সন্তান মানুষ করতে শুধু ন্যালিনিই নয় পিপিও যোগ দিল একই সাথে। কঠোর পরিশ্রম আর ভালোবাসায় সন্তানদের জীবনও হয়ে উঠল মধুর। সন্তানদের লেখাপড়া, গান-নাচে দক্ষ করে তুলতে ন্যালিনিও তাদের পেছনে অতিবাহিত করতে লাগল ঘন্টার পর ঘণ্টা। পিপির উন্নত মনোভাবে তাদের দাম্পত্য জীবনও হয়ে উঠল মধুর। পিপির যত গুণ হচ্ছে, তার জীবনীশক্তি ও পশুর মতো উচ্ছলতা। কোনো স্বামী-স্ত্রীর বিবদমান সম্পর্ককে সহজ করতে এমন গুণ অবশ্যই ফলপ্রসূ।
পিপি-ন্যালিনির যেমন তাদের সন্তানের প্রতি ছিল প্রচণ্ড ভালোবাসা, সন্তানদেরও ছিল ঠিক তেমনই তাদের বাবা-মার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। তারা ভালোবাসত তাদের মাকে আর শ্রদ্ধাপূর্ণ অনুসরণ করত বাবাকে। ন্যালিনিকে ভালোবাসার কারণ মা হিসেবে সে সন্তানদের কাছে ছিল খুব মিষ্টি স্বভাবের, নম্র, সুন্দরী তো বটেই, সেই সাথে একেবারেই নির্ভরযোগ্য। অপরদিকে বাবা ছিল বেশ দৃঢ় ও শক্তিশালী।
বাবা ও মা খুব ভালো শিক্ষকে পরিণত হয়েছিল। মায়ের কাছে তারা শিখত সামাজিক রীতি-নীতি, ভালো আচার-ব্যবহার, নৃত্য, পোশাক পরিচ্ছদের নিয়ম-কানুনসহ জীবন চলার পথের বিভিন্ন আদব-কায়দা। বাবা তাদের শেখাত কিভাবে ছেলেমেয়েরা তাদের শারীরিক বিপদ-আপদ থেকে নিজেদের রক্ষা করবে, এথলেট হিসেবে শারীরিক গঠনের কলা-কৌশল, আর এসবের সাথে গ্যাম্বলও। বাবার কাছে এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে ছেলেমেয়েদের বেশ কষ্ট হতো, কিন্তু কখনোই বাবার প্রতি তারা বিরক্ত বোধ করত না। এর কারণ পিপিও তার সন্তানদের ওপর জোর করে চাপিয়ে দিত না কিছু যা কিছু সে করত অত্যন্ত নিয়ম-শৃঙ্খলার মাঝে। রাগ হতো না সে কখনো, শেখাত স্নেহের সাথে। বন্ধুর মতো।
ক্রস ছিল একেবারে ভয়-ভীতিহীন দুর্দান্ত চঞ্চল এবং স্বভাবগত নমনীয়। এদিক থেকে ক্লডিয়া তার ভাইয়ের মতো শারীরিক আচরণে খুব একটা উৎসাহিত না হলেও নিশ্চিতভাবেই ছিল একটু একগুঁয়ে।
কিছুদিনের মধ্যেই একটি বিষয়ে ন্যালিনির খটকা লাগল। প্রথম প্রথম বিষয়টিকে তেমন একটা গুরুত্ব দেয়নি সে। কিন্তু পরে সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি। তাসের বিভিন্ন রকমের খেলা যেমন পোকার, ব্ল্যাক জ্যাক, জিন এসব যখন বাচ্চাদের শেখাত পিপি, ন্যালিনি তেমন গা করেনি। কিন্তু খেলাগুলো শেখাতে গিয়ে পিপি তাদের যখন কার্ডের ফাঁক-ফোকর চুরিবিদ্যা, প্রতারণামূলক দিকগুলো তুলে ধরত, তাদের বরাদ্দকৃত অর্থ যখন সে কৌশলে, নিয়ে নিত তখন ক্ষেপে যেত ন্যালিনি। ক্রসের চেয়ে এ বিদ্যায় ক্লডিয়া এগিয়ে গিয়েছিল অনেক বেশি পারদর্শীও হয়ে উঠেছিল বেশ। পিপি অবশ্য পরে ছেলে-মেয়ের সাথে যে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিল তা সবিস্তারে বর্ণনা করত। ন্যালিনি তখন রাগ হয়ে পিপিকে বলত–আমি মনে করি, তুমি