আমেরিকান বিচারকদের উদ্দেশে তিনি একটি প্রবাদ বাক্য প্রায়ই বলতেন। একজন নিরপরাধী ব্যক্তির শাস্তি হওয়ার চেয়ে একশ অপরাধীর মুক্তি দেয়া ভালো। সুন্দরের কাছে আঘাত ম্লান আসলে ক্লেরিকুজিও একজন উদ্দীপনাময় দেশপ্রেমিক হয়ে ওঠেন। আমেরিকাকে তিনি নিজের দেশ হিসেবেই মনে করেন– আমেরিকার বাইরে কোনো দেশের প্রতিই তার কোনো আগ্রহ নেই। আমেরিকার প্রতি ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ক্লেরিকুজিও সেই ছেড়ে আসা পূর্বপুরুষের দেশ সিসিলির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও খাঁটি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। সে দেশের সব রাজনৈতিক ও বিচার বিভাগের বিভিন্ন সংস্থাকে ক্লেরিকুজিও প্রচুর অর্থ দিয়ে বন্ধুত্ব নিশ্চিত করতে সমর্থ হন।
ব্যবসায় ডন কখনো একটি কিংবা দুটি ক্ষেত্রে সন্তুষ্ট ছিলেন না। আমেরিকা জুড়ে সবচেয়ে উন্নত ব্যবসাগুলোয় তিনি সরাসরি অন্তর্ভুক্ত হন। বিভিন্ন কনস্ট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রি, পরিত্যক্ত যন্ত্রাংশের পুনর্গঠন, বিভিন্ন পরিবহন ব্যবস্থায় ডন সহজাত অংশীদারিত্ব গ্রহণ করেন। তবে তার এসব ব্যবসার চেয়ে গ্যাম্বলিং থেকে আয় এর বহুগুণ। এটা ছিল ডনের ভালোবাসা। পাশাপাশি মাদকদ্রব্যের ব্যবসা থেকেও জুয়ার চেয়ে কোনো অংশেই কম আসত না। তবে এক্ষেত্রে খুব একটা আস্থা ছিল না তার। জুয়ার প্রতি ভালোবাসার কারণেই ডন পরবর্তীতে তার পরিবারের লেকজনকেও এতে জড়িত হতে সম্মতি দিয়েছেন। ক্লেরিকুজিও এই ক্ষেত্রটি থেকে নিতেন মাত্র পাঁচ শতাংশ।
আমেরিকায় ডন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পঁচিশ বছরে ক্লেরিকুজিও’র পরিকল্পনা ও স্বপ্ন সত্য হতে শুরু করে। গ্যাম্বলিং আমেরিকায় এখন প্রতিষ্ঠিত, ক্রমেই বৈধতা পেতে শুরু করেছে। এটা এখন সবারই শ্রদ্ধার এবং সবার কাছেই এর গুরুত্বও বাড়তে শুরু করেছে দিন দিন। এমনকি সরকারও অনেক সময় লটারির মাধ্যমে গ্যাম্বলিংয়ে উৎসাহিত করছে। তবে এক্ষেত্রে পুরস্কার দেয়া হচ্ছে একে একে টানা কুড়ি বছর ধরে। যার ফলে মোটের ওপর কোনো অর্থ দিতে হচ্ছে না আয়োজক প্রদেশগুলোর কর্তৃপক্ষকে। তবে মোট পরিমাণ অর্থের সুদের ওপর নামমাত্র একটা কর প্রদান করতে হয়। ট্যাক্স ফাঁকি দেয়ার এ এক মজার জুয়া। ডন ডোমেনিকো এ বিষয়ে খুঁটিনাটি সবই জানেন। কারণ তার পরিবারের কেউ এমনই এক প্রতিষ্ঠানের একটির মালিক। এ কোম্পানি বিভিন্ন রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে সফলতার সাথে লটারি পরিচালনা করে আসছে। ডন সেখান থেকেই জেনেছেন সব।
