একজন মানুষের পক্ষে তার সহজাত প্রবৃত্তি অত্যন্ত আপনজনের কাছে, অন্তত যার সাথে সে তার জীবনের সবচেয়ে সান্নিধ্য সময় অতিবাহিত করেছে, সেই প্রিয়তমা স্ত্রীর কাছে লুকিয়ে রাখা অসম্ভব। ন্যালিনির চোখে ধরা পড়ল পিপি যেন নিজেকে লুকাতে ব্যস্ত সে তার উচ্ছলতাটুকুও ঢেকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পিপি প্রকৃতির উচ্ছ্বাস লঙ্ঘন করেছে কখনো, কিন্তু ন্যালিনিকে এড়িয়ে যেতে পারেনি। তবে তার এই লুকানো প্রবণতাকে ঢাকতে নিজের স্বভাবজাত উচ্ছ্বাস, উচ্ছলতা প্রকাশের চেষ্টা করত সেটা ছিল। নিছক মেকি– ছদ্মবেশ। স্ত্রীর প্রতি তার আচরণ ছিল আগের মতোই অমায়িক, তবে ন্যালিনি পেত বিপদের আভাস–স্বাভাবিক মনে হতো না তাকে।
পিপির ছোটখাটো কিছু নির্বুদ্ধিতা তাকে মানুষের কাছে আরো গ্রহণযোগ্য করে তুলত আনন্দ পেত অনেকে এই নির্বুদ্ধিতায়। কিছু কিছু বিষয়ে সে বোকার মতো আনন্দ করত কিংবা কষ্ট পেত। আর তার এই অনুভূতি সহানুভূতি হতো অনেক মানুষ কিংবা অনেকের অনুভূতি-উপলব্ধিকে সে তাদের মতো করেই নিত। একবার এক দম্পতিকে ইতালীয় এক রেস্তোরাঁয় ডিনারের নিমন্ত্রণ করে সে। দম্পতিটি ইতালীয় খাবারত দামের কারণে বেছে বেছে খেতে শুরু করে। পিপি এ অবস্থা দেখে নিজের খাবার আর শেষ করতে পারেনি।
ন্যালিনিকে পিপি ভেগাসে তার কালেকশন এজেন্সি সম্পর্কে, তার কাজ সম্পর্কে সম্যক ধারণা দিয়েছে। ভেগাসের বড় বড় হোটেলগুলো তার ক্লায়েন্ট। এই হোটেলগুলোয় যে গ্যাম্বলিং চলে তার নির্দিষ্ট একটা আয় পিপির এই এজেন্সিকে দিতে হয়। জুয়াড়িদের কাছ থেকে আয়ের অংশ নেয়া দুরূহ বিধায় পিপি নতুন কৌশলে গ্যাম্বলিং মেকার অর্থাৎ যারা গ্যাম্বলিংয়ের পয়েন্ট লিপিবদ্ধ করে, তাদের কাছ থেকে আদায় করে নেয়।
একটি বিষয়ে পিপি ন্যালিনিকে প্রায় বলত, জোর করে কখনো ভালো কিছু আদায় সম্ভব নয়- অব্যাহত চলতে থাকা বিশেষ কিছু বিষয় বা ক্ষেত্র ছাড়া। যারা ঋণ শোধ করবে, এটা তাদেরও একটি মান-সম্মানের বিষয়। আসলে, প্রত্যেকেই যার যার কাজে দায়িত্বশীল এবং এই দায়িত্বশীলতাই তাকে রক্ষা করে যদি সে প্রতিনিয়ত বাধ্যবাধকতার মুখোমুখি না হয়।
বিশেষ করে চিকিৎসক, আইনজীবী কিংবা করপোরেশনের প্রধান কর্মকর্তারা এক্ষেত্রে তাদের সম্মান বজায় রাখতে প্রশংসনীয় আচরণ করে থাকে– মোটামুটি দর কষাকষিকে পারতপক্ষে এড়িয়ে চলে। তাদের কছ থেকে অর্থ আদায় করে নেয়াটা কঠিন নয়। আচরণ যদি তাদের নেতিবাচক হয়, তবে তাদের কর্মক্ষেত্রে গিয়ে একটু উচ্চবাচ্য করলেই হলো– তাদের ক্লায়েন্টরা শুনবে, জানবে তাদের ভদ্রতার পোশাকের নিচে ভিন্ন জগতের কথা। এজন্য সাধারণত তারা সতর্কতার সাথেই লেনদেন করে থাকে।