ছেলে-মেয়ের জীবন নিয়ে খেলছ, যেভাবে তুমি খেলছ আমার সাথে। পিপি তখন প্রতিউত্তরে বলত, এটাও তাদের শিক্ষার একটা অংশ। ন্যালিনি বলত, এটা কোনো ভালো শিক্ষা নয়, দুর্নীতির প্রশিক্ষণ। তখন পিপি বলত– আমি চাই সন্তানরা যাতে জীবনের বাস্তব দিকগুলো শেখে এবং এখন থেকেই তার প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু ন্যালিনি তা চাইত না। ন্যালিনির ইচ্ছে— সন্তানরা যাতে জীবনের সুন্দর দিকগুলোর প্রতি উৎসাহিত হয়ে ওঠে।
পিপির টাকা রাখার একটি ওয়ালেট ছিল। তা সবসময় পরিপূর্ণ থাকত পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থে। ন্যালিনি মনে করত, একজন ট্যাক্স কালেক্টর হিসেবে এটা অসম্ভব কিছু নয়, তবে সন্দেহও যে হতো না, তা নয়। এটা সত্য যে পিপি একটি বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মালিক একটি কালেকশন এজেন্সি। কিন্তু এ থেকে পিপির যা আয়, তার চেয়ে তারা অনেক বেশি সচ্ছল, ধনী— বিষয়টি প্রায়ই ন্যালিনিকে ভাবিয়ে তুলত।
অবকাশ যাপনে কিংবা অন্যান্য ভ্যাকেশনে তারা কখনো যেত পূর্বে, কখনো ক্লেরিকুজিও’র বিস্তৃত পরিবারের আশপাশের কোনো অঞ্চলে। সেসব জায়গায় তীক্ষ্ণ ধীসম্পন্ন ন্যালিনি দেখত সবাই তাদের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল এই শ্রদ্ধা একেবারেই ভিন্ন। কখনো কখনো পিপি সেই পরিমণ্ডলের লোকজনের সাথে দীর্ঘ সময় ধরে গোপনীয় আলোচনায় ডুবে যেত– সেখানে ন্যালিনির প্রবেশাধিকার থাকত না। এসব দেখে বিস্মিত হতো ন্যালিনি। তার মনে বিভিন্ন প্রশ্নের অবতারণা হতো।
আরেকটি ছোট বিষয় নিয়েও ন্যালিনির মনে প্রশ্ন জাগত। সেটা হচ্ছে পিপির প্রায়ই অর্থাৎ প্রতি মাসেই অন্তত একবারের জন্য হলেও ব্যবসায়িক কারণে বাইরে সফর। কিন্তু ন্যালিনি এসব সম্পর্কে কখনোই বিস্তারিত কিছু জানতে পারেনি। পিপিও এ বিষয়ে কখনো কিছু বলত না। সে বৈধভাবেই লাইসেন্সকৃত আগ্নেয়াস্ত্র ও বহন করত– একজন কালেক্টর হিসেবে বড় পরিমাণ অর্থ লেনদেন বিষয়ে অস্ত্র সাথে রাখাটা অযৌক্তিক নয়– অন্তত ন্যালিনি এ ব্যাপারে এমন একটি যুক্তি মনে মনে দাঁড় করিয়েছে। পিপি যথেষ্ট সতর্ক মানুষ। তার আগ্নেয়াস্ত্রের কোনো অংশই পিপি ন্যালিনি কিংবা সন্তানদের হাতের নাগালে রাখত না, বুলেটগুলো তালাবন্দি করে রাখত পৃথক এক স্থানে।
এভাবেই বছর চলে যাচ্ছিল আর পিপিরও ব্যবসায়িক সফর বাড়ছিল ক্রমেই। ন্যালিনি বেশিরভাগ সন্তানদের নিয়েই একাকী থাকতে লাগল সময়। যতই দিন যাচ্ছিল, পিপি-ন্যালিনির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কে অবনতি ঘটছিল ক্রমেই। স্বামী-স্ত্রীর যৌন সম্পর্কে দেখা দিয়েছিল টানাপোড়েন। পিপি যেন তার স্বভাবসুলভ কামনা সম্ভোগ থেকে দূরে সরে পড়ছিল– হয়ে উঠছিল সংযত এবং সহানুভূতিশীল। দুজনার দূরত্ব বেড়ে গেল আরো বেশি।