অন্যান্য স্পোর্টসের ওপর জুয়া যখন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বত্রই প্রায় প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, ডন তখন গ্যাম্বলিংকে শুধুমাত্র নাভাদায় বৈধ প্রতিষ্ঠা দিতে সক্ষম হয়েছেন। তবে তিনি জানেন নাভাদার গ্যাম্বলিং বিভিন্ন স্পোর্টসের ওপর গ্যামলিংয়ের চেয়ে পৃথক। কোনো ফুটবল ম্যাচের ওপর জুয়ার দান ধরে একদিনে বিলিয়ন ডলার আয় হতে পারে তবে তা মাত্র একদিনের জন্য। ডনের গ্যাম্বলিং বৈধতা পেলে এমন আয় হতে পারে প্রতিদিন। ডন জানেন গ্যাম্বলিং গোটা যুক্তরাষ্ট্রে বৈধতা একদিন পাবে অবশ্যই হয়তো সেই সোনালি দিন পর্যন্ত তিনি এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকবেন না। তবে তার পরবর্তী প্রজন্ম উপভোগ করবে নিঃসন্দেহে।
রেনেসাঁ যুগের প্রিন্সের সাথে ডন ক্লেরিকুজিও’র তুলনা করা চলে নির্দ্বিধায়। ১৪শ থেকে ১৬শ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপের শিল্প ও সাহিত্যের যে পুনভুদয় ঘটিয়েছিলেন সে সময়ের শ্রদ্ধাভাজনরা। যার জন্য আজও তারা স্থান পেয়েছেন ইতিহাসে। শ্রদ্ধায় যাদের জন্য আমাদের এখনও মাথা নত হয়ে আসে, ঠিক তেমনি নিশ্চিতভাবেই ডনও একটি সভ্য সমাজের সভ্য এই সারা পৃথিবীর দ্রষ্টা। গাছ যেমন ফুলের সৌরভে মানুষকে মাতিয়ে রাখো ফল দেয়, ছায়া দেয়, তেমনই বৃক্ষের সহস্র বীজ ডন এ পৃথিবীতে বুনে যাচ্ছেন। একে একে এসব গাছ বড় হবে– ফুল দেবে, ফল দেবে, ছায়া দেবে– এসব বীজ বিনষ্ট হবে না কখনো।
.
যদি পুরো আমেরিকায় মাফিয়া সম্রাটদের পবিত্র চার্চ হিসেবে ক্লেরিকুজিও ফ্যামিলিকে গণ্য করা হয়ে থাকে তবে সে চার্চের ডন ডোমেনিকো ক্লেরিকুজিও হচ্ছেন পোপ। তার এই খ্যাতি শুধু তার বুদ্ধিমত্তার জন্য নয়, তার দৃঢ়তার জন্যও।
ডন ক্লেরিকুজিও তার দৃঢ় নৈতিকতার জন্য তার পরিবারের কাছেও সমান শ্ৰদ্ধার। পরিবারের প্রত্যেকটি পুরুষ, মহিলা এবং শিশু তার যে কোনো নির্দেশের প্রতি দায়িত্বশীল। যে কোনো ব্যাপারে অনুশোচনাই হোক, বাধ্যবাধকতাই হোক কিংবা বৈরী পারিপার্শ্বিকতা হোক– ডনের আদেশের প্রতি অনুগত হতেই হবে। যদি কেউ তার বিরোধিতা করতে চায় তবে সে কথাগুলো কেবল বাতাসেই উড়ে বেড়াবে। ডন ঘৃণা করেন সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞানের মতো যত বিষয়। তিনি একজন গোঁড়া ক্যাথলিক– তার বিশ্বাস, কর্মের ফল পেতে হবে এ পৃথিবীতেই, আর ক্ষমা, এর পর। তিনি বিশ্বাস করেন, সবাইকে তাদের ঋণ শোধ করে যেতে হবে এবং বিশ্বে তার বিচারে তিনি অত্যন্ত কঠোর।
তার আনুগত্য প্রথমেই তার প্রতি, যার রক্ত শরীরে প্রবহমান। দ্বিতীয়ত, তার প্রভুর প্রতি (তিনি কি তার বাড়ির নিজস্ব প্রার্থনালয়ে অবস্থান করছেন না?) এবং তৃতীয়ত, ক্লেরিকুজিও ফ্যামিলি যে ভূখণ্ডে বর্তমানে সমস্ত বাধ্যবাধকতার শিকার এটি হতে পারে তার সমাজ, সরকার, সর্বোপরি দেশ।
