একটা পিয়ানোর সামনে বসে আছে নিনো ভ্যালেন্টি। ভয়ে ভয়ে, আড়ষ্ট ভঙ্গিতে পিয়ানোর কী-গুলোর গায়ে আঙুল চালিয়ে টুংটাং আওয়াজ তুলছে। সেই সাথে ধীরে ধীরে চুমুক দিচ্ছে হুইস্কি ভরা গ্লাসে। এতে অবশ্য উদ্বেগ বোধ করছে না জনি, সে জানে, মাতাল হোক বা না হোক ওর সমান ভাল গাইবে নিনো, তাছাড়া আজকের এই কাজে নিনো খুব বেশি দক্ষতা না দেখালেও কিছু এসে যাবে না।
পুরানো কিছু ইতালীয় আর সিসিলীয় গানের ব্যবস্থা করেছে এডি নীলস। এগুলোর সাথে সেই যে কনি কর্লিয়নির বিয়ের দিন দ্বন্দ্বযুদ্ধের দ্বৈত সংগীত গেয়েছিল নিনো আর জনি, সেটাও বিশেষভাবে রেকর্ড করা হবে আজ। জনির এই রেকর্ড করার পিছনে একটা মাত্র কারণ কাজ করছে, এসব গান বড় বেশি ভালবাসেন জনির গড় ফাদার, এই রেকর্ডটা বড়দিনের তোফা একটা উপহার হবে। তাছাড়া, এখন কেন যেন মনে হচ্ছে ওর, রেকর্ডটা বিক্রিও হবে খুব। তবে লাখ দশেক হবে বলে আশা করা যায় না। জনি ভাবছে, ভাগ্য ভাল বলতে হবে যে ডন তার কাছ থেকে কি প্রতিদান চাইতে পারেন তা সে বেশি দেরি না করেই আঁচ করে নিতে পেরেছে। ব্যাপারটা জানার পর তার উপর খুশি হবেন ডন, কারণ নিনোও তো তার ধর্মপুত্র।
হলুদ প্যাড আর ক্লিপবোর্ড পাশের চেয়ারে রেখে উঠে দাঁড়াল জনি, এগিয়ে এল পিয়ানোর দিকে। ওহে দেশী! নিলোকে সম্বোধন করল ও। মুখ তুলে ওর দিকে তাকিয়ে হাসতে চেষ্টা করছে নিনো, একটু অসুস্থ দেখাচ্ছে তাকে। সামনের দিকে বুকে তার শোল্ডার ব্লেডে হাত ঘষে দিল জনি। ঘাবড়াবার কিছু নেই, ঢিল দে, পেশীতে। বলল ও। আজ যদি ভাল গাইতে পারিস, হলিউডের সবচেয়ে সেরা আর বিখ্যাত নিতম্বিনী জোগাড় করে দেব তোকে।
দ্রুত এক ঢোক হুইস্কি গিলে নিয়ে জানতে চাইল নিনো, কে সে, ল্যাসি নাকি?
হেসে উঠল জনি, বলল, না। আমি ডীন ডান-এর কথা বলছি। কড়া মাল, গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি।
আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল নিনের মুখ, তবু সেই চেহারায় একটা কৃত্রিম হতাশার ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল, কেন, ল্যাসিকে জুটিয়ে দিতে পারিস না?
মিশ্র সংগীতের প্রথম গানের সুর বেজে উঠল অর্কেস্ট্রাতে, গভীর ধ্যানমগ্নতার সাথে শুনছে জনি। সবগুলো গানের বৈশিষ্ট্যের দিকে বিশেষ নজর রেখে একবার করে বাজিয়ে নেবে এডি নীলস। তারপর রেকর্ডের জন্যে প্রথম টেক হবে। মন দিয়ে শুনে রপ্ত করে নিচ্ছে জনি কিভাবে গাইবে প্রতিটি পদ, কিভাবে শুরু করবে প্রতিটি গান। জানা আছে বেশিক্ষণ টিকবে না ওর নিজের গলা, বেশি সময় ধরে নিনোই গাইবে, তার সাথে ও শুধু তাল মিলিয়ে যাবে। অবশ্য সেই দ্বন্দ্বযুদ্ধের দ্বৈত সংগীতটা ছাড়া, ওটার জন্যে সাবধানে জিইয়ে রাখতে হবে গলাটাকে।
নিনোকে হাত ধরে টেনে দাঁড় করাল জনি, দুজন এগিয়ে গিয়ে যে যার মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়াল। শুরুতেই ভুল করে বসল নিনো, তারপর আবার সেই একই ভুল করল। লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে তার মুখ তাকে অভয় দেবার জন্যে ঠাট্টা শুরু করে দিল জনি, কিরে, মতলবটা কি? ওভারটাই বাগাতে চাস বুঝি?