তবে যারা ছোটখাটো ব্যবসা করে, তারা এক ডলারে জুয়ার দানে লাগায় এক পেনি। আবার এদের মধ্যে অনেকে একটু বেশিই চালাক—- তারা এমনভাবে চেকে অর্থের পরিমাণ লেখে, যা বাউন্স হবার সম্ভাবনাই বেশি। এটা একটা চমৎকার কৌশল। যেমন জুয়ার দানে এই শ্রেণীর লোক একটি দশ হাজার ডলারের চেক প্রদান করল কিন্তু দেখা গেল তার ব্যাংকের একাউন্টে রয়েছে আট হাজার। এই ক্ষেত্রে তার ব্যাংক একাউন্টটি পিপি পূর্বেই দেখে নেয় এবং চেকটি যাতে বাউন্স না হয় সে জন্য দশ হাজার পূরণ করতে অতিরিক্ত দুহাজার ডলার জমা করে ফেলা হয় তার নামে। দান ধরা লোকটি হেরে গেলে তার একাউন্ট অনায়াসেই শূন্য করা যায়। এমন সব কাহিনী ন্যালিনিকে শুনিয়ে হেসে উঠত পিপি।
এক রাতে পিপি ন্যালিনিকে তার জীবনের একটি মজার কাহিনী বলেছিল– কাহিনীটি ছিল পিপির কাছে হাস্যকর। জানাদু হোটেলের কাছে ছোট একটি শপিং মলের মতো কালেকশন এজেন্সিতে বসে কাজ করছিল পিপি। অফিসে বসেই শুনতে পেল গুলির শব্দ। সাথে সাথে বেরিয়ে এলো সে। দেখল পাশের একটি জুয়েলারি দোকান থেকে মুখোশধারী দুজন ডাকাত পালিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় কোনো কিছু চিন্তা না করেই পিপি তার বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ল। তবে ডাকাত দুটি তাদের জন্য অপেক্ষমাণ গাড়িতে লাফিয়ে উঠে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলো। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ এসে পৌঁছল ঘটনাস্থলে এবং আশপাশের মানুষের কাছে জিজ্ঞেসাবাদের পর তারা পিপিকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে গেল– যদিও নিশ্চিতভাবেই তারা জানত পিপির অস্ত্রটি লাইসেন্সকৃত। কিন্তু গায়ে পড়ে এমন আচরণ একটি অপরাধ বলেই বিবেচিত। অবশ্য আলফ্রেড গ্রোনিভেল্ট থানায় গিয়ে তাকে ছাড়িয়ে আনেন।
গল্পটি বলতে বলতেই পিপি নিজের কাছেই প্রশ্ন করল, আমি জঘন্য কাজটি কেন করেছিলাম? আলফ্রেড আমাকে বলেছিল, আমার মধ্যে নাকি শিকারে তীব্র আকাঙ্ক্ষা কাজ করেছিল তখন। কিন্তু আমি তা বুঝতে পারিনি। এই আমিই কি ডাকাতদের গুলি করেছিলাম? সমাজ রক্ষায় আমি কি এ কাজ করেছিলাম? যে উদ্দেশ্যেই হোক আমার অপরাধের সাজা তারা আমাকে গ্রেফতার করে দিয়েছিল। এই আমাকেই তারা থানায় আটকে রেখেছিল।
কিন্তু এই ছোট ঘটনাটিই, পিপির চরিত্রের একটি সামান্যতম অংশের এই খুনে মনোভাব ন্যালিনির মনে দাগ কেটেছিল। পিপির চরিত্রের গোপনীয় এই সত্যটি ন্যালিনিকে ওলট-পালট করে দিয়েছিল। পরবর্তীতে যা অবশেষে ন্যালিনিকে ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে …
