নিজের শুভ বুদ্ধির সাথে পরামর্শ করে দেখলেন ভিটো কর্লিয়নি। বুঝলেন, ওদের দলে যোগ দেয়া চলে না, সেটাই সুবুদ্ধির কাজ হবে। কিন্তু, এই প্রথম শুভ বুদ্ধির পরামর্শ অমান্য করে ওদের দলে যোগ দেবার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। চিন্তা ভাবনা করতে গিয়ে একটা যুক্তির বিরুদ্ধে তিনি কোন সদুত্তর খুঁজে পেলেন না। তা হলো, এই একটা কাজের জন্যে তাঁর হাতে আসবে হাজার ডলার। এত মোটা অঙ্কের টাকা যেচে পড়ে আসতে চাইছে, কোন যুক্তিতে সেটাকে ফিরিয়ে দেবেন। তিনি, বিশেষ করে না খেতে পেয়ে পরিবারের সবাই যখন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে? কিন্তু তরুণ সঙ্গীদের মধ্যে ক্ষতিকর ছটফটে ভাব লক্ষ করছেন তিনি, কাজের ধারা বড় বেশি এলোমেলো, লুটের মাল বিলি করার পদ্ধতিতে খুব বেশি ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। গোটা পরিকল্পনায় নিপুণ কৌশল আর যত্নের অভাব রয়েছে। এত ত্রুটি-বিচ্যুতি ঠিক মেনে নিতে পারছেন না তিনি। তবে সঙ্গী দুজনকে তাঁর সৎ আর নির্ভরযোগ্য বলে মনে হচ্ছে। এই অল্প বয়সেই পিটার ক্লেমেঞ্জার চেহারায় রাশভারি একটা ভাব, ভরসা রাখা যায়। আর একহারা, তীক্ষ্ণ চেহারায় টেসিওর আত্মবিশ্বাস দেখে উৎসাহ পাওয়া যায়।
কোন বিঘ্ন ছাড়াই নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হলো কাজটা। পিস্তল দেখাতেই টু-শব্দটি করে নিচে নেমে এল ট্রাক ড্রাইভার। এখনও মনের কোথাও ভয়ের একটু ছোঁয়া পর্যন্ত অনুভব করছেন না লক্ষ করে নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছেন ভিটো কর্লিয়নি। মাথা ঠাণ্ডা রেখে সমস্ত কাজ সুচারুভাবে সম্পন্ন করে ক্লেমেঞ্জা আর টেসিও তাকে যথেষ্ট প্রভাবিত করল। ওরা ঘাবড়ানো তো দুরের কথা, একটু উত্তেজিত পর্যন্ত হয়নি। কেউ। বরং, হাস্য রসিকতা করে ট্রাক ড্রাইভারকে বলল, সে যদি ভালমানুষ সেজে থাকে তাহলে তার বউকে কয়েক জোড়া পোশাক উপহার হিসেবে পাঠিয়ে দেয়া যেতে পারে।
বাড়ি বাড়ি ফেরি করে লুটের পোশাক বিক্রি করা বুদ্ধিমানের কাজ নয় ভেবে নিজের ভাগের সবটাই তিনি একজন চোরাকারবারীর হাতে তুলে দিলেন, এতে তার লাভ হলো খুবই কম, মাত্র সাতশো ডলার পেলেন। কিন্তু উনিশশো উনিশ সালে সাতশো ডলার মেলা টাকা।
পরদিনই রাস্তায় তার পথ আটকালো একজন লোক। পরনে ঘিয়ে রঙের সুট, মাথায় সাদা ফিডরা টুপি, চেহারাটা হিংস্র। তার চিবুকের নিচে গলার উপর, এ-কান থেকে ও-কান পর্যন্ত গোল ফঁসের মত সাদা একটা দাগ, সেটা, ঢেকে রাখার কোন চেষ্টাই নেই। চকচকে কালো রঙের ভুরু জোড়া চওড়া আর ঘন! চেহারাটা রুক্ষ, কর্কশ হলেও হাসলে তাকে বিনয়ের অবতার আর সাংঘাতিক অমায়িক বলে মনে হয়। হাসছে ফানুচি। কিন্তু ভিটো কর্লিয়নি চুপচাপ। রাগ, বিস্ময় বা ভয়ের কোন ভাবই দেখা যাচ্ছে না তার চেহারায়,
