ডন ক্লেরিকুজিও সিসিলিতে জন্মগ্রহণ করেন যেখানে সমাজ ও সরকার ছিল পরস্পরের শত্রু। তার মুক্তচিন্তার ধারণাটি বেশ পরিষ্কার- কেউ তার রোজগার, আয়ের জন্য মর্যাদা ও আশা বেচে তার ইচ্ছা পূরণ করতে পারে। অপরদিকে শ্রদ্ধার সাথে, মর্যাদার সাথে পূরণ করতে পারে তার রোজগার চাহিদা।
ডন প্রায়ই বলেন, তোমার পরিবার হচ্ছে তোমার সমাজ, তোমার প্রভু তোমার ফলদানকারী এবং তোমার অনুসরণকারী তোমাকে রক্ষা করবে।
ডন তার সাম্রাজ্য শুধু এই জন্য প্রতিষ্ঠা করে নি যে তার সন্তান এবং নাতি-নাতনিরা কেবল তা ভোগ করবে এবং মানবতাবোধ থেকে সরে আসতে থাকবে কিংবা একসময় পরিবারের কোনো অস্তিত্বই থাকবে না। ডন এমনভাবে তার সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছেন যেন তার ফ্যামিলির নাম এবং ভাগ্য চার্চের মতোই মানুষের মনে পবিত্রতার সাথে ঠাই পাবে। তিনি ভাবেন রুটি রোজগার ছাড়া এই বিশ্বে আরো অনেক কিছু করার আছে মানুষের, যা পরবর্তীতে (মৃত্যুর পর) যাবতীয় অপরাধের ক্ষমার জন্য নিজেকে উপস্থাপন করবে ঈশ্বরের কাছে।
ডন ডোমেনিকো তার পরিবারকে ক্ষমতার শীর্ষে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন। এর জন্য তাকে হতে হয়েছে কখনো বর্গিয়ানের মতো হিংস্র এবং ম্যাকিয়াভেলির মতো সূক্ষ্ম। সেই সাথে আমেরিকান বিজনেস সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞান অর্জন করতে হয়েছে তাকে। তব এত সব কিছুর পরও তাকে তার অনুসারীদের ভালোবাসতে হয়েছে বাবার মতো। পুণ্য করলে তার ফলও ভোগ করা যায় আর পাপে করতে হবে প্রায়শ্চিত্য এটাই সত্য, জীবনের পরম বাস্তবতা।
অবশেষে ডনের পরিকল্পনায় দেখা গেল ক্লেরিকুজিও ফ্যামিলি ক্ষমতার এমন এক পর্যায়ে উঠে এসেছে, সেখান থেকে আর কোনো অপরাধের সাথে তাদের জড়িত থাকা সম্ভব নয়, কেবলমাত্র ভয়াবহ ঘটনার সম্মুখীন না হওয়া পর্যন্ত। তবে ক্লেরিকুজিও সাম্রাজ্যের মাফিয়া প্রধান যেমন ব্যায়রন কিংবা ব্ৰুগলিওনরা (ইতালীয় শব্দ) ডনের যে কোনো বিপদে পাশে এসে দাঁড়াবে। এটাও ডনেরসুদূর প্রসারী পরিকল্পনার ফল। এর জন্য ডন সমস্ত মাফিয়া প্রধানদের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন, তাদের জেল থেকে মুক্ত করেছেন, ইউরোপে অনেকের প্রাপ্ত অবৈধ অপরাধের নিশ্চিত শাস্তি থেকে মুক্ত করেছেন, আমেরিকায় সমঝোতার মাধ্যমে তাদের মাদক চোরাচালানের নিরাপদ পথ তিনি অনায়াসেই তৈরি করেছেন মাফিয়া দলগুলোর জন্য। পৌর এলাকাতেও তাদের ঠাঁই হয়েছে বিনা বাধায়।