ম্যাণ্ডোলিনটা হাতে নেই বলে ঠিক সুবিধে লাগছে না।
একটু চিন্তা করে বলল জনি, মদের গ্লাসটা হাতে নিয়ে মনে কর ওটাই তোর ম্যাণ্ডোলিন।.
তাই করল নিনো, আর সম্ভবত তাতেই কাজ হলো। গাওয়ার সময় মাঝে মধ্যেই গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে বটে সে, কিন্তু দারুণ, খানা গাইছে। সহজ সুরে গাইছে জনিও, ইচ্ছা করেই গলায় তেমন জোর আনছে না, তা সত্ত্বেও নিজের গলার ঝালানো, শান দেয়া পেশাদারী নিপুণতা দেখে নিজেই আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছে। দশ বছরের গানের চর্চা কিছু তাহলে শিখিয়েছে তাকে।
ওদের সেই দ্বন্দ্বযুদ্ধের দ্বৈত সংগীতটা রেকর্ডের শেষ গান, এবার গলা ছেড়ে গাইল জনি। রেকর্ড শেষ হতে গলায় ব্যথা অনুভব করছে ও। গানটার শেষে মিউজিসিয়ানরাও সাংঘাতিক অনুপ্রাণিত হয়ে উঠল। ঝানু মিউজিসিয়ান ওরা, গান যত ভালই হোক না কেন ভাবাবেগে উদ্বেলিত হয়ে ওঠা স্বভাব নয় ওদের, কিন্তু ঘটল ঠিক তাই। যন্ত্রগুলো কষে পিটিয়ে, তালে তালে পা ঠুকে অভিনন্দন জানাচ্ছে ওরা। ড্রামাররাও মনের সুখে খুব একচোট ভাম পেটাল।
থামতে হচ্ছে প্রায়ই, আলোচনা করে নিতে হচ্ছে। একটানা প্রায় চার ঘণ্টা পরিশ্রম করার পর সেদিনের মত কাজ বন্ধ করল ওরা। জনির কাছে এসে ফিসফিস করে এডি নীলস বলল, জনি, গলাটা তো আশ্চর্য ভাল শোনাল! তোমার গলা বোধহয় তৈরি হয়ে গেছে একটা রেকর্ড করার জন্যে। নতুন একটা গান আছে আমার হাতে, ঠিক যেন তোমার জন্যে তৈরি।
এদিক ওদিক মাথা দোলাল জনি, বলল, হয়েছে, এডি, আমাকে সান্ত্বনা দিতে হবে না। দু ঘন্টা পর আমার গলার অবস্থা এমন হবে যে শুধু কথা বললেই কর্কশ শোনাবে কানে.। ক্রোমার কি মনে হয়, আজকের মত এই রকম আরও খাটতে হবে নাকি আমাদেরকে?
কাল একবার স্টুডিওতে আসতে হবে নিনোকে, চিন্তিত ভাবে বলল এড়ি। কিছু কিছু ভুল হয়েছে ওর। তবে যতটা আশা করেছিলাম তার চেয়ে দেখছি অনেক ভাল করেছে ও। কিছু যদি পছন্দ না হয় আমার, সাউণ্ড ট্রেকনিশিয়ানদেরকে দিয়ে শুধরে নেব আমি, কেমন?
ঠিক আছে, বলল জনি। প্রেসিংটা শুনতে পাব কবে?
কাল রাতে; বলল এডি! তোমার বাড়িতে?
ঠিক আছে, বলল জনি। অসংখ্য ধন্যবাদ, এড়ি। নিনোর হাত ধরে স্টুডিও থেকে বাইরে বেরিয়ে এল ও। জিনির বাড়িতে নয়, নিজের বাড়িতে এল জনি।
