পিপি ও ন্যালিনির মধ্যে ভাবের এই আদান-প্রদানে উভয়ে উভয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়, ভালোবাসার সম্পর্ক হয় আরো দৃঢ় উভয়ের মধ্যে যৌন সম্পর্কের সূত্রপাতও হয় এ থেকে। এ থেকে ন্যালিনি কেবল বুঝতে পারে একজন সুন্দর মনের প্রেমিককে, তার ভালোবাসার মানুষ স্বামী পিপিকে। সত্যিকারের আরেক ভুবনের পিপি ন্যালিনির কাছে রয়ে যায় আবৃত। ন্যালিনি শুধু বুঝতে পারে তার স্বামী তাকে কত ভালোবাসে, যে তার জীবনের উৎকৃষ্ট উপহারস্বরূপ।
ন্যালিনির যখন মাত্র আঠারো বছর তখন তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের প্রায় এক সপ্তাহ পর তারা মিলিত হয়েছিল। ন্যালিনি অবশ্য তখন পিপি সম্পর্কে তেমন কিছুই জানত না। পিপির বয়স ছিল আটাশ এবং সত্যিই যে সে ন্যালিনিকে ভালোবাসত– একটুকুই বুঝত ন্যালিনি। ন্যালিনিকে বিয়ের পর পিপিও ক্রমে সেই পুরনো সংস্কৃতির মূল্যবোধে বেড়ে উঠতে থাকে। তারা উভয়েই একটি পরিবারে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে।
ন্যালিনি ছিল অরফ্যানের, অপরদিকে পিপি ক্লেরিকুজিও পরিবারের হলেও ন্যালিনির সংস্পর্শে তার ভালোবাসায় ক্রমেই হারিয়ে গিয়েছিল– ক্লেরিকুজিও বিমুখ হয়ে উঠেছিল। তাকে বিয়ে করে পিপি বুঝতে পেরেছিল তাদেরকে ক্লেরিকুজিও পরিবার মেনে নেবে না। পরিবারের মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে সেখান থেকে সরে আসাই সমীচীন মনে করে পিপি। গোপনে ভেগাসের এক প্রার্থনালয়ে তারা বিয়ে করে।
পিপির সমস্ত জল্পনা-কল্পনা, ভয় ও সন্দেহ দূর করে ক্লেরিকুজিও মেনে নেন তাদের। তিনি প্রায়ই একটি কথা বলতেন, একজন মানুষের প্রাথমিক কর্তব্যই হচ্ছে তার জীবনযাপনের জন্য নিজের রোজগারটুকুতে সক্ষম হওয়া। কিন্তু এর জন্য তার যদি না থাকে স্ত্রী কিংবা পুত্র?– এমন প্রশ্নে ডন বেশ অসম্মানবোধ করতেন। তিনি কখনোই এমন পরামর্শ দেননি যে, ক্লেরিকুজিও পরিবারে স্বাধীন বিয়েকে মেনে নেয়া হবে না। মোটের ওপর পিপির শরীরেও ছিল ক্লেরিকুজিও ধারার রক্ত।
পিপি-ন্যালিনির বিয়ে মেনে নিলেও মন থেকে সায় দিতে পারেনি ডন ক্লেরিকুজিও। তিনি যে তাদের বিয়েতে সন্তুষ্ট ছিলেন না তা তার খুঁতখুঁতে কিছু মন্তব্য থেকে বোঝা যায়। তিনি বলতেন তারা সাগরের তলদেশে গিয়ে যেন নেচে বেড়ায়। তা সত্ত্বেও ডন ক্লেরিকুজিও তাদের বিয়ে উপলক্ষে দিয়েছিলেন মুক্ত হস্তে অঢেল। ডন একটি কোম্পানির মালিকানা দিয়েছিলেন পিপিকে তাদের বিয়ে উপলক্ষে যা থেকে প্রতি বছর আয় ছিল এক লাখ ডলার। এই আয় পিপির সে সময়ের সব আয়কে ছাড়িয়ে গিয়েছিল– এটা ডনের দৃষ্টিতে পিপির পদোন্নতি। তবে পিপি পশ্চিমে ক্লেরিকুজিও পরিবারের ব্রুগলিওন হিসেবে বহাল ছিল আগের মতোই। এক্ষেত্রে তার পদবির কিংবা দায়িত্বের কোনো হেরফের হয়নি। তাকে ব্রঙ্কস এনক্লেভ থেকে কেবল সরে যেতে হয়েছিল।
