কয়েক দিন পরের কথা, ভিটো কর্লিয়নির স্ত্রীকে ক্লেমেঞ্জা জিজ্ঞেস করল, বৈঠকখানার জন্যে তাদের কোন গালিচা দরকার আছে কিনা। গালিচাটা বয়ে আনতে হবে, একজনের পক্ষে তা সম্ভব নয়, তাই ভিটোকে সাথে যেতে অনুরোধ করল ক্লেমেঞ্জা। ভিটোকে নিয়ে একটা ফ্ল্যাট বাড়িতে এল সে। বাড়িটার গেটের ভিতর মোটা লম্বা থামগুলো শ্বেত পাথরের তৈরি। চাবি বের করে দরজা খুলল ক্লেমেঞ্জা, ভিট্টোকে নিয়ে সৌখিন ভাবে সাজানো একটা ফ্ল্যাটে ঢুকল সে। ঘরের ওধারে যাও, ভারি গলায় ভিটোকে বলল, গালিচাটা আমি গোটাচ্ছি, তুমি আমাকে সাহায্য করো।
অপূর্ব সুন্দর দামী লাল উলের গালিচা, এ-ধরনের একটা জিনিস ক্লেমোতকৈ দান করতে যাচ্ছে দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলেন ভিটো। তার মনের উদারতা দেখে খুশি হলেন তিনি। গোটানো হয়ে যেতে, গালিচার দুই প্রান্ত দুজন ধরে গেটের দিকে হাঁটা দিয়েছেন, ঠিক এই সময় গেটের কলিংবেল বেজে উঠল।
নিমেষে হাত থেকে গালিচাটা ফেলে দিল ক্লেমেঞ্জা, লাফ দিয়ে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল, পর্দাটা সিকি ইঞ্চি সরিয়ে কি সে দেখল সেই জানে, ঝট করে পকেটে হাত ঢুকিয়ে বের করে ফেলল পিস্তলটা। এতক্ষণে ভিটো কর্লিয়নি বুঝতে পারছেন, ক্লেমেঞ্জা তাকে নিজের জিনিস দান করছে না, তারা অন্য লোকের জিনিস চুরি করছেন।
আবার বেজে উঠল কলিংবেল। ব্যাপারটা কি দেখার জন্যে ক্লেমেঞ্জার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন ভিটো, পর্দার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিতেই দেখতে পেলেন, গেটের সামনে ইউনিফর্ম পরা একজন পুলিশ দাঁড়িয়ে রয়েছে। তৃতীয় এবং শেষবারের মত কলিংবেল বাজিয়ে বাড়ির ভিতর থেকে যখন কোন সাড়া পেল না লোকটা, বিরক্তির সাথে কাধ ঝাঁকিয়ে ঘুরে দাঁড়াল সে, সাদা মার্বেল-পাথরের সিঁড়ি বেয়ে রাস্তায় নেমে গেল।
গভীর, ভারি গলা থেকে ঘড়ঘড়ে একটা আওয়াজ বেরিয়ে এল ক্লেমেঞ্জার, ভিটো বুঝলেন, শব্দটা আনন্দের প্রকাশ ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। পুলিশ লোকটা সবে রাস্তার মোড় ঘুরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে এই সময় গালিচাটাকে দুজন। মিলে ধরাধরি করে বয়ে নিয়ে বেরিয়ে এলেন বাইরে। আধঘণ্টা পর ভিটো কর্লিয়নির বৈঠকখানার মাপ নিয়ে গালিচাটা কাটতে বসল ক্লেমেঞ্জা। বৈঠকখানার মেঝে ঢাকা পড়ার পরও অনেকটা বেঁচে গেল গালিচা, সেটুকু দিয়ে বেডরূমের মেঝেটাকেও মুড়ে দেয়া গেল। ভিটো কর্লিয়নি আবিষ্কার করলেন, ক্লেমেঞ্জার মত দূরদৃষ্টি সপন্ন আর নিপুণ কারিগর হয় না। লোকটা যত মোটা তার চেয়ে মাপে অনেক বড় কোট পরে, আর সেই কোটের সবগুলো পকেটে গালিচা কাটার যত রকম যন্ত্রপাতি থাকা সম্ভব সবই সে সাথে করে নিয়ে এসেছে।
