আসল কথাটা জানা আছে তার, মেয়েদেরকে ভাল না বেসে থাকতে পারবে না সে, হোক তারা বিশ্বাসঘাতক, প্রবঞ্চক তবু তাদেরকে ভালবাসতে হবে, তা নাহলে অন্তরের খানিকটা মরে যাবে তার। দুনিয়ায় যাদেরকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসে সেই তারাই ওর দুর্দশা আর লাঞ্ছনা দেখে মনে মনে উল্লসিত হয়ে ওঠে, কিন্তু তাতেও কিছু এসে যায় না তার। ওরা ওই রকমই, সুতরাং মেনে না নিয়ে উপায় কি! শুধু যৌন সম্পর্ক ছাড়া আর সব ব্যাপারে তারা ওকে ঠেকায়, ওর সাথে। বেঈমানী করে, তবু এসব গ্রাহ্য করে না ও। প্রেম করে সবার সাথে, দামী উপহার কিনে দেয়, ওর সর্বনাশ দেখে ওরা আনন্দ পেলে ব্যথা পায়, কিন্তু তা গোপন করে রাখে, কাউকে জানতে দেয় না। বরং ওদেরকে ক্ষমা করে দেয়, কারণ জানে, এতদিন ওদেরকে ফাঁকি দিয়ে এসেছে সে, ওকে বেঁধে ফেলার ওদের আশায় বালি ছড়িয়ে এসেছে, অথচ ওদের কাছ থেকে সেবা, আদরযত্ন, ভালবাসা গ্রহণ করতে আপত্তি করেনি কখনও। সুতরাং প্রতিশোধ তো এখন ওরা নেরেই। কিন্তু ওদের সাথে অন্যায় আচরণ করেছে বলে নিজেকেও এখন অপরাধী লাগে না তার। জিনির সাথে অন্যায় আচরণ করেছে বলেও কোন অপরাধবোধ নেই তার মধ্যে, বরং দাবি করে থাকে তার মেয়েদের বাবার আসন থেকে তাকে সরিয়ে দেয়া চলবে না। আবার যে জিনি বিয়ে করবে সেটিও হবে না-তাকে, পরিত্যক্তা হয়ে জীবনটা কাটিয়ে দিতে হবে, এসব কথা জিনিকে জানাতেও কুণ্ঠাবোধ করে না সে। সাফল্যের চূড়া থেকে পতনের পরও এই ব্যাপারগুলো সম্পর্কে আগের জেদ আর ইচ্ছা অটুট রেখেছে সে। মেয়েদেরকে আঘাত দেয়, কিন্তু গায়ের চামড়া এত মোটা করে নিয়েছে যে ভাল-মন্দ কিছুই অনুভব করে না।
প্রচণ্ড ক্লান্তিতে ভেঙে পড়তে চাইছে শরীর, শুয়ে পড়তে ইচ্ছা করছে ওর, তবু মনের পর্দা থেকে কোনমতে সরছে না একটা স্মৃতি। চোখের সামনে জ্বল জ্বল করছে এখনও নিনোর সাথে গান করার দৃশ্যটা। আচমকা বিজলী চমকে উঠল তার মনের পর্দায়, এক নিমেষে বুঝতে পারল, তাকে দিয়ে কি কাজ করিয়ে নিতে চাইছেন তার গড ফাদার, কি করলে তিনি সব চেয়ে খুশি হরেন। ঝর্ট করে হাত বাড়িয়ে ফোনের রিসিভারটা তুলে নিল্প জনি। অপারেটরকে ডেকে নিউ ইয়র্কের যোগাযোগ চাইল।
সনি কর্লিয়নির সাথে কথা বলে নিনো ভ্যালেন্টির ফোন নম্বর চাইল জনি। অপরপান্তে এল নিনো। সব সময়ের মত এখনও মাতাল হয়ে রয়েছে নিনো।
অ্যাই, নিনো, বল দেখি, এখানে আমার কাছে এসে কাজ করতে কেমন লাগবে তোর? বলল জনি। খুব বিশ্বাসী একজন লোক দরকার আমার।
ব্যঙ্গ করার এই মহা সুযোগটা ছাড়ল না নিনো। ঠাট্টার সুরে বলল, ঠিক বুঝি না, জনি,– আমার এই ট্রাক ড্রাইভারির চাকরিটাই বা মন্দ কি! রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে পাড়ার বউগুলোর সাথে রঙ-তামাশা করি, হপ্তা শেষ হওয়া মাত্র কড়কড়ে দেড়শো ভলার পকেটে খুঁজি। এর চেয়ে বেশি কিইবা দিতে পারবি তুই আমাকে?