কথার সুরে খুব বেশি সিসিলীয় টান ফানুচির। আরে থামো থামো, তোমাকেই তো খুঁজছি আমি, লোকমুখে শুনছি তুমি নাকি বিরাট ধনী বনে গেছ। তুমি একা নও, তোমার সাথের মিতারাও নাকি প্রচুর মালপানি কামিয়েছে। কথাটা সত্যি নাকি? উত্তরের অপেক্ষায় না থেকেই বলে চলল ফানুচি, তা, তোমার কি মনে হয় না, আমাকে তোমরা ছোটলোকের মত ঠকাচ্ছ? ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করছ। আমাকে? জানোই তো, এটা আমার এলাকা, সুতরাং আমাকেও একটু ঠোঁট ভেজাতে দেয়া উচিত ছিল। মাফিয়াদের পূরানো একটা প্রবাদ আওড়াল ফানুচি, কথাটায় পিটসু শব্দটা রয়েছে, মানে হলো ক্যানারি বা ওই জাতের ছোট পাখির ঠোঁট। সোজা কথায় লুটের মালের ভাগ চাইছে ফানুচি।
নিজের স্বভাব বজায় রাখলেন ভিটো, ফানুচি থামতেও কোন উত্তর করলেন না। দাবির ইঙ্গিতটা সাথে সাথেই টের পেয়েছেন কিন্তু স্পষ্ট দাবির জন্যে অপেক্ষা করছেন তিনি।
নিঃশব্দে হাসল ফানুচি, সোনা দিয়ে বাঁধানো সঁতটা বেরিয়ে পড়ল তার, সেই সাথে ফাঁসের মত গলার সাদা দাগটায় টান পড়ল, শুকনো ক্ষতটা তাতে এঁটে বসল মুখের চারদিকে। রুমাল দিয়ে মুখ মুছে নিচ্ছে, হাসছে এখনও, ভিটোর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ধীরে সুস্থে খুলছে কোটের বোতাম, উদ্দেশ্য ঢিলেঢালা ট্রাউজারের কোমরে গোজা পিস্তলটা দেখানো। আমাকে অপমান করেছ তুমি, তবে সে-কথা আমি ভুলে যাব, আমাকে শুধু পাঁচশো ডলার দিতে হবে। কি জানো, আমার মত মানুষদেরকে আজকালের ছেলেরা শ্রদ্ধা করতে শেখেনি, তাতে নিজেরাই শেষ পর্যন্ত বিপদে পড়ে যায়। অথচ কিভাবে শ্রদ্ধা জানাতে হয়, তা যদি একবার শিখে নিতে পারে, সব দিক থেকেই লাভ হয় তাদের, কোন ঝামেলায়, পড়তে হয় না।
এই প্রথম ফানুচির চোখে চোখ রেখে নিঃশব্দে হাসলেন ভিটো কর্লিয়নি। এখনও তিনি অল্পবয়েসী, তরুণ, রক্ত ঝরাতে শেখেননি, কিন্তু তার হাসির মধ্যে এমন একটা অদ্ভুত ঠাণ্ডা অথচ ভীতিকর ভাব রয়েছে যা দেখে ফানুচির মত খুনীর বুকটাও কেমন যেন দুলে উঠল। আবার মুখ খোলার আগে খানিক ইতস্তত করল সে, তারপর। বলল, টাকা দেয়া না দেয়া তোমার ইচ্ছা। তবে না দিলে তোমার বাড়িতে পুলিশ আসতে পারে। তোমার স্ত্রী আর ছেলেরা হয়তো বিপাকে পড়বে, পথে দাঁড়াব। তাই চাও তুমি? ভেবে দেখো। অবশ্য তোমার লাভের অংকটা যদি ভুল শুনে থাকি, কথা দিচ্ছি, ঠোঁটটা তাহলে আরও একটু কম ভোবাব। তাই বলে ভেব না তিনশোর কমে রাজি হব আমি। আর, মনে রেখো, কেউ যদি আমাকে ঠকাতে চেষ্টা করে, ভীষণ রেগে যাই আমি।