সময় বয়ে যাচ্ছে, কিন্তু অবস্থা ভাল হবার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অপূর্ব সুন্দর দামী গালিচাটা খেয়ে তো আর কর্লিয়নি পরিবারের পেট ভরবে না। কাজকর্ম নেই এই অবস্থায় যা হবার তাই হচ্ছে, স্ত্রী আর ছেলেদেরকে নিয়ে উপোস থাকতে হয় বাড়ির কর্তাকে। আর কোন উপায় নেই দেখে, অগত্যা বাধ্য হয়ে বন্ধু গেনকোর কাছ থেকে কয়েক প্যাকেট খাবার নিতে হলো। কিন্তু এভাবে আর কদিন। কি করা যায় ভাবছেন ভিটো। কিছু একটা করতেই হয় এবার। কিন্তু কি করবেন তার কোন হদিস খুঁজে পান না তিনি। এমন ভয়াবহ অভাবে পড়েছেন, অথচ অন্যায় পথে টাকা রোজগারের কথা একবারও উঁকি দেয়নি তার মনে। এর মধ্যে একদিন ক্লেমেঞ্জা আবার তার বাড়িতে এসে হাজির, সাথে করে এনেছে পাড়ারই আরেক গুণ্ডা টাইপের ছোকরাকে। এরা দুজনেই তাঁকে ভালমানুষ বলে মনে করে, তার ব্যক্তিত্বকে শ্রদ্ধা করে, সেই সাথে জানে এখন তিনি অভাবের তাড়নায় মরিয়া হয়ে আছেন। একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছে তারা, ভিটো কর্লিয়নি তাদের দলে যোগ দিলে তারা নিজেদেরকে ভাগ্যবান বলে মনে করবে। একমুহূর্ত দেরি না করে নিজেদের পরিকল্পনার বর্ণনা দিতে শুরু করল তারা। হ্যাঁ বা না, কিছুই বলেননি এখনও ভিটো কর্লিয়নি, তিনি শুধু মন দিয়ে শুনে যাচ্ছেন ওদের কথা। থার্টিফাস্ট স্ট্রীটে রেশমের রেডিমেড পোশাক তৈরির একটা কারখানা আছে, সেখান থেকে চালান যায় ট্রাক ভর্তি পোশাক রাস্তায় ট্রাক থামিয়ে তাদের দলই এই মাল ছিনতাই করে। বিপদের ঝুঁকি বলতে কিছুই নেই। কিসে নিজেদের ভাল হবে সে-ব্যাপারে টনটনে জ্ঞান ট্রাক ড্রাইভারদের, একবার শুধু পিস্তলের চেহারা দেখলে হয়, অমনি লক্ষ্মী ছেলের মত নিঃশব্দে ফুটপাথে নেমে দাঁড়ায়। এরপর ছিনতাইকারীরা ট্রাক নিয়ে সোজা চলে আসে এক বন্ধুর দামে, সেখানেই খালাস করা হয় লুটের মাল।
ব্রঙ্কসের আর্থার এভেনিউ, মালবেরি স্ট্রীট, ম্যানহাটনের চেলসি-এই সব এলাকায় বাড়ি বাড়ি ফেরি করে বিক্রি করা হয় লুটের মাল। খরিদ্দাররা সবাই গরীব ইতালীয় পরিবারের মেয়ে, সস্তা জিনিসের খোঁজেই থাকে এরা, উচিত মূল্য বা বাজার দর দিয়ে এত ভাল পোশাক কেনবার সামর্থ্য এদের কারও নেই। লুটের মাল এরপরও প্রচুর থেকে যায়। সেগুলো বিক্রি করে দেয়া হয় ইতালীয় পাইকারী ব্যবসায়ীদের কাছে।
ভিটো কর্লিয়নিকে কেন তাদের দরকার, এবার সে-প্রসঙ্গে এল তারা। আসলে ট্রাক ড্রাইভারের অভাব পড়েছে তাদের। তারা জানে, কিছুদিন আগে পর্যন্ত আবানদার্তোর গাড়ি নিয়ে বাড়ি বাড়ি দোকানের মাল পৌঁছে দিয়েছেন ভিটো। উনিশশো উনিশ সাল এটা, ট্রেনিং পাওয়া ড্রাইভার জোগাড় করা চাট্টিখানি কথা নয়, মেলা টাকা দিলেও সব সময় পাওয়া যায় না। তাছাড়া, লোকটাকে তো ভালমানুষ আর বিশ্বস্ত হতে হবে।