ডন ফ্লেরিজিওর জ্যেষ্ঠ পুত্র জর্জিও একজন অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ। বর্তমানে ফ্যামিলির অন্যতম ক্ষমতাবান। কালো টাকাকে সাদা করার পদ্ধতি যেন তার নখদর্পণে। একাজ সে এমন ভাবে করে থাকে যেন কোনো স্বর্গীয় ধোপা টাকাগুলো ক্রমেই ধুয়ে দিচ্ছে আর তা বৈধ ও সভ্যতার কল থেকে কেবল বেরিয়েই যাচ্ছে। এই হচ্ছে জর্জিও, যে তার বাবার সাম্রাজ্যকে বাবার পরিকল্পনানুসারে নিয়ন্ত্রণের জন্য সদাসচেষ্ট। সবচেয়ে বড় কথা, ক্লেরিকুজিও ফ্যামিলির ওপর জনগণের তীক্ষ্ণ ও অশুভ দৃষ্টি এড়ানোর জন্য জর্জিও কঠোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আর এ কারণেই ফ্যামিলির অস্তিত্বও বহাল রয়েছে গতানুগতিক। ফ্যামিলির ওপর অনবরত তীক্ষ্ণদৃষ্টি, অপবাদ, ফ্যামিলিকে ঘিরে ভয়াবহ ও বিপজ্জনক যেসব তৎপরতা চলছে তা অত্যন্ত সফলতার সাথেই মোকাবেলা করছে জর্জিও। পাশাপাশি ফ্যামিলির একটা সুখ্যাতি প্রতিষ্ঠাতেও সে সম্পূর্ণ সফল।
ক্লেরিকুজিও ফ্যামিলির গাঁথা-গল্প-অপরাধের ঘটনা এফবিআই কিংবা পুলিশের নথিতে একের পর এক যুক্ত হলেও সংবাদ মাধ্যমে তা কখনোই প্রকাশ হয়নি। এমনকি সেসব সাহসী প্রকাশনা বা ম্যাগাজিনেও এই পরিবারকে নিয়ে কখনো দুকলম লেখা হয়নি। এই সংস্থাগুলো অবশ্য আমেরিকার অন্যান্য মাফিয়া দলের বিরুদ্ধে বিস্তর লিখেছে। যারা এই মাধ্যম এবং পুলিশকে মোটেও পাত্তা দেয়নি তাদের অবনতিই হয়েছে। অথচ জর্জিও’র মেধা, কৌশল ফ্যামিলিকে রেখেছে নিরাপদে।
তাই বলে ক্লেরিকুজিও ফ্যামিলি যে দাঁতহীন বাঘ এটা মনে করা হবে বোকামি। জর্জিও’র ঘোট দুভাই ভিনসেন্ট এবং পেটি– এরা বড় ভাইয়ের মতো চালাক না হলেও, ডনের রক্ত আছে তাদের শরীরে। ব্রঙ্কসের সীমাবদ্ধ গণ্ডীতে তারা পূর্ণ শক্তি নিয়ে বসবাস করছে। সর্বদা ইতালীয় সংস্কৃতিতে শক্তির সঞ্চয় হচ্ছে তাদের দিন দিন। ব্রঙ্কসের এই পরিসরটি দুভাইয়ের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এমন চল্লিশটি ব্লক যা যে কোনো পুরনো ইতালির সংস্কৃতির ওপর ছবি নির্মাণে সহায়ক পরিবেশ। সেখানে নেই কোনো দীর্ঘ দাড়িঅলা হাসিডিক ইহুদি, নেই কৃষ্ণাঙ্গ কিংবা এশীয়, অথবা নেই কোনো বোহেমীয় জাতির জনগণ নেই তাদের সাথে সম্পৃক্ত কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান কিংবা লেনদেন। সেখানে কোনো চায়নিজ রেস্তোরাঁ নেই। ক্লেরিকুজিও ব্রঙ্কসের পুরো রিয়েল এস্টেট নিয়ন্ত্রণ করেন তার নিজ কর্তৃত্বে।
ছোটখাটো এই ইতালীয় উপনিবেশে দেখা যাবে ইতালীয় কিছু পরিবারের লম্বা চুলের তরুণ যুবক গিটার হাতে মেতে রয়েছে আপন উচ্ছলতায়। তবে খুব শিগগিরই ক্যালিফোর্নিয়ায় তাদের আত্মীয়-স্বজনের কাছে গছিয়ে দেয়া হবে। প্রতি বছর ইতালির সিসিলি থেকে ক্লেরিকুজিও ফ্যামিলির পরিধি বৃদ্ধি করতে নতুন নতুন পরিবার আসছে সতর্কতার সাথে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে ক্লেরিকুজিও সাম্রাজ্যের কোনো আস্তানায়। সারা বিশ্বে ব্রঙ্কস এনক্লেভ ঘিরে রয়েছে হাজারো অপরাধের গুঞ্জন, কিন্তু এই ব্রঙ্কস এনক্লেভে বিন্দুমাত্র অপরাধ সংঘটনের নজির নেই ব্রঙ্কস এনক্লেভ সদা পবিত্র, যেন শান্তির স্বর্গধাম।
