অসম্ভব। আপাতত তাঁর সাথে কেউ কথা বলতে পারবে না। এখনও গুরুতর অসুস্থ তিনি। একটু চিন্তা করে আবার বলল হেগেন, ঝামেলাটা কিভাবে চুকিয়ে দেয়া যায় সে ব্যাপারে আমি সনির সাথে কথা বলব। টাকা দিতে নিষেধ করার সিদ্ধান্তটা আমি নিজেই নিচ্ছি। হারামজাদা চালবাজি শিখেছে। আমার সিদ্ধান্তের কোন পরিবর্তন হলে তুমি জানতে পারবে।
ফোনের রিসিভার নামিয়ে রাখল জনি, বিরক্তি আর দুশ্চিন্তায় মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে ওর। ইউনিয়নের সাথে ঝগড়া করতে যাওয়া মানে গোছা গোছা টাকা পকেট থেকে বেরিয়ে যাওয়া। শুধু তাই নয়, কাজকর্ম সব পণ্ড হয়ে যাবে। চিন্তা করে দেখল গোপনে টাকাটা গফকে দিয়ে দিলে কেমন হয়? ডন তো আর নিজের মুখে তাকে নির্দেশ দিচ্ছেন না। গুরুত্বের বিচারেডন আর হেগেনের কথার মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য। তবু, অনেক ভেবেচিন্তে কয়েকটা দিন অপেক্ষা করে দেখবে বলে স্থির করল জনি।
অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেয়ায় নগদ পঞ্চাশ হাজার ডলার বেঁচে গেল ওর। হেগেনের সাথে কথা বলার দুই রাত পর গ্লেনডেলে নিজের বাড়িতে বুলেট বিদ্ধ মৃতদেহ পাওয়া গেল বিলি গফের। এরপর আর ইউনিয়নের সাথে কোনরকম। গোলমালের কথা শোনা যায়নি। তবে, খুনটার ব্যাপারে বেশ একটু বিচলিত হয়ে পড়ল জনি। ডনের দীর্ঘ বাহু এই প্রথম জনির এত কাছাকাছি এমন নির্দয় ভাবে আঘাত হানল।
সময়ের সাথে সাথে কাজে আরও বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ছে জনি। চিত্রনাট্য তৈরি করা, এক একটা চরিত্রের জন্যে পছন্দসই নারী-পুরুষ বাছাই করা, এই রকম প্রযোজনার হাজারটা দিক সামলানো, দম ফেলার ফুরসত নেই ওর। এই ব্যস্ততার মধ্যে কখন যে নিজের গলার কথা, গান গাইতে না পারার কথা ভুলে গেছে তা ও নিজেই জানে না। এর মধ্যে একাডেমি পুরস্কারের প্রতিযোগীদের নামের তালিকা বেরিয়ে গেল, তাতে নিজের নামও দেখল জনি, কিন্তু অস্কার পাবার জন্যে যেসব গান বিবেচনা করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে সেগুলোর একটাও ওকে অনুষ্ঠানে গাইতে বলা হয়নি দেখে মনটা সাংঘাতিক দমে গেল ওর। অথচ টেলিভিশনের মাধ্যমে সারা দেশে দেখানো হবে অনুষ্ঠানটা। তবু মন থেকে এসব উদ্বেগ ঝেড়ে ফেলে দিয়ে। আবার কাজে ডুবে গেল জনি। বুঝল, ওর গড ফাদার তার প্রভাব খাটাতে পারবেন। না, সুতরাং একাডেমি পুরস্কার পাবার আশা করে লাভ নেই। তবে তালিকাতে যে। ওর নাম আছে তারও একটা মূল্য আছে, এই ভেবে, কিছুটা সান্ত্বনা পেতে চেষ্টা করল ও।
