কথাটা ভেবে দেখল জনি। ওর মনে হলো, তার গড ফাদারের মত বুদ্ধিমান মানুষ দুনিয়ায় বোধ, হয় আর একজনও নেই। দেখে, উনি ঠিকই টের পেয়েছেন, গুণ্ডামি-পাণ্ডামি আর বেআইনী কাজ নিনোকে দিয়ে চলবে না। হয় বোকার মত বিপদে পড়ে যাবে, তা নাহলে কেউ মেরেই ফেলবে। আবোল-তাবোল কথা বলে হারিয়ে বসবে পৈত্রিক প্রাণ। কিন্তু, আশ্চর্যের বিষয় হলো, নিনো যে শিল্পী হবে তা ৬ন জানলেন কিভাবে? কারণ, দুত্তোর ছাই, ডন আগেই বুঝতে পেরেছিলেন একদিন না একদিন, নিনোকে আমি সাহায্য করবই। কিন্তু বুঝলেন কিভাবে? বুঝলেন, ভেবে রেখেছিলেন, সময় মত তার মনের ইচ্ছাটা একদিন আমার কানে একটু তুলে দেবেন, আর আমিও তার প্রতি শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতাবশত নিনোর জন্যে চেষ্টা করব। তবে, স্পষ্টভাবে কোন দিনই আমাকে তিনি কিছু করতে বলেননি। এ বিষয়েও শুধু সামান্য একটু আভাস দিয়ে রেখেছিলেন, কাজটা করলে তিনি খুব খুশি হবেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল জনি ফন্টেন। তার গড ফাদার নিজেই এখন আহত, মৃত্যুর সাথে লড়াই করছেন, সুতরাং একাডেমি পুরস্কারের আশাটা তার ছেড়ে দেয়াই ভাল। ওদিকে, ওর বিরুদ্ধে লেগে আছে ওলটস, কারও কাছ থেকে কোন সাহায্য পাবে সেই আশা নেই। একান্ত ব্যক্তিগত যোগাযোগ একমাত্র ডন কর্লিয়নিরই আছে, যার জোরে চাপ দিয়ে দিনকে রাত করা যায়। কর্লিয়নি পরিবারের অন্যান্যদের-খেয়েদেয়ে কাজ নেই, তার জন্যে এতসব ঝামেলা পোহাতে যাবে।. নিজের সাধ্যমত ওদেরকে সাহায্য করতে চেয়েছে জনি, কিন্তু এক কথায় তা প্রত্যাখ্যান করেছে টম হেগেন।
নিজের ছবি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে জনি। বেস্টসেলারের লেখক তার নতুন উপন্যাস শেষ করেছেন, জনির আহ্বানে চলে এসেছেন পশ্চিমে। আসার কারণ, এজেন্ট বা স্টুডিওগুলো যাতে বাগড়া দিতে না পারে, নিরিবিলিতে বসে দুজন কথা বলতে চায় ওরা। ঠিক যে ধরনের চাইছে জনি, এই বইটা ঠিক সেই ধরনের। একটা গানও গাইতে হবে না তাকে। সাহস, শক্তি আর পৌরুষ নিয়ে ধুমধাড়াক্কা মার্কা ছবির গল্প, রুক্ষ মেজাজের, কাহিনীর প্রয়োজনে প্রচুর মেয়েমানুষ আর দেদার যৌনতা আমদানি করার অবকাশ আছে। শুধু তাই নয়, গল্পটায় এমন একটা চরিত্র আছে যেটা ঠিক যেন হুবহু নিনোর জন্যেই তৈরিচরিত্রটার কথাবার্তা, আচরণ, কাজকর্ম, এমন কি চেহারা-সুরত পর্যন্ত নিনোর সাথে পুরোপুরি মিলে যায়। সন্দেহ নেই, ব্যাপারটা ভূতুড়ে। অভিনয়ই করতে হবে না নিনোকে, ক্যামেরার সামনে শুধু ওর নিজের মত করে চলাফেরা করতে হবে।
