ক্রসকে তার পাঞ্চিং অভ্যাস থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিত পিপি প্রথম। এতেও যদি ক্রস না থামত, তখন পিপি, তার ঘাড় ধরে শূন্যে ঝুলিয়ে রাখত– এমনটা প্রায়ই করত পিপি। অথবা ক্লডিয়াকে নির্দেশ দিত— যেভাবে ক্রস তাকে আঘাত করেছে, ঠিক সেভাবে ক্লডিয়া যেন আঘাত করে। ক্রসের জ্বালাতনে অতিষ্ঠ হয়ে পিপি তাকে ওয়ালে পাঞ্চ করার নির্দেশ দিত– এতে সে এক-দুবারের বেশি করতে পারত না। এক সময় সে ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ত। কিংবা ন্যালিনি তাদের ওপর অতিষ্ঠ হয়ে কখনো রেগে উঠত। কিন্তু পিপি তখন একটি সিগারেট ধরিয়ে শান্ত কণ্ঠে ক্রসের উদ্দেশে বলত, সব সময় তুমি তোমার বোনকে মারছ। এবার থেকে তুমি তাকে যত মারবে ক্লডিয়া আমার কাছ থেকে ততবার একটি করে ডলার পাবে। এরপর ক্রস ক্ষেপে গিয়ে আবারো ক্লডিয়াকে আঘাত করতে শুরু করত, আর পিপি ক্লডিয়াকে সাথে সাথেই দিত একটি করে ডলার। অবশেষে হিংসায় হোক, কিংবা ক্লান্ত হয়ে ক্রস থামতে বাধ্য হতো।
উপহারে উপহারে ভরে দিয়েছিল পিপি তার স্ত্রীকে, কিন্তু সেসব উপহার যেন ন্যালিনিকে পরিণত করেছিল পিপির ক্রীতদাসীতে– পিপির হয়ে জীবন চলার পথে সেগুলো ছিল ছদ্মবেশ ধারণের উপকরণ। হিরের আংটি, পশুর লেসের মূল্যবান মোলায়েম কোট, ইউরোপ সফরসহ বিভিন্ন মূল্যবান উপহার ছিল ন্যালিনির জন্য অযাচিত। ভেগাস ন্যালিনির পছন্দ নয় বলে পিপি তার জন্য স্যাকরামেন্টোতে কিনে দিয়েছিল অবকাশ যাপনের একটি বাড়ি। আর সেই সাথে দিয়েছিল একটি গাড়িও। স্যাকরামেন্টোর বাড়িটিতে পিপি নিজেই শোফারের ইউনিফর্ম পরে স্ত্রী ন্যালিনিকে নিয়ে গিয়েছিল। বিয়ের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে পিপি তাকে দিয়েছিল বর্গিয়া কালেকশনের মূল্যবান একটি অ্যান্টিক রিং। এত কিছু দেয়ার পরও পিপি একটি বিষয়ে ছিল বেশ কৃপণ। পিপি ন্যালিনিকে কখনোই ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করতে দেয়নি।
এই একটি বিষয় ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে পিপির ছিল যথেষ্ট উদারতা– পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা ছিল ন্যালিনির। ইতালীয় স্বামীদের মতো পিপি স্ত্রীর প্রতি সন্দেহপ্রবণ ছিল না কখনোই। যদিও ব্যবসায়িক কাজে নিতান্ত প্রয়োজনে তাকে বিদেশে যেতে হতো, তবে তার মন পড়ে থাকত স্ত্রীর প্রতি প্রচণ্ড ভালোবাসায়। পিপি ছাড়া ন্যালিনি অবশ্য ইউরোপের বেশ কিছু দেশ ঘুরেছে– পিপি বাধা দেয়নি। সেসব সফরে ন্যালিনির সফরসঙ্গী হয়েছিল তার বান্ধবীরা। ন্যালিনির দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল লন্ডনের মিউজিয়াম ঘুরে দেখার, প্যারিসের ব্যালে আরো ইতালির অপেরা উপভোগ করার। তার এসব স্বপ্ন, ইচ্ছা পিপি পূরণ করেছে দ্বিধাহীন।
পিপির মধ্যে স্ত্রীর প্রতি সন্দেহের বিন্দু-কণাও না পেয়ে অভিভূতই হয়েছিল ন্যালিনি। তবে কয়েক বছরের মধ্যেই ন্যালিনি এও বুঝতে পেরেছিল যে ভেগাসের এই পরিমণ্ডলে পিপিকে ছাপিয়ে কোনো লোকই তার প্রতি সহান ভূতি কিংবা ভালোবাসা জানাতে আসবে না। এমন কোনো মানুষ নেই সেই তল্লাটে যে এমনকি পিপির স্ত্রীর বন্ধুও হতে পারে।
পিপি-ন্যালিনির বিয়ে এবং তাদের দীর্ঘ দাম্পত্য জীবন নিয়ে উন ক্লেরিকুজিও ছিলেন সন্দিহান। তিনি একবার মন্তব্য করেছিলেন, তারা কি মনে করে যে তাদের সারাটা জীবন নেচে নেচেই কাটিয়ে দিতে পারবে?
