প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় আমদানি করা জলপাইতেলের খুব অভাব দেখা দিল আমেরিকায়। বাড়তে বাড়তে অনেক দূর এগিয়েছে ফানুচি, যত দিন যাচ্ছে ততই খাঁই আর লোভ সীমা ছাড়াচ্ছে তার। আবানদাতোর মুদি দোকান থেকে শুধু জলপাই তেল নয়, ইতালী থেকে আমদানি করা সালামি, হ্যাম আর চিজের একটা অংশ নিয়মিত সালামী হিসেবে আদায় করে নিচ্ছে সে! দোকান আর দোকানের মালপত্রের উপর নিজের অধিকার আরও শক্ত করে কায়েম করার জন্যে আরেক কৌশল খাটাল সে, নিজের এক ভাইপোকে নিয়ে এসে বসিয়ে দিল দোকানটায়। ফলে চাকরি হারালেন ভিটো কর্লিয়নি।
ইতিমধ্যে ওদের দ্বিতীয় ছেলে ফ্রেডারিকোরও জন্ম হয়েছে, তার মানে চার চারটে পেট চালাতে হয় ভিটো কর্লিয়নিকে। চিরকালই চুপচাপ, চাপা স্বভাবের মানুষ তিনি, মনের কথা ঠোঁটের বাইরে বের করেন না। তাঁর অন্তরঙ্গ ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলতে একজনই, দোকান মালিকের ছেলে গেনকো আবানদাণ্ডো। চাকরি হারিয়ে রাগ, ক্ষোভ আর দুঃখের বশে বাপের অন্যায় সিদ্ধান্তের জন্যে বন্ধুকে দায়ী করলেন ভিটো। তাতে তিনি নিজে এবং বন্ধু গেনকো দুজনেই অপ্রতিভ বোধ করলেন। লজ্জায় লাল হয়ে উঠে গেনকো বন্ধুকে কথা দিল, তার সংসারের পেট চালাবার জন্যে তাকে ভাবতে হবে না, সে-ব্যবস্থা যেভাবে হোক করবে সে। কি ভাবে? সাথে সাথে পানির মত সহজ একটা উপায়ের কথা জানাল গেনকো, বাপের দোকান থেকে খাবার চুরি করে এনে দেবে সে বন্ধুকে। কিন্তু প্রস্তাবটা অত্যন্ত কঠোর ভাবে প্রত্যাখ্যান করলেন ভিটো কর্লিয়নি, ছেলে হয়ে বাপের কাছ থেকে চুরি করবে, এতবড় অন্যায়, লজ্জাস্কর কাজ তিনি করতে দেবেন না।
ইদানীং যার নাম শুনলে লোক ভয় পায়, সেই ফানুচির উপর ঠাণ্ডা হিম একটা বিদ্বেষ জন্মাল তরুণ ভিটো কর্লিয়নির মনে। ভয়ঙ্কর রাগে বিস্ফোরনোন্মুখ হয়ে। আছে তাঁর শরীর, কিন্তু ভাষায় বা চেহারায় কিছুই তিনি প্রকাশ করলেন না, শুধু একটা সুযোগের অপেক্ষায় থাকলেন। একটা চাকরি পেলেন তিনি রেল পথে, কিন্তু সেটাও কয়েক মাসের বেশি টিকল না। যুদ্ধের শেষে চাকরির বাজার এখন সাংঘাতিক মন্দা, মাসের মধ্যে আজকাল মাত্র কয়েকদিন কাজ হয়, প্রায় পুরো মাসই বেকার বসে থাকেন। যে কদিন কাজ হয়, তাও সুখের সাথে করার উপায় নেই। ফোরম্যানরা বেশিরভাগই হয় আমেরিকান নয়তো আইরিশ, শ্রমিকদেরকে তারা অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করে। ভাবলেশহীন পাথরের মত মুখ করে থাকেন ভিটো, যেন এ-সব গালমন্দের অর্থ কিছুই তিনি বুঝতে পারছেন না। আসলে ইংরেজি বলার মধ্যে একটু টান থাকলেও ভাষাটা তিনি বেশ ভালই বুঝতে পারেন।
