নতুন দেশে এসে জন্মস্থানের সাথে একটা সম্পর্ক জিইয়ে রাখার জন্যে ভিটো নিজের নাম বদলে পদবী হিসেবে বেছে নিলেন কর্লিয়নি শব্দটা। ভাবাবেগের পরিচয় জীবনে তিনি খুব কমই দিয়েছেন, এটা তার একটা।
উনিশ শতকের শেষ ভাগ এটা, দুটো সরকার চালু রয়েছে সিসিলিতে, তার মধ্যে একটা হলো মাফিয়া। রোমের বৈধ সরকারের চেয়ে মাফিয়াদের প্রতাপ আর ক্ষমতা অনেক বেশি, কোন উপায় নেই দেখে রোমের শাসনকর্তারা মাফিয়াদেরকে একরকম মেনেই নিয়েছে। কি একটা ব্যাপারে একজন গ্রামবাসীর সাথে ঝগড়া বাধল ভিটো আন্দোলিনির বাবার, সুবিচার পাবার আশায় তিনি মাফিয়া সরকারের শরণাপন্ন হলেন। মাফিয়া সরকার তাঁকে এমন সব কথা বলল যা তিনি মেনে নিতে পারলেন না, ফলে প্রকাশ্যে একটা মারপিট বেঁধে গেল, এবং এর পরিণতিতে খুন হয়ে গেল মাফিয়া সরকারের নেতাটি। এরপর এক হপ্তাও কাটল না, লুপারা বন্দুকের গুলিতে ঝাঁঝরা অবস্থায় পাওয়া গেল ভিটোর বাবার মৃতদেহ। এই ঘটনার এক মাস পর সশস্ত্র মাফিয়া গুণ্ডারা ছেলেমানুষ ভিটোকে খুঁজতে এল। হঠাৎ করে যেন তারা বুঝতে পেরেছে, এই ছোকরা কদিন পরই সাবালক হয়ে উঠবে, আর বাপকে খুন করার প্রতিশোধ নিতে ছাড়বে না।
আমেরিকায় এসে আবান্দাণ্ডোর বাড়িতে আশ্রয় নিলেন ভিটো (পরে তিনি ডন হলে এই আবানদাণ্ডোর.ছেলেই তার কনসিলিয়রি হয়েছিল)। নিউ ইয়র্কের হেলস কিচেনের নাইনথ এভিনিউয়ে একটা মুদি দোকান আছে আবানদাণ্ডোর, সেখানেই চাকরি পেলেন তিনি। আঠারো বছর বয়সে বিয়ে করেন তিনি, সদ্য সিসিলি থেকে আসা এক মোড়শীকে। রান্নার হাতটা খুব মিষ্টি তার, ঘরকন্নার কাজ আর কাজকর্মেও খুব পটু। থার্টি-ফিফথ স্ট্রীটের কাছাকাছি টেন এভিনিউয়ে সস্তায় একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে সেখানে ওঁরা সংসার পাতলেন। দুবছর পর প্রথম সন্তানের মুখ দেখলেন ওঁরা। একটা ছেলে। বাপৈর খুব ন্যাওটা, তাই সবাই তাকে সনি বলে ডাকে।
ওদের এই পাড়াতেই ফানুচি নামে এক লোক থাকে। সেও, একজন ইতালীয়, মডের মত শক্তিশালী, চেহারায় অদ্ভুত একটা হিংস্রতার ছাপ। তার সবগুলো সার্টই খুর দামী আর ফিকে রঙের, মাথায় থাকে সব সময় ঘিয়ে রঙের ফিডরা টুপি। সবাই বলে, সে নাকি কালো হাত দলের লোক। কালো হাত মাফিয়াদেরই একটা উপদল, হুমকি দিয়ে, মারধরের ভয় দেখিয়ে গৃহস্থ আর দোকানদারদের কাছ থেকে টাকা আদায় করাই এদের পেশা। কিন্তু এই অঞ্চলের লোকেরাও বেপরোয়া টাইপের। তারা নিজেরাও নানান হিংসাত্মক কাজ করে। তাই তাদের সাথে লেগে খুব একটা সুবিধে করতে পারে না ফানুচি। কয়েকজন বুড়ো-বুড়ি, যাদের কোন যুবক ছেলে নেই মা-বাপকে রক্ষা করে, এদের উপরই যত অন্যায় অত্যাচার আর চোটপার্ট দেখিয়ে