বাড়িটা এখন নিস্তব্ধ। ওর পরিত্যক্ত স্ত্রী আর মেয়েরা ঘুমিয়ে পড়েছে। এখন সে তার জীবনের সেই ভয়ঙ্কর সময়ের কথা ভাবতে পারে, যখন ওদেরকে শ্রাগ করেছিল সে। শ্রাগ করেছিল একটা বেজন্মা বেশ্যার জন্যে, যে ছিল তার দ্বিতীয়। স্ত্রী। কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে ওর কথা মনে পড়ে যেতে খুশির সাথে হাসল জনি, যত যাই হোক, ভাবছে সে, শুধু যে সুন্দরী ছিল তা তো আর নয়, কত দিকে কত ভাল গুণও তো ছিল। আসলে যেদিন সে মন স্থির করে ফেলে যে আর কোন মেয়েকে ঘৃণা করা নয়, আরও পরিষ্কার করে বলতে গেলে, যেদিন সে সিদ্ধান্ত নেয় তার প্রথম স্ত্রী আর মেয়েদেরকে, তার বান্ধবীদেরকে, তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে এবং নতুন বান্ধবীদের মধ্যে শ্যারন মুর পর্যন্ত কাউকেই আসলে সে ঘৃণা করার সামর্থ্য রাখে না, সেদিন থেকেই রক্ষা পেয়েছে তার জীবন।
প্রথম দিকে ব্যাণ্ড-পার্টির সাথে ঘুরে ঘুরে গান করত জনি, তারপর এল রেডিওতে গাইবার সুযোগ। কিছুদিন পর সিনেমার মঞ্চে পঁড়িয়ে গান করার আমন্ত্রণ পেল ও। এই পুরো সময়টা যা খুশি তাই করে বেড়িয়েছে জনি, নিজের খেয়াল খুশি মত উপভোগ করেছে জীবনটাকে। কোন মেয়েকে মনে ধরেছে, হাত বাড়িয়েছে তার দিকে, দখল করতেও ব্যর্থ হয়নি কখনও। সেই সাথে মদ গিলেছে দেদার। কিন্তু তার ব্যক্তিগত অর্থাৎ পারিবারিক জীবনকে এসবের কারণে প্রভাবিত হতে দেয়নি কখনও। এরপরই মোহিনী নারী মার্গট অ্যাশটনের নেশায় বুঁদ হয়ে পড়ল সে। সুন্দরী হিসেবে দুনিয়া জোড়া খ্যাতি, তার প্রেমে অন্ধ হয়ে গেল জনি, পাগল হয়ে উঠল। সুনাম থোয়াল সে, গলা ভাঙল, ধ্বংস করল পারিবারিক জীবন, একটা অমানুষ হয়ে উঠে হেয় করল নিজেকেই। তারপর এমন একদিন এল, যখন নিজের বলে আর কিছুই রইল না তার, একা এবং নিঃস্ব হয়ে গেল সে।
তবে একটা কথা, উদারতা আর বিবেচনাবোধ কখনও হারায়নি সে। প্রথম স্ত্রীকে ত্যাগ করার সময় যা কিছু ছিল তার, সবই দান করেছে। এমন ব্যবস্থা। করেছিল যাতে তার প্রত্যেকটি ছবি, প্রতিটি রেকর্ড, প্রতিটি ক্লাব অনুষ্ঠান থেকে যা। আয় হবে তা থেকে একটা অংশ মেয়েরাও পাবে। আর যখন সে ধনী এবং খ্যাতির শীর্ষে ছিল তখন প্রথম স্ত্রীর কোন দাবি মেটাতেই সে অস্বীকার করেনি। জিনির সবগুলো ভাই আর বোনকে সাহায্য করেছে সে, সাহায্য করেছে ওর মা আর বাবাকে। এমন কি জিনির বান্ধবী ছিল যারা তাদেরকেও আর্থিক সাহায্য করতে ইতস্তত করেনি সে। ইচ্ছা না থাকা সত্তেও জিনির দুই বোনের বিয়েতে গান গেয়েছে, না গাইলে মনে দুঃখ পাবে জিনি, তাই। একটা মাত্র জিনিস, শুধু নিজের ব্যক্তিত্ব ছাড়া আর সব কিছুই প্রথম স্ত্রীকে বিলিয়ে দিয়েছিল সে।