এ প্রশ্নের প্রমাণিত উত্তর হবে না। ন্যালিনি এমন কিছু সেরা নাচিয়ে ছিল যে একেবারে তারকা বনে যাবে। তার পাগুলো ছিল ড্যান্সের জন্য অনুপযুক্ত। তাছাড়া পার্টি গার্ল হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে তার ছিল মারাত্মক রকমের অনীহা। আর এসব কিছুই স্থায়িত্ব পায় পিপির সাথে তার বিয়ে হওয়ার পর।
বিয়ের প্রথম চার বছর ন্যালিনি ছিল খুব সুখী। সন্তানদের যত্ন-আত্তি, পড়াশোনা আর ইউনিভার্সিটি অব নেভেদার ক্লাস নিয়ে ব্যস্ত ছিল সে। কিন্তু পিপি তার এ সুখে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। রাজ্যের সার্বিক পরিস্থিতির কথা ভেবে বেশি দিন সেখানে থাকতে তার ছিল দ্বিধা। পিপি বুঝতে পেরেছিল– যে কোনো সময় তাদের জীবনে নেমে আসতে পারে বিপদের কালো মেঘ। সে জানত রাজ্যের উছুল কৃষ্ণাঙ্গরা কোনো কিছু না ভেবেই কেড়ে নিতে পারে অনেক কিছু। ন্যাটিভ আমেরিকানদের সম্পর্কেও খুব ভালো ধারণা ছিল না তার– সে যে কেউ হোক না কেন, পিপি-ন্যালিনি ও তাদের সন্তানকে একেবারে সাগরের তলদেশে নামিয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করবে না মোটেও। আরো তাছাড়া বই এবং মিউজিক সম্পর্কেও পিপির খুব একটা আগ্রহ ছিল না বিধায় ন্যালিনির এই ইচ্ছায় বাদ সাধল পিপি।
সন্তানদের প্রতি ন্যালিনির মনোভাব ছিল বেশ কঠোর। তাদের সভ্য করে গড়ে তুলতে পিপির প্রতি অভিযোগ করে বলত ছেলেমেয়েদের শাসন না করলে পরে নিজেই তাদের আচার-আচরণে হতবুদ্ধি হয়ে পড়বে। শিশুরা পশুর মতো হয়ে উঠছে। এ অবস্থায় তাদের শাসন না করলে, কিভাবে তাদের এই আচরণ-ব্যবহার শোধরাবে? ন্যালিনির এ অভিযোগের পরও পিপি তার সন্তানদের গায়ে কখনো টোকাটাও দেয়নি।
তাদের বিয়ের চতুর্থ বছরে সন্তানদের প্রশিক্ষণ দিতে ন্যালিনির জন্য পিপি মিস্ট্রেস নিযুক্ত করল। আর এ নিয়োগও ছিল উল্লেখ করার মতো। এদের একজন লাস ভেগাসের, একজন নিউইয়র্কের এবং আরেকজন লস অ্যাঞ্জেলেসের। এই তিন মিস্ট্রেসের কাছে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ নিয়ে ন্যালিনি হয়ে উঠল দক্ষ।