হাতের কাজ দ্রুত সারছে জনি। কাজে নেমে আবিষ্কার করল, প্রযোজনা সম্পর্কে তার নিজের যেটুকু ধারণা আছে বলে ভাবত সে তার চেয়ে অনেক বেশি জানে সে। তবু একজন নির্বাহী প্রযোজককে চাকরি দিল। লোকটা ব্ল্যাকলিস্টে আছে, তাই কোথাও চাকরি পাচ্ছিল না, কিন্তু এ-কাজে অসাধারণ দক্ষতা রয়েছে তার। তার এই দুর্বলতার কোন সুযোগ নিল না জনি, ন্যায্য বেতনই দিচ্ছে তাকে। পরিষ্কার বলেও দিয়েছে, তোমাকে আমি ঠকাচ্ছি না, তাই আশা করছি অনেক কাজে খরচ বাঁচিয়ে-দেবে তুমি আমার।
সেই প্রযোজকই একদিন এসে জনিকে বলল, ইউনিয়নের প্রতিনিধিকে ঘুষ দিতে হবে, পঞ্চাশ হাজার ডলার দাও। আশ্চর্য হয়ে গেল জনি। খরচ কমানো দূরের কথা, এ-লোক তো খরচ বাড়ার পায়তারা করছে। লোকটা ওকে জানান, ওভার-টাইম, কর্মী নিয়োগ ইত্যাদি বিষয়ে নাকি নানান সমস্যা দেখা দিয়েছে, টাকাটা দিলে অনেক উটকো মেলা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব। ব্যাপারটা ঠিক বিশ্বাস করতে পারল না জনি, তার সন্দেহ হলো প্রযোজক ধোকা দিয়ে টাকাটা খসাতে চাইছে ওর কাছ থেকে। তাকে বলল ও, তুমি বরং ইউনিয়নের লোকটাকে পাঠিয়ে দাও আমার কাছে।
ইউনিয়ন প্রতিনিধির নাম বিলি গফ। জনির সাথে এসে দেখা করতে দেরি করল না সে।
আমি যতদূর জানি, তাকে বলল জনি, ইউনিয়ন যাতে কোন ঝামেলা বাধাতে না পারে তার ব্যবস্থা করে রেখেছে আমার বন্ধুরা। আমাকে জানানো হয়েছে, এ বিষয়ে চিন্তা করতে হবে না। সব ঠিক থাকবে।
কে জানিয়েছে কথাটা? প্রশ্ন করুল গফ।
কে জানিয়েছে তা তুমি ভাল করেই জানো, বলল জনি। তার নাম উচ্চারণ করার দরকার নেই, কিন্তু তিনি যা বলেন তাই হয়; তাঁর কথা কখনও অনাথা হয় না।
কিন্তু আগের অবস্থা আর-নেই, সব ওলটপালট হয়ে গেছে, বলল গফ। তোমার শুভাকাঙ্ক্ষী নিজেই বিপদে পড়েছে, এই দূর পশ্চিমে তার কথা আর খাটবে না।
শ্রাগ করল জনি, বলল, ঠিক আছে, তুমি দুদিন পর দেখা করো আমার সাথে, কেমন?
নিঃশব্দে হাসল গফ। অবশ্যই দেখা করব, জনি, বলল সে। তবে, যদি মনে করে থাকো নিউ ইয়র্কের সাথে যোগাযোগ করে সুবিধে করতে পারবে, মস্ত ভুল করবে তুমি!
কিন্তু নিউ ইয়র্কের সাথে যোগাযোগ করে ভুল করেনি জনি, বরং মস্ত সুবিধে হয়ে গেল তার। হেগেনের সাথে তার অফিসের ফোনে কথা হলো। স্পষ্ট জানিয়ে দিল হেগেন, খবরদার, কোনমতেই টাকা দেবে না ওকে। সব শেষে বলল, বেজন্মাটাকে টাকা দিলে তোমার গড ফাদার ভীষণ রাগ করবেন। টাকা দিলে তার অসম্মান করা হবে, আর এই মুহূর্তে সম্মান হারালে মস্ত ক্ষতি হয়ে যাবে তাঁর।
আমি কি গড ফাদারের সাথে কথা বলতে পারি? জানতে চাইল জনি। নাকি তুমিই আলাপ করবে? আসলে ছবির কাজ শুরু করতে আমি আর দেরি করতে চাইছি না।