শুরুতে পাঁচশো ডলার তো দিতেই পারব, বলল জনি। উপরি পাওনা হিসেবে সুন্দরী অভিনেত্রীদের সাথে অবাধ মেলামেশা আর যত খুশি ডেট, কেমন লাগবে? আর আমার দেয়া পাটিগুলোতে তোক হয়তো গান গাইতেও হতে পারে।
সত্যি বলছিস? শুনতে তো মন্দ লাগছে না। ব্যাপারটা তাহলে একটু ভেবে দেখতে হয়। তবে, আমার উকিল, অ্যাকাউন্টেন্ট, ট্রাকের হেলপার এদের সাথে আলোচনা না করে তো কিছু বলা সম্ভব নয়, দেখি কি পরামর্শ দেয় ও আমাকে।
ফের যদি ঠাট্টা করবি, কান ধরে ছিঁড়ে দেব। শোন, নিনো, তোকে আমি চাই এখানে। প্লেনে করে কালই চলে আয় তুই। এসে হপ্তায় পাঁচশো ডলার বেতনের একটা এক বছরের চুক্তিপত্রে সই করে যা। এতে তোরই লাভ হবে, কারণ, পরে যদি তুই আমার সবচেয়ে প্রিয় মেয়েমানুষটাকে ভাগিয়ে নিয়ে পালিয়ে যাস, আর আমি তোর চাকরি খেয়ে দিই, তবু অন্তত এক বছরের বেতন তো পাবি! ঠিক হ্যায়? রাজি?
অনেকক্ষণ কোন কথা বলছে না নিনো। তারপর জানতে চাইল সে, অ্যাই, জনি, তুই আমার সাথে ঠাট্টা করছিস তাই না? নেশার ঘোর কেটে গেছে তার।
এই, শালা, তোর সাথে কোন দুঃখে ঠাট্টা করতে যাব আমি। বলল জনি। শোন, নিউ ইয়র্কে আমার এজেন্টের অফিস আছে, ওখানে চলে যা তুই। ওরাই তোকে প্লেনের টিকিট আর টাকা পয়সা যা লাগে দিয়ে দেবে, বুঝলি? কাল সকালে ঘুম থেকে উঠে ফোন করে সব কথা ওদেরকে জানানোই আমার প্রথম কাজ হবে। বুঝতে পারছিস তো? আর এখানের এয়ারপোর্টে একজনকে পাঠার, সেই তোকে নিয়ে আসবে আমার কাছে। কেমন?
এবারও অনেকক্ষণ কথা বলছে না নিনো। তারপর আশ্চর্য স্থির, সংযত কণ্ঠে কিন্তু অনিশ্চিত ভঙ্গিতে বলল, আচ্ছা, ঠিক আছে।
২.৬ বিশাল রেকর্ডিং স্টুডিওতে বসে
০৬.
বিশাল রেকর্ডিং স্টুডিওতে বসে একটা হলুদ প্যাডে খরচের হিসাব কষছে জনি ফন্টেন। সার বেধে ভিতরে ঢুকছে মিউজিসিয়ানরা, সেই অল্প বয়সে জনি যখন ব্যাণ্ড পাটির সাথে ঘুরে ঘুরে গান গাইত তখন থেকেই এদেরকে চেনে ও। পপ গানের শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের একজন আজকের সঙ্গীত পরিচালক, জনির জীবন যখন লণ্ডভণ্ড হয়ে যেতে বসেছিল তখন এই লোকটার কাছ থেকে সহানুভূতি পেয়েছিল সে। সব মিউজিসিয়ানকে একতাড়া করে স্বরলিপির কাগজ দিচ্ছে লোকটা। নার্ম এডি নীলস। হাতে এত কাজ তার যে দম ফেলার ফুরসত পর্যন্ত নেই, তবু জনির প্রতি বিশেষ খাতির দেখিয়ে এই রেকর্ডটা করে দেবার দায়িত্ব নিয়েছে সে।