ব্রঙ্কস এনক্লেভে পিপিকে ছেড়ে যেতে হয়েছিল শুধু ন্যালিনি জেসাপকে বিয়ে করার জন্য। ব্রঙ্কস এনক্লেভে ন্যালিনি একজন বিদেশিনী, এজন্য ভিন্ন গোত্রের মানুষ– মুসলিম, কৃষ্ণাঙ্গ, ইহুদি এবং এশীয়দের মতোই তারও উপস্থিতি ব্রঙ্কস এনক্লেভে নিষিদ্ধ, যেন অচ্ছুত কোনো সম্প্রদায়। আর এ সম্প্রদায়ের জায়গা ক্লেরিকুজিও’র ইতালীয় উপনিবেশ ব্রঙ্কসে অন্তত নেই। ন্যালিনির কারণেই ক্লেরিকুজিও’র মুগুর হওয়া সত্ত্বেও, স্থানীয় একটি মাফিয়া দলের প্রধান ব্যারন হওয়া সত্ত্বেও পিপিকে হারাতে হয়েছে কুওগে তার স্বাভাবিক জীবনযাপন।
ডন শুধু তাদের বিয়ে উপলক্ষে যথাযথ পুরস্কার দিয়েই খালাস। এক্ষেত্রে তাদের বিয়েকে উৎসবমুখর করতে এগিয়ে এসেছিলেন জানাদু হোটলের মালিক, ডনের আরেক কাছের লোক আলফ্রেড গ্রোনিভেল্ট। পিপি-ন্যালিনির বিয়ে উপলক্ষে গ্রোনিভেল্ট তার হোটেলে আয়োজন করেছিলেন ছোট একটি ডিনার পার্টি। সে পার্টির অন্যতম আয়োজন ছিল বর ও কনের সৌজন্যে সারা রাত নাচের। এ থেকেই বছরখানেকের মধ্যে গ্রোনিভেল্টের সাথে পিপির তৈরি হয়েছিল অত্যন্ত সুসম্পর্ক তারা একে-অপরের শ্রদ্ধাভাজনও হয়ে উঠেছিলেন ক্রমেই।
পিপি-ন্যালিনির দীর্ঘ বৈবাহিক জীবনে এসেছে দুটি সন্তান– একজন ছেলে আর আরেকজন মেয়ে। ধর্মীয় বোধে উদ্দীপ্ত ককসিফিজিও পিপির জ্যেষ্ঠ পুত্র— ক্রস নামেই সে বেশি পরিচিত। তার যখন দশ বছর বয়স অবিকল সে দেখতে হয়েছিল তার মায়ের মতো। শরীরে ছিল লাবণ্য এবং আচার-আচরণে ছিল তার মেয়েলীপনা। এখন অবশ্য শারীরিক সৌষ্ঠব, সাহসিকতায় সে তার বাবার মতোই।
ক্রসের ছোট তার বোন ক্লডিয়া। নয় বছর বয়সে ক্লডিয়া পেয়েছিল বাবার চেহারা। তবে আচারে-গুণে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে মা ন্যালিনির মতো। বাবার চেয়ে মায়ের প্রতিই তার ভালোবাসা বেশি। মায়ের মতো বইপড়া, মিউজিক, থিয়েটারের প্রতি রয়েছে তার ভালোবাসা এবং মহানুভবতায়, তেজস্বীতায় ন্যালিনি জেসাপের মতোই তার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। ক্রস যেমন তার বাবা পিপির ভক্ত, তেমনি অপরদিকে ক্লডিয়া তার মায়ের ভক্ত।
এগারো বছর আগেও ডি লিনা পরিবারটি ক্লেরিকুজিও পরিবার থেকে পৃথক হয়ে বেশ সুখে কাটাচ্ছিল জীবন। পিপি ভেগাসে ব্রুগলিওন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলে, একই সাথে জানাদু হোটেলের কালেক্টরের দায়িত্বও পালন করতে থাকে; আর ডন ক্লেরিকুজিও’র মুগুর হিসেবে তো সে ছিলই। ধীরে ধীরে পিপি ধনী হয়ে ওঠে, জীবনযাপনে আসে উন্নতির ধারা– অবশ্য এর সবকিছুই ছিল ডনের বদৌলতে। তবে তার জীবনযাপন ঘিরে থাকে পরিবারের ছোঁয়া। মদপান আর জুয়া থেকে নিজেকে মুক্ত করতে না পারলেও তার সুখের জীবন অতিবাহিত হয় স্ত্রী ন্যালিনির সাথে নেচে, সন্তানদের সাথে খেলে। সন্তানদের মানুষ করতে পিপি ও ন্যালিনি আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যায়।