ইতালীয় গানের যে রেকর্ডটা করেছে নিনোর সাথে, সেটা ইদানীংকার করা ওর সবগুলো রেকর্ডের চেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু আর কেউ না জানুক, ও খুব ভাল করেই জানে যে এর বেশিরভাগ কৃতিত্ব নিনোর। পেশাদার গায়ক হিসেবে ওর আর কোন সম্ভাবনা নেই, মনে মনে এটা মেনে নিয়েছে সে।
হপ্তায় একটা দিন জিনি আর মেয়েদের সাথে বসে ডিনার খায় জনি। কাজের চাপ যতই থাক, এই নিয়মের ব্যতিক্রম হয় না কখনও। তবে জিনির সাথে শোয় না। এর মধ্যে মেক্সিকোতে গিয়ে একটা ডিভোর্স আদায় করে নিয়েছে ওর দ্বিতীয় স্ত্রী, তার মানে জনি এখন ঝাড়া হাত-পা। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও হবু তারকাদের সাথে প্রেম করার জন্য লালায়িত হয়ে উঠছে না ও। তার একটা কারণ, চিরকালই একটু উন্নাসিক টাইপের মানুষ ও। তবে, মনে পুষে রাখা একটা দুঃখও আছে ওরকমবয়েসী তারকারা, আর এখনও চূড়ায় অবস্থানরতা নায়িকারা ওর প্রেমে জড়িয়ে পড়ে না। প্রায় রোজ রাতেই বাড়ি ফিরে আসে একা, রেকর্ড প্লেয়ারে নিজের একটা পুরানো রেকর্ড চাপায়, হাতে থাকে গ্লাসভর্তি হুইস্কি, গানের সাথে গলা মিলিয়ে গুন গুন করে। নিজের গান শুনে বুঝতে পারে, ভাল, সত্যি খুব ভাল গাইত ও। এত ভাল গায় তা তখন বোঝেনি। ওর নিজের বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত কণ্ঠস্বরের কথা বাদ দিলেও- ভাল গলা তো অনেকেরই থাকতে পারে-সত্যি আশ্চর্য ভাল গাইত ও। যাকে বলে সত্যিকার একজন খাঁটি শিল্পী, ও ছিল তাই। অথচ ওর নিজেরই জানা ছিল না কথাটা। গান গাইতে ভালবাসত ও। কতটা ভালবাসত তাও তখন বুঝত না। সিগারেট ফুকে, মেয়েমানুষ নিয়ে ফুর্তি করে, আর মদ গিলে নিজেই নিজের গুলার বারোটা বাজিয়েছে, ঠিক যখন সমস্ত ব্যাপারটা উপলব্ধি করতে শুরু করেছিল।
দুএক ঢোঁক মদ খাবার জন্যে মাঝেমধ্যে ওর কাছে আসে নিনো, পুরানো গানগুলো মন দিয়ে শোনে সেও, আর জনি তাকে তাচ্ছিল্যের সুরে বলে, শোন, ব্যাটা গেয়ো ভূত, অমন গান তুই তোর বাপের জন্যেও গাসনি।
আর নিনোও তার সেই অদ্ভুত মধুর রহস্যমাখা হাসিটা সারা মুখে ছড়িয়ে দিয়ে বলে, নারে, গাইনি–গাইবও না কোন দিন। বলার ভঙ্গিতে থাকে সহানুভূতির সুর, জনি কি ভাবছে তা যেন বুঝতে পারছে সে।
অবশেষে নতুন ছবির শুটিং শুরু হবার হপ্তাখানেক আগে একাডেমি পুরস্কার বিতরণের রাত এসে গেল। অনুষ্ঠানে যোগ দিতে নিনোকে নিমন্ত্রণ করল জনি। নিনো সোজা প্রত্যাখ্যান করল।
দোস্ত, তোর কাছ থেকে কখনও কোন উপকার চাইনি আমি, বলল জনি, সত্যি কিনা বল? আজ চাইছি, আমার একটা উপকার কর, আয় আমার সাথে। আমি পুরস্কারটা না পেলে, তুই ছাড়া আমার জন্য আর কেউ দুঃখ করার নেই রে!
