তবে সুখ যে মানুষের দীর্ঘস্থায়ী হয় না পিপি তা বেশ অনুধাবন করত। সে তার এতদিনের বিপদসঙ্কুল জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে জানতে পেরেছিল– সামনেও তার জন্য হয়তো অপেক্ষা করছে কোনো অপ্রীতিকর, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। এর কারণ একমাত্র তার জীবনের সফলতা। আর তাই পিপি তার ছেলে ক্রসকেই অবলম্বন মনে করতে শুরু করল। সে মনে-প্রাণে আকাক্ষা করল তার ভবিষ্যৎ মানুষটিই যেন তার সহযোগী হয়ে ওঠে। অথবা সে ব্যতিক্রমও খুঁজতে থাকল এর এমন একজন মানুষ তার কাছে আকাক্ষিত হয়ে উঠল যার ওপর সম্পূর্ণরূপে আস্থা রাখা যায়।
এসব চিন্তা থেকেই পিপি ক্রসের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠল। শুরু হলো প্রশিক্ষণ পিপি তাকে শেখাল জুয়ার বিভিন্ন কলা-কৌশল, তাকে ঘনঘন গ্রোনিভেল্টের সাথে ডিনারে নিয়ে যেতে লাগল পিপি। গ্রোনিভেল্টের সংস্পর্শে নেয়ার উদ্দেশ্য ক্রস যাতে ক্যাসিনোর ব্যতিক্রমী ও বিভিন্ন ধারা গ্রোনিভেল্টের কাছ থেকে রপ্ত করতে পারে। গ্রোনিভেল্ট সবসময়ই ক্রসের জন্য ছিলেন মুক্ত। ক্রসকে তিনি বলতেন, প্রতি রাতেই হাজার হাজার লোক আমার ক্যাসিনোর সাথে প্রতারণা করতে জেগে বসে থাকে।
পিপির কাছ থেকে ক্রস শিখেছিল শিকারের কৌশল। শিখেছিল কিভাবে, কোন লক্ষ্যে আঘাত করলে জন্তু-জানোয়ার কুপোকাত হবে তাদের রক্তের গন্ধ সম্পর্কে ধারণা দিয়েছিল পিপি। বিভিন্ন জানোয়ারের রক্ত পিপি ক্রসের হাতে লাগিয়ে তাকে ধারণা দিয়েছিল। মুষ্টিযুদ্ধের প্রশিক্ষণও বাবার কাছ থেকে পায় ক্রস। বন্দুকের ব্যবহার এবং এর যত্নের কলা-কৌশল শিখিয়েছিল পিপি।
নেভেদার পার্বত্যাঞ্চলে ক্লেরিকুজিও ফ্যামিলির রয়েছে বিশাল হান্টিং লজ। ছুটির দিনগুলোতে পিপি ও তার পরিবার প্রায়ই বেড়াতে যেত। এ সময় ন্যালিনি যখন বইয়ের মধ্যে ডুবে থাকত তখন পিপি সন্তান দুটিকে নিয়ে মেতে উঠত শিকারের খেলায়। এসব শিকারে ক্রস এমনভাবে হাত পাকিয়ে নিয়েছিল যে, ভালুক, হরিণ এমনকি পাহাড়ি সিংহ কিংবা কোনো হিংস্র প্রাণী খুব সহজেই ধরাশায়ী হতে লাগল ক্রসের নিশানার কাছে। বাবা পিপি ডি লিনার ছেলের যোগ্যতায় ধীরে ধীরে আস্থা জন্মাতে লাগল। পিপি বুঝতে পারল ছেলের দৌরাত্ম্য। সেই সাথে বুঝল জন্তু-জানোয়ারের প্রতি তার যত্নবান। হওয়ার মনোভাবও। পিপির কাছে ক্রস যেন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও শান্ত মস্তিষ্কের ছেলে– কোনো শিকারে ক্রস কখনোই উত্তেজিত নয়– অত্যন্ত ধীর ও লক্ষ্যে আঘাত হানতে বেপরোয়া মনোযোগ।