একদিন সন্ধ্যাবেলার ঘটনা। স্ত্রী আর ছেলেদের নিয়ে খেতে বসেছেন ভিটো, এই সময় একটা টোকা পড়ল জানালায়। জানালার বাইরে বাতাস চলাচলের জন্যে ছোট্ট একটা প্যাসেজ আছে, প্যাসেজের ওপারে অন্য একটি বাড়ির দেয়াল, দেয়ালের গায়ে একটা জানালা ॥ পর্দা সরিয়ে প্যাসেজে তাকালেন ভিটো, দেখলেন পাশের বাড়ির জানালা দিয়ে ঘাড়-মাথা বের করে বাইরের দিকে ঝুঁকে রয়েছে যুবক পিটার ক্লেমেঞ্জা, তার হাতে সাদা কাপড়ে মোড়া একটা প্যাকেট দেখা যাচ্ছে, সেটা সে বাড়িয়ে ধরে আছে সামনের দিকে।
এই যে, দেশী ভাই, ভিটোকে পর্দা সরিয়ে উঁকি দিতে দেখেই বলল ক্লেমেঞ্জা, তোমার জিম্মায় রাখতে পারবে এটা, আবার যখন চাইব, ফিরিয়ে দেবে? ধরো, তাড়াতাড়ি করো।
ঝোঁকের মাথায়, ভাল মন্দ কিছু না ভেবেই যন্ত্রচালিতের মত হাত বাড়িয়ে জিনিসটা নিলেন ভিটো। তবে, ক্লেমেঞ্জার চেহারায় উদ্বেগ আর দুশ্চিন্তা দেখতে পেয়েছেন তিনি, তাকে সাহায্য করার ঝোঁকটা সেজন্যেই চাপল। প্যাকেটটা কিচেনে নিয়ে এসে খুললেন তিনি। চুপটি করে শুয়ে রয়েছে কয়েকটি ভাল মানুষের ছা, তেল চকচকে তিনটে পিস্তল। বেডরূমের আলমারিতে তুলে রাখলেন ওগুলো তিনি, এরপর কি হয় দেখার জন্যে অপেক্ষা করে আছেন। খানিক পরেই জানতে পারলেন, পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে ক্লেমেঞ্জাকে। ভিটো বুঝলেন, ক্লেমেঞ্জা যখন মোড়কটা পাচার করে দিচ্ছিল, নিশ্চয়ই পুলিশ তখন তার দরজায় লাথি মারছিল।
এ-বিষয়ে একটা কথাও বললেন ন ভিটো। আর তাঁর স্ত্রী তো ভয়েই কারও কাছে দুঠোঁট আলগা করেননি, স্বামীকেও যদি ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। দুদিন পরই আবার পাশের বাড়িতে উদয় হলো পিটার ক্লেমেঞ্জা, এ-কথা সে-কথার মাঝখানে সহজ ভাবে একবার জানতে চাইল সে, আমার সেই প্যাকেটটা এখনও রেখেছ তোমার কাছে?
মাথা নাড়লেন ভিটো। কম কথার মানুষ তিনি। ক্লেমেঞ্জাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে এসে তাকে এক গ্লাস মদ খেতে দিলেন। তারপর বেডরূমের আলমারি থেকে প্যাকেটটা বের করে এনে নিঃশব্দে ধরিয়ে দিলেন তার হাতে।
মদের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে ক্লেমেঞ্জা, মুখের গড়ন, ভারি হলেও, অদ্ভুত একটা ভালমানুষির ছাপ ফুটে আছে চেহারায়, কিন্তু চোখের দৃষ্টিতে প্রখর সতর্কতা-খুব মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করছে ভিটো কর্লিয়নিকে। খুলে দেখেছ? সংক্ষেপে জানতে চাইল সে।
চেহারায় গাম্ভীর্য এতটুকু না ভেঙে এদিক ওদিক মাথা দোলালেন ভিটো, বললেন, কারও ব্যক্তিগত ব্যাপারে আমি নাক গলাই না।
সন্ধ্যাটা ভিটো কর্লিয়নির সাথে মদ খেয়ে কাটাল ক্লেমেঞ্জা । প্রায় কোন কথাবার্তা ছাড়াই ওদের মধ্যে একটা সদ্ভাব গড়ে উঠল, ভাল লেগে গেল পরস্পরকে। এর একটু পর গল্প শুরু করল ক্লেমেঞ্জা। গল্প বলিয়ে হিসেবে জুড়ি নেই তার। আর কম কথার মানুষ ভিটো কর্লিয়নি ভালবাসেন গল্প শুনতে নিঃশব্দে একটা বন্ধুত্ব গড়ে উঠল ওদের মধ্যে।
