীদের চাপে পিছিয়ে গেলেও অপর দুজন পিপির বিরুদ্ধে কঠিন অবস্থান নিয়েছিল। তবে তারাও একসময় নিজেদের একরোখা মনোভাব থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। তারা বুঝতে পারে, এ মামলার আইনজীবীরা, এমনকি পুলিশ, বিচারক সবাই একই সূত্রে গাঁথা।
যে হোটেলে ফিউবার্টা আশ্রয় নিয়েছিল, তার মালিকও ক্লেরিকুজিও’র সামন্ত। পিপির পক্ষে সাক্ষী দিতে গিয়ে সে বলল ফিউবার্টা হোটেলের বিল পরিশোধ না করে পালিয়ে যেতে উদ্যত হলে সে তার পিছু নেয়, এ সময় কোত্থেকে যেন বুলেট এসে লাগে তার গায়ে। তবে তার হত্যাকারী যে পিপি নয়, এটা নিশ্চিত। ফিউবার্টা নামে লোকটির হত্যাকারী অন্য কেউ।
আকস্মিক একটা হোঁচট খেল পিপি। তার শরীর শিথিল হয়ে এলো। চারদিকে যেন নেমে এলো ঘোর। পলকেই পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য উধাও হয়ে গেল। শুধু পিপিই নয়, ন্যালিনি নিজেও এমন এক অসারতা অনুভব করতে লাগল। ন্যালিনি মোটেও কিছু রেখে-ঢেকে বলেনি। পিপিকে একজন খুনি হিসেবে আখ্যা দিয়ে সাফ বলে দিয়েছিল তাকে বিছানার পাশে নিয়ে কখনোই আর শুতে পারবে না। তার কোনো আনন্দে অংশীদার হতে পারবে না।
তবে পিপি মানসিকভাবে কিছুটা শান্তি পেয়েছিল এই ভেবে, ন্যালিনির কাছে তার জীবনের এই কালো অধ্যায় আর বেশি দিন লুকাতে হবে না। এই লুকোচুরির খেলায় পিপি খুব অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছিল।
ন্যালিনির ডিভোর্স কথাটি তখনও পিপির মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। যতটা সম্ভব নিজেকে শান্ত করার চেষ্টায় বিভোর সে। এভাবেই বেশ কিছুটা সময় কেটে গেল। এক পর্যায়ে স্বাভাবিক হলো পিপি। শান্ত কণ্ঠে বলল, ঠিক আছে, তাহলে আমরা ডিভোর্সের পথেই এগুবো। এক পলক থামল সে, তারপর বলল, আমি আমার সন্তানদের হারাতে চাই না।
আমি তোমার সম্পর্কে স্পষ্টই সব জেনে ফেলেছি। প্রতিউত্তরে বলল ন্যালিনি। তোমার মুখোমুখি আর হতে চাই না আমি এবং আমার সন্তানদেরও তোমার মতো মানুষের সাথে থাকতে দেব না।
এবার পিপি সত্যিই বিস্মিত হলো। এই কি সেই ন্যালিনি যে প্রয়োজন ছাড়া কখনোই কিছু বলেনি। যে কখনো মুখরাও ছিল না কিংবা পিপির ঘাড়ে কখনোই চাপিয়ে দেয়নি কিছু জোর করে। সেই শান্ত, সহিষ্ণু রমণী আজ পিপি ডি লিনার মতো একজন দাপটে ব্যক্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলছে, তাও আবার দাবির সুরে সত্যিই হতবাক পিপি।
