পার্টিতে অল্পবয়েসী, অপেক্ষাকৃত ছোট তারকাদের প্রবেশাধিকার নেই, অন্তত কৌশলে তাদেরকে নিরুৎসাহিত করা হয়ে থাকে। আভাসে ইঙ্গিতে নিষেধ করা হলেও, প্রায় সবাই সেটার অর্থ বুঝতে পারে।
ছবি দেখানো হয় গভীর রাতে। এগারোটায় পৌঁছুল ওরা, জনি আর নিনো। দামী পোশাক পরে ফিটফাট বাবু সেজে আছে রক ম্যাক এলরয়, প্রথম দর্শনেই ভাল লেগে যায়। জনিকে দেখে অবাক তো হলোই, আন্তরিক আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল, আমি কি ভুল দেখছি? এখানে কি করছ তুমি?
তার সাথে হ্যাণ্ডশেক করে বলল জনি, নিনো, আমার দেশী বন্ধু, আচ্ছাগুলো দেখাবার জন্যে সাথে নিয়ে বেরিয়েছি।
নিনোর সাথে হ্যান্ডশেক করল ম্যাক এলরয়, তারপর খুঁটিয়ে দেখে নিয়ে মন্তব্য করল, একে ওরা জ্যান্ত, কাঁচা খেয়ে ফেলবে। ওদেরকে পথ দেখিয়ে বাড়ির পিছন দিকে পৌঁছে দিল সে।
পিছনের চাতালে পাশাপাশি কয়েকটা বড় আকারের কামরা, প্রত্যেকটি কামরার প্রকাণ্ড কাঁচের দরজার সামনে একটা করে বাগান আর স্বচ্ছ পানিতে টইটুম্বুর পুকুর। চাতালে প্রায় শখানেক লোক ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে, তাদের সবার হারে মদের গ্লাস। পুরো এলাকাটা এমন কৌশলে আলোকিত করে রাখা হয়েছে যাতে মেয়েদের মুখ আর গায়ের চামড়া আরও সুন্দর লাগে দেখতে। কিশোর বয়সে অন্ধকার সিনেমা হলের সাদা পর্দায় রঙিন ছবিগুলোতে এইসব মেয়েদেরকেই দেখেছে নিনো। সেই বয়সে রোমান্টিক স্বপ্ন দেখত সে, সে-সব স্বপ্নের মধ্যে এরাই ছিল ওর প্রেমিকা। কিন্তু এখন এদের মোটাসোটা আর ল চেহারা দেখে মনে হচ্ছে ওর, মেকআপ ব্যবহার করে সং সেজে আছে সবাই। ওদের শরীর আর মনে প্রচণ্ড ক্লান্তি জমেছে, তা কোনভাবেই লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। সময়ের সাথে সাথে ওদের মোহিনী রূপে ভাটা পড়েছে, তা আর কোন দিন ফিরে পাবার নয়। হাঁটার ধরন, কথা বলার কায়দা, তাকাবার ভঙ্গি সব কিছুর মধ্যে সেই আগেকার স্মৃতি ফিরে আসে ঠিক, কিন্তু আগের সেই প্রাণ চাঞ্চল্য নেই, মোমের পুতুলের মত লাগছে, নিস্তেজতাকিয়ে থাকলেও পুরুষের শরীর কামনায় কাতর হয়ে ওঠে না। একটা গ্লাসে হুইস্কি ভরে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে নিনো, শেষ পর্যন্ত গিয়ে থামল যেখানে একগাদা মদের বোতল্প সাজানো রয়েছে। ছায়ার মত ওর সাথে লেগে রয়েছে জনিও। ওখানে দাঁড়িয়ে মদ গিলছে দুজন, হঠাৎ এক সময় ঠিক ওদের পিছন থেকেই শোনা গেল মিষ্টি সুরের ঝংকারের মত একটা কণ্ঠস্বর। অতি পরিচিত, আশ্চর্য মধুর গলা, চিনতে ভুল হলো না ও। কথা বলছে ডীনা ডান।
লক্ষ কোটি পুরুষের মত নিনোর কানেও এই সুমিষ্ট কণ্ঠস্বর চিরকালের জন্যে লেগে আছে। দুবার একাডেমি পুরস্কার পেয়েছে ডীনা ডান। ভীনা ডান.যে ছবিতে থাকে, বলে দেয়া যায় রে ছবি সবচেয়ে বেশি টাকা কামারে। ওর অভিনীত একটা ছবি এত বেশি টাকা রোজগার করেছে যে সেই রেকর্ড এখন পর্যন্ত আর কোন ছবি ভাঙতে পারেনি। সিনেমার পর্দায় ওর মধ্যে এমন একটা কোমল, মৌন, পরিচ্ছন্ন বিড়ালসুলভ নারীত্বের লাবণ্য ফুটে ওঠে যা দেখে কোন পুরুষ-এর পক্ষে অবিচলিত থাকা সম্ভব নয়। সব পুরুষের গোপন মানসপ্রিয়া ও, নিনোও ওকে স্বপ্নের মধ্যে একান্ত আপন করে পেয়ে ধন্য মনে করেছে নিজেকে। কিন্তু কিংবদন্তীর সেই রূপসীর মুখে যে কথা বেরুল তা শোনার জন্যে তৈরি ছিল না নিনো।
অ্যাই শালা,হারামজাদা জনি, বলল ডীনা ডান, তোমার জন্যে আবার আমাকে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যেতে হয়েছিল-কারণ, আমাকে নিয়ে মাত্র একটা রাত খেলা করে শরীরটাকে শুধু গরম করেই তুললে, দ্বিতীয় বারের জন্যে আবার ফিরে এলে না কি মনে করে?