বেড়ায় সে। খামোকা ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ে ব্যবসার ক্ষতি করতে চায় না বলে দোকানদাররাও সামান্য কিছু টাকা দেয় তাকে। ওদিকে, তার পেশার আরেকটা দিক হলো, চোরের উপর বাটপাডি করা। কিছু লোক বেআইনী ভাবে ইতালীয় লটারীর টিকিট বিক্রি করে, কিছু লোক নিজেদের বাড়িতে জুয়ার আজ্ঞা বসায়, এদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করে সে। মুদি দোকানদার আবানদাণ্ডোও সামান্য কিছু টাকা দেয় তাকে, তবে এ-ব্যাপারে তার ছেলে গেনকোর প্রবল আপত্তি আছে। ফানুচিকে একদিন দেখে নেবে সে, প্রায়ই কথাটা শোনায় বাপকে। ছেলেকে এসব ব্যাপারে জড়িয়ে পড়তে নিষেধ করেন আবানদাণ্ডো। আর ভিটো কর্লিয়নি সবই লক্ষ করেন, কিন্তু তার মুখের ভাব দেখে কিছু বোঝা যায় না, কাউকে তিনি কিছু বলেনও না।
এর মধ্যে একদিন হলো কি, গ্রামেরই তিন ছোকরা কি কারণে কে জানে, ঝাঁপিয়ে পড়ল ফানুচির উপর। ফানুচির এ কান থেকে ও-কান পর্যন্ত চিরে দিল ছুরি দিয়ে। ক্ষতটা লম্বা হলো বটে, কিন্তু গম্ভীর হলো না মোটেও। ফানুচি বেঁচে গেল। কিন্তু সাংঘাতিক ভয় পেল সে, রক্তক্ষরণও হলো প্রচুর। আততায়ীদের কাছ থেকে পালাচ্ছে ফানুচি, কাছেপিঠে ছিলেন বলে দৃশ্যটা দেখতে পেলেন ভিটো। দেখলেন, খেচে দৌড়াচ্ছে ফানুচি, বিশেষ রঙের ফিডরা টুপিটা নিজের বুকের কাছে ধরে আছে, যাতে রক্ত লেগে সুটের কোন ক্ষতি না হয় বা লজ্জাস্কর কোন দাগ কোথাও দেখা না যায়। ঝর ঝর করে ঝরছে রক্ত, কিন্তু একটা ফোঁটাও টুপির বাইরে পড়তে দেখলেন না ভিটো। দৃশ্যটা জীবনে কখনও ভুলবেন না তিনি।
হামলার শিকার হলো বটে ফানুচি, কিন্তু ব্যাপারটা তার জন্যে শাপে বর হয়ে দেখা দিল। ছোকরা তিনজন শক্তিশালী বেপরোয়া টাইপের হলেও খুন-খারাবিতে এখনও নাম লেখায়নি। ফানুচিকে.একটু শিক্ষা দেয়া ছাড়া আর কোন উদ্দেশ্য ছিল না তাদের, ভবিষ্যতে ফানুচি।যাতে চোরের উপর বাটপাড়ি করতে সাহস না পায়। কিন্তু এই হামলার শিকার হয়ে ফানুচির আসল চেহারা বেরিয়ে পড়ল, সে যে আসলেই একটা খুনী এবার তা প্রমাণিত হয়ে গেল। যে ছেলেটা ওর গালে চুরি চালিয়েছিল, কে যেন তাকে মেরে ফেলল গুলি করে। বাকি ছেলে দুটোর আত্মীয়স্বজনরা ফানুচিকে মোটা টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়ে ওদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি চেয়ে নিল। এরপর স্বভাবতই দর্শনীর হার বাড়িয়ে দিল ফানুচি, সেই সাথে একটা জুয়ার আড্ডাখানার অংশীদার বনে গেল। এসবের সাথে কোন ভাবেই কোন সম্পর্ক ছিল না কর্লিয়নির, যা ঘটে গেছে তাতে কিছুই এসে যায় না তার, সুতরাং গোটা ব্যাপারটা সাথে সাথে ভুলে গেলেন তিনি।