ক্লডিয়া ছিল এসবে একেবারেই আগ্রহহীন। বন্দুকের গুলি খেয়ে যখন কোনো হরিণ লাফিয়ে উঠত ক্লডিয়া যেন মর্মাহত হতো। এমনই কিছু অবসর যাপনে ক্লডিয়া আর তার বাবা-ভাইয়ার সাথে যেত না, বরং লজে মায়ের সাথেই বসে গল্প করে কাটত। ক্লডিয়ার মাছ ধরতেও ছিল আপত্তি।
পিপি ছেলের প্রতিই বেশি মনোযোগ দিতে শুরু করল। তাকে চরিত্রের মূল বিষয়গুলো শেখাত পিপি। ক্রসের উদ্দেশ্যে বলত– কখনো খুব সামান্যতেই রেগে যাবে না, আর নিজের সম্পর্কে কিছুই বলবে না কখনো। তোমার কাজের মাধ্যমেই তুমি আদায় করে নেবে অন্যের সমীহ, কথার মাধ্যমে নয়। সব সময় শ্রদ্ধা করবে তোমার রক্তের সম্পর্ককে। গ্যাম্বলিংকে কখনোই পেশা হিসেবে নয়, এটাকে মনে করবে তোমার শান্তি, বিনোদন হিসেবে। ভালোবাসবে তোমার বাবাকে, মাকে, বোনকে কিন্তু নিজের স্ত্রীর চেয়ে অন্য কোনো নারীর ভালোবাসায় থাকবে সদাসতর্ক। তোমার স্ত্রী, হতে পারে এমন একজন নারী যে তোমার সন্তানের জন্য বিরক্তিকর হয়ে উঠতে পারে– আর যদি তা তোমার ক্ষেত্রে হয়ই তবে তোমার জীবন হয়ে উঠবে দুর্বিষহ– তুমি ব্যর্থ হবে তাদের দুমুঠো খাওয়াতেও।
বাবার কথার অন্যথা করেনি ক্রস– পদে পদে সে মনে রেখেছে পিপির উপদেশ। ক্রসের সাথে তার মা ন্যালিনির চেহারার অদ্ভুত মিল থাকার কারণে পিপি ছেলেকে ভালোবাসে খুব। ক্রসের মাঝে ন্যালিনির উপস্থিতি খুঁজে পায় পিপি।
ক্লেরিকুজিও ফ্যামিলির পরবর্তী প্রজন্ম যে একটি বৈধ, আইনসম্মত সমাজের মধ্যে মিশে যাবে– ডন ক্লেরিকুজিও’র এমন স্বপ্নে পিপির কোনো বিশ্বাস নেই। এটা যে ভালো ফলাফলের দিগন্ত রচনা করবে- এমন বিশ্বাসও পিপি করে না কখনো। তবে সে বৃদ্ধদের অতিকৌশলী বুদ্ধিকে স্বীকার করে, তবে তা-ও কেবল গ্রেট ডন ক্লেরিকুজিও’র প্রতি। আসলে সব বাবাই চায় সন্তানরা যেন তাদের সাথেই কাজ করে, তাদের অনুসারী হয়ে ওঠে। রক্তের সম্পর্ক এক হবেই– এটা লঙ্ঘন করা যায় না— সত্য কথা।
আর এ ক্ষেত্রে পিপি তা সঠিক বলেই প্রমাণ করেছে। ডন ক্লেরিকুজিও’র দৃঢ় পরিকল্পনার পরও, তার আপন নাতি ডেন্টি তার নিজস্ব পরিকল্পনা প্রণয়নে ব্যস্ত। ফেলে আসা সিসিলীয় রক্তের দুরন্তপনার ধারা ডেন্টির শরীরে, ক্ষমতার জন্য ব্যাকুল। সে কখনো সমাজের ও ঈশ্বরের বিধি-বিধান লঙ্ঘনে ভীত নয়।
ক্রসের যখন সাত বছর বয়স এবং ক্লডিয়ার ছয়, ক্রস ছিল ছোটবেলায় বেশ আক্রমণাত্মক। ছোট বোন ক্লডিয়াকেও ছাড়ত না। পাঞ্চিংয়ের অভ্যাস করত ক্লডিয়ার পাকস্থলি বরাবর আঘাত করে বাবা-মার সামনেই সে এমন দুরন্তপনার সাহস দেখাত। ক্লডিয়া দক্ষ ভাইয়ের হাত থেকে বাঁচার জন্য কেঁদে ফেলত। ক্রসের এই আচরণকে দমন করতে পিপি তখন ভিন্ন কৌশলের আশ্রয় নিত।