তারপর যখন নামতে নামতে একেবারে তলিয়ে যাবার পর্যায়ে পৌঁছে গেল সে, যখন আর অভিনয় করার সুযোগ পাচ্ছে না, যখন আর গাইতে পারছে না, যখন তার দ্বিতীয় স্ত্রী তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তখন সে তার প্রথম স্ত্রী আর মেয়েদের সাথে কয়েকটা দিন কাটাবার জন্যে এল। সেই সময়, এক রাতে, নিজের উপর সম্পূর্ণ আস্থা হারিয়ে ফেলল সে, স্ত্রীর করুণার উপর ছেড়ে দিল নিজেকে। একটা রেকর্ডিং শুনতে গিয়েই ঘটল বিপত্তিটা, এমন বিদঘুঁটে শোনাল গলাটা যে রাগে দিশেহারা হয়ে অভিযোগ করল, সাউণ্ড টেকনিশিয়ানরা ইচ্ছা করে নষ্ট করেছে রেকর্ডটা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত টের পেল সে, গলদটা তার নিজেরই, বর্তমানে এই-ই দাঁড়িয়েছে তার গলার অবস্থা। মাস্টার রেকর্ডটা আছড়ে ভাঙল সে, এবং স্থির করল আর কখনও গাইবে না। এত লজ্জা আর দুঃখ পেয়েছিল যে কনি কর্লিয়নির বিয়ের আগে পর্যন্ত কোথাও আর গায়নি সে।
ওর দুর্দশার সমস্ত বিবরণ শোনার পর জিনির চেহারা যা দাঁড়িয়েছিল, কখনও ভুলবে না জনি। জিনির মুখে সেই ভাবটুকু মাত্র এক সেকেণ্ড স্থির হয়েছিল, কিন্তু ওই এক সেকেণ্ডের মধ্যেই যা দেখেছে জনি চিরকাল মনে রাখার জন্যে যথেষ্ট। বিদ্যুৎ চমকের মত নির্মম উল্লাস আর আনন্দময় সন্তুষ্টি ঝিলিক দিয়ে গিয়েছিল তার চেহারায়। এতগুলো বছর ওকে জিনি সৃণ করে এসেছে, হঠাৎ বুঝতে পেরেছিল জনি। অবশ্য দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে ঠাণ্ডা ভঙ্গিতে নরম সুরে সহানুভূতি জানাতে ভুল করেনি জিনি। এর পরের কটা দিন মানসিক শান্তি পাবার জন্যে ওর অতি প্রিয় তিনটে মেয়ের কাছে যাওয়া আসা শুরু করে সে। বেশ কয়েক বছর ধরে এদের আদর-যত্ন নিচ্ছে সে, ওর ঘনিষ্ঠ বান্ধবী এরা, শখ হলে মাঝে মধ্যে পালা করে শোয়, এই মেয়েগুলোর জন্যে তার ক্ষমতা অনুযায়ী যত রকম সাহায্য করা সম্ভব সব করেছে সে। কয়েক লক্ষ ডলার মূল্যের উপহার, লোভনীয় চাকরি, সাধ্য মত দিতে কিছুই বাকি রাখেনি। অথচ এদের মুখেও জিনির মত সেই একই নির্মম উল্লাস আর বিকৃত আনন্দ দেখতে পেয়েছে জনি।
ঠিক এই সময় বুঝতে পেরেছিল সে, একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে তাকে। হলিউডের আর সরু সফল প্রযোজক, লেখক, পরিচালক, অভিনেতাদের মত একজন হতে পারে সে, যারা সুন্দরী মেয়েদেরকে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ঘৃণ্য লোলুপতার সাথে চুটিয়ে ভোগ করে চলেছে। ইচ্ছা করলে টাকার ক্ষমতা খাঁটিয়ে, প্রভাব প্রয়োগ করে মেয়েদেরকে কাছে টানতে পারে সেও, তারা বিশ্বাসঘাতকতা করবে ভেবে। সজাগ থাকতে হবে তাকে, সজাগ থাকতে হবে কখন না জানি তাকে ওরা ছেড়ে চলে যায়। অথবা, মেয়েদেরকে ঘৃণা না করে তাদের উপর বিশ্বাস বজায় রাখতে পারে সে।