মুখটা বাড়িয়ে দিল ডীনা ডান, তাতে চুমো খেলো জনি। বলল, ওই এক রাতেই যে একমাসের জন্যে ছিবড়ে করে ফেলেছিলে তুমি আমাকে এসো, এবার তোমাকে আমার খালাত ভাইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই। ইতালির লড়িয়ে ষড় একটা, হয়তো তোমার সাথে তাল বজায় রেখে সমান টেক্কা দিতে পারবে।
ঘাড় ফিরিয়ে নিনোর দিকে তাকাল ডীনা, চোখেমুখে তেমন উৎসাহ ফুটল না তার। ছবির আগাম দেখার উৎসাহ কি খুব বেশি ওর? প্রশ্নটার তাৎপর্য এখনই বোঝার কথা নয় নিনোর, কিন্তু উনা কি বলতে চাইছে জনি তা পরিষ্কার বুঝতে পারল।
নিঃশব্দে হাসল জনি। বলল, এর আগে কখনও সুযোগ পেয়েছে বলে মনে হয়। তোমাকে দিয়েই হাতে খড়িটা হয়ে যাক না ওর?
ডীনা নিঃশব্দে ওকে ছিনিয়ে নিয়ে চলে এল নির্জন একটা জায়গায়, ভীতি আর, উত্তেজনা কমাবার জন্যে বড় একটা গ্লাস ভর্তি হইস্কি ঢক টক করে গিলে নিতে হলো নিনোকে। নির্বিকার থাকার শত চেষ্টা করলেও কাজটা খুব কঠিন। অ্যাংলো স্যাক্সন ধাচের সৌন্দর্যের প্রতীক বলা যায় ডীনা ডানকে, নাকের ডগাটা চোখা, চেহারাটা তীক্ষ্ণ। কোথাও এতটুকু খুঁত নেই। এই চেহারা, এই মায়াময় সৌন্দর্য নিনো ভ্যালেন্টির অতি পরিচিত। নির্জুন শোবার ঘরে একা দেখেছে ওকে সে, ভগ্ন হৃদয়ে কাঁদছে, একগাদা ছেলেপিলে রেখে মারা গেছে পাইলট স্বামী। আরেকবার ওকে মানসিক আঘাত পেতে দেখেছে, প্রচণ্ড রাগে অস্থির দেখাচ্ছিল, কারণ লম্পট ক্লার্ক গেবল ওর যৌবন লুটে নিয়ে আরেক মেয়েমানুষের লোভে ওকে শ্রাগ করে চলে যায়। কিন্তু চরম অপমানিত হলেও তখনও ওকে আশ্চর্য গাভীর্যমণ্ডিত গৌরবে উদ্ভাসিত দেখাচ্ছিল। (ডীনা ডান কখনও যৌনাবেদনময়ীর ভূমিকায় অভিনয় করে না।) ওকে সে সফলপ্রেমের দৃশ্যে মনের মানুষের আলিঙ্গনে পিষ্ট হতে দেখেছে, আর দেখেছে কমপক্ষে ছয়বার কি করুণ আর সুন্দর ভাবে মরে যেতে। ওকে দেখেছে; ওর সম্পর্কে কত চমকপ্রদ গল্প শুনেছে, তার স্বপ্নে নায়িকা ছিল ও, অথচ তাকে একা পেয়ে প্রথমে যে কথাটা বলল ডীনা তা শোনার জন্যে মোটেই প্রস্তুত ছিল না নিনো।
